বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম।
অর্থ- আল্লাহর নাম নিয়ে পড়া শুরু করছি, যিনি সীমাহীন দয়ালু এবং সীমাহীন করুণাময়।
নাযিল : মাক্কাহ, আয়াত : 44 টি।
আল্লাহর শাস্তি/ কিয়ামত সম্পর্কে প্রশ্ন।
70:1 নং আয়াহ : প্রশ্নকারী [8:32] প্রশ্ন করলো শাস্তি/ কিয়ামত [69:16-17] সম্পর্কে, যা আসবেই,
সত্য অস্বীকারকারীদের উপর শাস্তি আসবেই।
70:2 নং আয়াহ : সত্য অস্বীকারকারীদের উপর। যার প্রতিরোধকারী নেই।
মহাবিশ্বে গুপ্ত মহাজাগতিক পথ রয়েছে।
70:3 নং আয়াহ : (যা আসবে) আল্লাহর পক্ষ থেকে। যিনি গুপ্ত মহাজাগতিক পথ/ সুড়ঙ্গ [51:7] গুলোর মালিক।
সময়ের গতি সর্বদা ভিন্ন, সময় আপেক্ষিক।
70:4 নং আয়াহ : এমন একদিনে, যে দিন (মহাবিশ্বে ছড়িয়ে [53:26 থাকা) ফেরেস্তারা ও রূহ/ জিবরীল তার দিকে পৌঁছাবে [70:43, 84:1-5, 69:16-17]। যার পরিমাণ ইহকালীন পঞ্চাশ হাজার বছরের সমান।
ধৈর্য্য কেমন হওয়া উচিৎ।
70:5 নং আয়াহ : সুতরাং আপনি উত্তম [46:35, 15:97] পদ্ধতি অবলম্বন করে ধৈর্য্য [8:46] ধারণ করুন [73:10]।
পৃথিবী ও সৌরজগতের ধ্বংস দূরবর্তী বিষয় নয়।
70:6 নং আয়াহ : নিশ্চয়ই (তাদের সময়ের আপেক্ষিকতা সম্পর্কিত জ্ঞান না থাকার জন্য) তারা তা দেখছে বহু দূরের বিষয় [22:47] হিসাবে।
পৃথিবী ও সৌরজগতের ধ্বংস নিকটবর্তী।
70:7 নং আয়াহ : কিন্তু আমরা তা দেখছি অতি নিকটবর্তী বিষয় হিসাবে।
আকাশ গলিত তামার মতো লাল হয়ে যাবে।
70:8 নং আয়াহ : যেদিন আকাশ গলিত ধাতু/তামার মতো লাল [75:8-9] হয়ে যাবে।
পৃথিবী ধ্বংসের দিনে পাহাড় পর্বত হবে রঙিন পশমের মতো।
70:9 নং আয়াহ : এবং পাহাড় পর্বত হবে রঙিন পশমের [73:14, 101:5, 20:105-107] মতো।
বিচার দিবসে অপরাধী তার অন্তরঙ্গ বন্ধুদের সঙ্গে যা করবে।
70:10 নং আয়াহ : আর অন্তরঙ্গ বন্ধুও খোঁজ নেবে না [69:35] তার অন্তরঙ্গ [43:67, 25:28] বন্ধুর।
বিচার দিবসে অপরাধী মাতা/ পিতা সন্তানদের যা করবে।
70:11 নং আয়াহ : যদিও তাদের একে অপরকে দেখানো হবে। সে দিন অপরাধী (মাতা/ পিতা) নিজের মুক্তির বিনিময়ে তার সন্তানদেরকে [31:33] দিতে চাইবে।
