৮৯ নং সূরাহ | সূরাহ ফাজার | Surah no 89 | Surah Fajr |

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম। 

অর্থ- আল্লাহর নাম নিয়ে পড়া শুরু করছি, যিনি সীমাহীন দয়ালু এবং সীমাহীন করুণাময়।

নাযিল: মাক্কাহ, আয়াত : 30 টি।

চন্দ্র বছরে 11 দিন কম হয়।

89:1 নং আয়াহ : শপথ ভোরের [81:18], যা গণনায় কমে যায়।

সৌর বছরে 10 টি রাত বাড়তি হয়।

89:2 নং আয়াহ : শপথ দশটি (বাড়তি) রাতের।

# সৌর বছর হয়- 365 দিন 6 ঘটায় (গড়)। তার তুলনায় চন্দ্র বছর হয়- 354 দিন 9 ঘন্টায় (গড়)। পার্থক্য হয়- প্রায় 10 টি রাতের, 11 টি দিনের। অর্থাৎ প্রায় প্রায় সাড়ে 10 দিনের। অর্থাৎ 24 ঘন্টার সাড়ে 10 দিন। চন্দ্র পঞ্জিকা অনুযায়ি- রাত আগে আসে, তারপর দিন। অর্থাৎ সন্ধ্যায় সূর্য অস্ত যাওয়ার পর তারিখ বদলায়। তাই এখানে 10 টি রাতের শপথ করা হয়েছে, 11 টি দিনের নয়।

ভাইরাস, ব‍্যাকটেরিয়ারা নারী-পুরুষ হয় না।

89:3 নং আয়াহ : শপথ তার, যা নারী ও পুরুষে সৃষ্ট এবং শপথ তার, যা নারী ও পুরুষে সৃষ্ট (১) নয়।

১) মানুষ সহ বহু জীবজন্তু নারী পুরুষে হিসাবে সৃষ্ট। কিন্তু এমন‌ও কিছু প্রানী রয়েছে, যারা শুধু নারী, শুধু পুরুষ। এছাড়াও ভাইরাস ও ব‍্যাকটেরিয়ারা নারী পুরুষ হিসাবে সৃষ্ট নয়।

রাত ছোট বড় হয়।

89:4 নং আয়াহ : শপথ রাতের, যখন তা ছোট ও বড় হয় [43:38]।

চিন্তাশীলদেরকে আল্লাহর সম্বোধন।

89:5 নং আয়াহ : (উপরে উল্লেখিত আয়াত গুলো‌তে) চিন্তাশীলদের জন্য শপথ আছে কি??

নাবী (সা) কে আদ জাতি সম্পর্কে প্রশ্ন।

89:6 নং আয়াহ : আপনি কি দেখেন নি (১) যে, আপনার প্রভু আদ বংশের সঙ্গে কেমন [69:6-8] ব‍্যবহার করছেন??

১) এটা আরবি বাক রীতি। যার অর্থ- আপনি কি জানেন না?? এখানে ‛দেখেন নি’ বলতে, চোখ দিয়ে দেখা নয়। 

সিন্ধু সভ‍্যতা।

89:7 নং আয়াহ : (আর) ইরাম/ সিন্ধু (১) সভ‍্যতার বাসিন্দাদের সঙ্গে! যারা ছিল পরিকল্পিতভাবে তৈরি করা অট্টালিকা‌ সমূহের অধিকারী??

১) সিরিয়ার ‛এরলুস’ নামক একটি পুরনো শহরে 1973-1975 সালে খনন কার্যের ফলে ‛এবলা’ নামক প্রাচীন সভ‍্যতার নিদর্শন পাওয়া যায়। এবং সেখান থেকে উদ্ধার হয় প্রায় 21 হাজার মতো লিখন। এই সমস্ত লিখন পরীক্ষা করে জানা যায়- এই সভ‍্যতা 4-5 হাজার বছরের একটি পুরনো সভ‍্যতা। এ লিখনগুলোর ভেতর ‛ইরাম’ সভ‍্যতার উল্লেখ আছে। এক সময় ‛এবলা’ অঞ্চলের মানুষ‌রা ইরাম সভ‍্যতার মানুষ‌দের সঙ্গে ব্যবসা-বানিজ্য করত।