বিচার দিবসে অপরাধী তার স্বামী/ স্ত্রী ও ভাইদের সঙ্গে যা করবে।
70:12 নং আয়াহ : তার স্বামী/ স্ত্রীকে এবং (তার মায়ের পেটের) ভাইকে।
বিচার দিবসে অপরাধী তার আত্মীয় স্বজনদের সঙ্গে যা করবে।
70:13 নং আয়াহ : এবং তার আত্মীয় স্বজনকে, যারা তাকে আশ্রয়/ প্রশ্রয়/ সমর্থন দিত।
বিচার দিবসে অপরাধী পৃথিবীর সমস্ত কিছুর বিনিময়ে মুক্তি চাইবে।
70:14 নং আয়াহ : আর পৃথিবীর/ গ্ৰহের সমস্ত কিছুকে, যেন তার বিনিময়ে [3:91] তাকে মুক্তি দেওয়া হয়।
অপরাধীর থেকে কোনও বিনিময় নেওয়া হবে না।
70:15 নং আয়াহ : কখনও (এমনটা [2:48, 2:123] হবে) না। নিশ্চয়ই তা (জাহান্নাম) লেলিহান আগুন,
জাহান্নামের আগুন চামড়াকে ছারখার করে দেবে।
70:16 নং আয়াহ : যা তার চামড়াকে জ্বালিয়ে ছারখার করে [4:56, 104:7] দেবে।
জাহান্নাম কাকে ডাকবে??
70:17 নং আয়াহ : (জাহান্নাম) তাকে ডাকবে, যে (সত্যকে) পিঠ দেখিয়ে ছিল এবং (সত্য হতে) মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল।
জাহান্নাম আর কাকে ডাকবে??
70:18 নং আয়াহ : এবং যে (ট্যাক্স না দিয়ে) ধনসম্পদ জমা করেছিল এবং ভবিষ্যতের জন্য সংরক্ষিত করেছিল।
মানুষ মানসিক ভাবে দুর্বল।
70:19 নং আয়াহ : নিশ্চয়ই মানুষ সৃষ্টিগত ভাবে দুর্বল [4:28]।
মানুষ আর্থিক বিপদে পেরেশান হয়ে যায়।
70:20 নং আমাহ : যখন তাকে (আর্থিক) বিপদ স্পর্শ করে, তখন পেরেশান হয়ে [2:268] যায়।
মানুষ আর্থিক সচ্ছলতায় কৃপণতা করে।
70:21 নং আয়াহ : আর যখন তাকে (আর্থিক) কল্যাণ স্পর্শ করে, তখন সে কৃপণতা শুরু করে।
মুস্বাল্লীরা পেরেশান ও কৃপণ হয় না।
70:22 নং আয়াহ : তবে যারা মুস্বাল্লী/ নামাজী, তারা ছাড়া।
70:23 নং আয়াহ : বিশেষত, যারা দায়েমী স্বালাত/ সর্বক্ষণ আল্লাহর বিধানের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকে, তারা ছাড়া [107:4-5]।
যারা ট্যাক্স প্রদানের গুরুত্ব জানে, তারাও।
70:24 নং আয়াহ : এবং যারা ধনসম্পদে (রাষ্ট্রের ও সরকারের) অধিকার [51:19] সম্পর্কে অবগত।
রাষ্ট্রের সম্পদ মূলতঃ কাদের জন্য খরচ করতে হবে??