   এখন প্রশ্ন হবে- ইরাম সভ‍্যতার অবস্থান কোথায় ছিল?? নিশ্চিত ভাবে কেউই বলতে পারেন নি। তবে আমরা মিশরীয় সভ‍্যতার কথা জানি, মেসোপটেমিয়া সভ‍্যতার কথাও জানি। এও জানি যে, এই সভ‍্যতা গুলোর সঙ্গে সিন্ধু সভ‍্যতার ব‍্যাবসা বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিল। কেননা, তৎকালীন সিন্ধু সভ‍্যতা ছিল উন্নতির চরম শিখরে। সুতরাং ‛এবলা’ সভ‍্যতার‌ও ব‍্যাবসা বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিল সিন্ধু সভ‍্যতার সঙ্গে। আর এ কথা অস্বীকার করার কোনও উপায় নেই।

   আর ‛এবলা’ খনন কার্য হতে জানি যে, তাদের সঙ্গে ইরাম সভ‍্যতার সঙ্গে ব‍্যাবসা বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিল। এ জন‍্যেই ইরাম সভ‍্যতা সম্পর্কে কুরআনে বলা হয়েছে- “তারা এমন (পরিকল্পিত সভ‍্যতা নির্মাণ করে) ছিল যে, তাদের সমতুল্য সভ‍্যতা নির্মাণকার্য (তাদের সময়ে পৃথিবীর) কোনও ভূখণ্ডে‌ই ছিল না” (89:8)। আমরা জানি- সিন্ধু সভ‍্যতার চেয়ে উন্নত সভ‍্যতা তৎকালীন সময়ে পৃথিবীতে আর কোথাও ছিল না। সুতরাং ‛ইরাম’ সভ‍্যতাই ছিল- সিন্ধু সভ‍্যতা (যদিও তা হোসেন কুরানী’র অনুমান মাত্র, যা ভুল‌ও হতে পারে)।

   প্রশ্ন হবে- ইরাম ও সিন্ধু, নাম দুটি ভিন্ন কেন?? উত্তর খুব সহজ- সিন্ধু নামটা আমাদের (মানুষের) দেওয়া। এটা মূল নাম নয়। পবিত্র কুরআন এই সভ‍্যতার আসল নাম উল্লেখ করেছে, এজন্য নাম দুটি ভিন্ন মনে হচ্ছে। প্রশ্ন হবে- কুরআন আসল নাম উল্লেখ করেছে কেন?? উত্তর সহজ- আল্লাহ নিজেই দিয়েছেন 41:53 তে- “তিনি তাদের আশপাশ থেকে ও তাদের নিজেদের মধ্যে থেকে তাদের‌কে নিদর্শন দেখাবেন। যতক্ষণ পর্যন্ত না তাদের কাছে সুস্পষ্ট হয়ে যায় কুরআন সত্য”।

   পবিত্র কুরআন 1500 বছর আগে ঘোষনা করে রেখে ছিল- ‛ইরাম’ নামের কোনও একটি উন্নত সভ‍্যতা ছিল। 1973-75 সালে যা ঐতিহাসিক ভাবে প্রমাণিত হয়ে গেল। এটা কি 41:53 এর সত্যতা ঘোষণা করল না?? এটা প্রমাণ করল না যে, পবিত্র কুরআন সত্য??

সিন্ধু সভ‍্যতা ছিল অতুলনীয়।

89:8 নং আয়াহ : তারা এমন (পরিকল্পিত সভ‍্যতা নির্মাণ করে) ছিল যে, তাদের সমতুল্য সভ‍্যতা নির্মাণকার্য (তাদের সময়ে পৃথিবীর) কোনও ভূখণ্ডে‌ই ছিল না।

নাবী (সা) কে সামূদ জাতি সম্পর্কে প্রশ্ন।

89:9 নং আয়াহ : আর সামূদের সঙ্গে [69:5-8]! যারা উপত্যকা‌র পাথর [7:73-79] কেটে (গৃহ নির্মাণ করে) ছিল??

ফির‌আউন বহু পিরামিডের অধিকারী ছিল।

89:10 নং আয়াহ : আর পিরামিড সমূহের [38:12] অধিকারী [11:100] ফির‌আউনের সঙ্গে [10:90]??

ফির‌আউন‌ বিভিন্ন দেশে আক্রমণ চালাতো।

89:11 নং আয়াহ : যারা বিভিন্ন দেশে (আক্রমণ (১) দ্বারা) সীমা লঙ্ঘন [20:24, 20:43] করেছিল।

১) মিশরকে আমরা পিরামিডের দেশ হিসেবে‌ই জানি ও চিনি। কিন্তু সবচেয়ে বেশি পিরামিড মিশরে নয়, বরং সুদানে (যদিও সুদান এখন বিভক্ত হয়ে গেছে)। আর শুধুমাত্র মিশর ও সুদান নয়, পৃথিবীর বহু দেশেই পিরামিড পাওয়া যায়। প্রশ্ন হলো- এক‌ই সময়ে পৃথিবীর ভিন্ন ভিন্ন দেশে পিরামিড তৈরি হয়েছিল কেন?? উত্তর রয়েছে এই আয়াহতে। মিশরের রাজারা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে আক্রমণ চালাত। এভাবেই পিরামিড মিশর থেকে বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে‌ছে।

ফির‌আউন বিভিন্ন দেশে সন্ত্রাস সৃষ্টি করতো।

89:12 নং আয়াহ : এবং সেখানে (সেই সমস্ত [28:4] দেশে) সন্ত্রাস সৃষ্টি [28:77, 28:83] করত।

ফির‌আউন ও তার সৈন্যদের উপর আল্লাহর শাস্তি।

89:13 নং আয়াহ : অতঃপর আপনার প্রভু তাদের উপর ‛শাস্তির চাবুক’ চালালেন।

আল্লাহর থেকে কেউ রেহাই পাবে না।

89:14 নং আয়াহ : নিশ্চয়ই আপনার প্রভু অবশ্যই ঘাঁটিতে ১ ধরবেন ২।

১ এখানে ঘাঁটি অর্থ বিচার দিবস হতে পারে যে, আল্লাহ বিচার দিবসে ধরবেন। অথবা সঠিক সময়‌ও হতে পারে যে, আল্লাহ সঠিক সময়ে ধরবেন।

২ এটা আরবি বাক রীতি। যার অর্থ- শাস্তি দেবেন। এখানে ‛ধরবেন’ বলতে- হাত দিয়ে ধরবেন না।

মানুষ ধনসম্পদ‌কে সম্মানের মানদণ্ড ভাবে।

89:15 নং আয়াহ : তবে মানুষের ব‍্যাপার হল- যখন তাকে তার প্রভু পরীক্ষা করার [67:2] জন্য তাকে সম্মান ও দয়া করেন, তখন সে বলে- “আমার প্রভু আমাকে সম্মানিত করেছেন”।

89:16 নং আয়াহ : আর যখন তাকে তিনি পরীক্ষা করার [67:2] জন্য তার রিযিক সংকীর্ণ করে দেন, তখন সে বলে- “আমার প্রভু আমাকে অপমানিত/ হেয়প্রতিপন্ন করেছেন”।

ইয়াতীম‌দেরকে অসম্মান করা হারাম।

89:17 নং আয়াহ : কখনও (এমনটা ভাবা উচিৎ) নয়, বরং তোমরা ইয়াতীম/ অনাথদের সম্মান [17:70, 93:9, 107:2] কর না!

খাদ্য দান/ বিতরণে নিরুৎসাহিত করা হারাম।

89:18 নং আয়াহ : এবং তোমরা পরস্পর‌কে উৎসাহিত কর না [107:3, 74:44] নিরুপায় গরীবদের খাদ্য দানের ব‍্যাপারে।

কাউকে উত্তরাধিকার হতে বঞ্চিত করা হারাম।

89:19 নং আয়াহ : এবং তোমরা উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত (অন্যের) সম্পদ সম্পত্তি (আত্মসাৎ করে) সম্পূর্ণ রূপে ভোগদখল [4:10, 4:19] করে থাকো।

# ভারত উপমহাদেশে এটা একটা বড় সমস্যা। প্রায় সমস্ত দাদারা তাদের বোনেদের উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত সম্পদ সম্পত্তি (আত্মসাৎ করে) সম্পূর্ণ রূপে ভোগদখল করে থাকে। যা সম্পূর্ণ হারাম।

ধনসম্পদ‌কে অতিরিক্ত ভালোবাসা হারাম।

89:20 নং আয়াহ : আর তোমরা ধনসম্পদ‌কে মাত্রারিক্ত ভালোবাসো [102:1-2]।

মহাবিশ্ব সংকোচিত হবে।

89:21 নং আয়াহ : কখনও নয়, যখন একত্রিত পৃণ্ডকে সংকোচনে‌র মাধ্যমে [84:1-5] সংকোচিত করা হবে।

একত্রিত পৃণ্ডের উপরেই বিচার দিবস প্রতিষ্ঠিত হবে।

89:22 নং আয়াহ : আর আপনার প্রভু (একত্রিত পৃণ্ডের উপর) হাযির হবেন [69:16-17] এবং ফেরেস্তা‌রা সারিবদ্ধভাবে [78:38] হাজির হবে।

আমাদের মহাবিশ্ব‌ই জাহান্নাম, আর তা প্রকাশিত হবে।

89:23 নং আয়াহ : সেদিন জাহান্নাম‌কে প্রকাশ ১ করা হবে [18:100]। সেদিন মানুষ (নিজের অসৎকর্ম গুলো) স্মরণ করবে, কিন্তু এই স্মরণ তার জন্য কি আর লাভজনক [43:39] হতে পারে??

১ জাহান্নাম আছে কোথায়?? কোথাও নেই, আমাদের এই মহাবিশ্ব‌ই জাহান্নাম (3;191)। ছোট করে বিস্তারিত বলি- আপাতত মহাবিশ্ব সম্প্রসারিত হচ্ছে (51:47, 81:15)। কিন্তু মহাবিশ্ব সংকোচিত হবে, আবার দ্বিতীয় বিগব‍্যাঙের মাধ্যমে মহাবিশ্ব দ্বিতীয় বার সৃষ্টি হবে (21:104, 29:19-20)। দ্বিতীয় বার গ‍্যালাক্সি ও তাতে থাকা নক্ষত্র সৃষ্টি হবে। আর এই নতুন সৃষ্টি হ‌ওয়া এক একটা নক্ষত্র‌ই এক একটা জাহান্নাম। 

   তারপর আল্লাহ আবার যতদিন চাইবেন, ততদিন জাহান্নাম বা নতুন মহাবিশ্ব টিকে থাকবে (11:107)। হ‍্যাঁ, জান্নাতীরা সংকোচিত পৃণ্ড বা একত্রিত পৃণ্ড থেকে জান্নাতে (26:90, 50:31, 81:13) চলে যাবে (19:72)। কিন্তু প্রশ্ন হবে- জাহান্নামীদের কি শাস্তির শেষ নেই?? হ‍্যাঁ, শেষ আছে। কিভাবে?? 11:107 ও 21:104 এর টিকা মনোযোগ সহ পড়ে আসুন।

জাহান্নামীদের আফসোস।

89:24 নং আয়াহ : সে বলবে- “হায়, আমার জন্য আফসোস। যদি আমার (এই) জীবনের জন্য আমি (কিছু সৎকর্ম) আগে পাঠাতাম”!

আল্লাহর শাস্তি তুলনাহীন।

89:25 নং আয়াহ : অতঃপর সেদিন তার (আল্লাহর) শাস্তির [ 4:56, 104:7] মতো শাস্তি আর অন্য [14:17, 87:13] কেউ দিতে পারবে না।

আল্লাহর বাঁধন তুলনাহীন।

89:26 নং আয়াহ : আর তার বাঁধনের  [111:5, 69:32] মতো অন্য কেউ বাঁধতেও [73:12, 104:9] পারবে না।

শান্তশিষ্ট ব‍্যক্তিই জান্নাতী।

89:27 নং আয়াহ : হে শান্তশিষ্ট [26:89] ব‍্যক্তিত্ব/ সত্ত্বা [25:63, 28:83],

মৃত্যুর সময় ফেরেস্তাদের সম্বোধন।

89:28 নং আয়াহ : তুমি ফিরে এস তোমার প্রভুর দিকে [16:32]। (তোমার প্রভুর উপর) সন্তুষ্ট হয়ে, (তোমার প্রভুর) সন্তুষ্টির [98:8] পাত্র হয়ে।

বিচার দিবসে আল্লাহর ঘোষনা।

89:29 নং আয়াহ : অতঃপর (বিচার দিবসে আল্লাহ বলবেন) তুমি আমার বান্দাদের সঙ্গে একত্রিত/ মিলিত [4:69] হ‍‌ও,

জান্নাতে প্রবেশের নির্দেশনা।

89:30 নং আয়াহ : এবং (একত্রিত/ মিলিত হয়ে) প্রবেশ কর আমার জান্নাতে।

5/5 - (1 vote)
শেয়ার করুন:

মন্তব্য করুন