70:25 নং আয়াহ : (রাষ্ট্রের সমস্ত ধনসম্পদ) প্রার্থীদের জন্য এবং বঞ্চিতদের।
যারা বিচার দিবসকে সত্য হিসাবে জানে, তারাও।
70:26 নং আয়াহ : আর যারা বিচার দিবসকে (জবাব দিহিতাকে) সত্য [69:16-17, 84:1-5] জানে।
যারা আল্লাহর শাস্তিকে ভয করে, তারাও।
70:27 নং আয়াহ : এবং যারা তাদের প্রভুর শাস্তির ভয় ভীত।
যারা নিজেদেরকে আল্লাহর শাস্তি থেকে নিরাপদ ভাবে না, তারাও।
70:28 নং আয়াহ : নিশ্চয়ই যারা তাদের প্রভুর শাস্তি সম্পর্কে নিজেদেরকে নিরাপদ ভাবে না।
যারা যৌনাঙ্গ সংযত রাখে, তারাও।
70:29 নং আয়াহ : আর যারা তাদের যৌনাঙ্গ সমূহকে সংযত রাখে [23:5]।
দাসীদের ও স্ত্রীদের সঙ্গে যৌনাঙ্গের ব্যবহার করা যেত।
70:30 নং আয়াহ : তবে তাদের স্ত্রীদের কাছে অথবা তাদের ডান হাত সমূহের অধিনে যারা আছে (দাসী অর্থাৎ যুদ্ধ বন্দিনী/ ক্রীতদাসী), তারা ছাড়া। কেননা, সেক্ষেত্রে তারা নিন্দনীয় (১) হবে না [23:6]।
১) আসলে ইসলামের প্রাথমিক যুগে দাসদাসী রাখা, দাসীর সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক অনুমোদিত ছিল। এজন্য অনুমোদিত ছিল যে, সেই যুগে এটা খারাপ বলে বিবেচিত হোত না। তাই কুরআন প্রাথমিক যুগে দাসদাসী রাখা, দাসীর সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক করা হারাম ঘোষণা করে নি, করলে তা প্রাথমিক যুগে ইসলাম গ্ৰহণ করা মানুষরা মেনে নিতে পারত না।
প্রমাণ আছে কি?? “সেক্ষেত্রে তারা নিন্দনীয় হবে না”, এই অংশটি প্রমাণ করে যে, সেই যুগে এটা মোটেও খারাপ কাজ বলে বিবেচিত হোত না। তবে, প্রশ্ন হবে- সেই যুগে খারাপ বলে বিবেচিত না হলেও এই যুগে তা খারাপ বলে বিবেচিত হয়। তাহলে কুরআন কেন তার অনুমোদন করল?? পবিত্র কুরআন কি নিদিষ্ট কোনও যুগের জন্য??
এই অনুমোদন ছিল কিছু সময়ের জন্য। কিছুদিন পরেই পরে কুরআন ঘোষণা দেয় যে, তোমাদের দাসদাসীদের বিবাহ দিয়ে দাও (24:32)। আর 24:33 এ বলা হচ্ছে- যদি দাসদাসীদের বিবাহ না দাও, যদি দাসীর সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক কর, তাহলে দাসীর ইচ্ছার বিরুদ্ধে তার সঙ্গে জোর জবরদস্তি শারীরিক সম্পর্ক করা যাবে না।
তার পরবর্তীতে কুরআন 4:3 ও 4:25 এর মাধ্যমে দাসীর সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক করা হারাম ঘোষণা করে দেয়। মানে, মদ হারাম হওয়ার মতো দাসদাসী প্রথা ও দাসীর সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক ধীরে ধীরে হারাম করে দেওয়া হয়। যার সাক্ষ্য বহন করছে 47:4 আয়াহ। এ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে 90:13 টিকায়।
স্ত্রী ও দাসীদের ছাড়া অন্যত্রে যৌন সম্পর্ক হারাম করা হল।
70:31 নং আয়াহ : অতঃপর যে কেউ তাদের (স্ত্রী ও দাসীদের) ছাড়া অন্যদের কামনা করবে, তারাই সীমালঙ্ঘনকারী [23:7]।
# এর পূর্বে আরবে স্ত্রী ও ক্রীতদাসী ছাড়াও বেশ্য ও অন্য নারীদের সঙ্গে যৌন সম্পর্ক তৈরি করা ছিল সাধারণ ব্যাপার। এখানে স্ত্রী ও ক্রীতদাসী অন্যত্রে যৌন সম্পর্ক তৈরি হারাম করে দেওয়া হল। পরবর্তীতে 4:3 ও 4:25 আয়াতের মাধ্যমে দাসীদের সঙ্গেও যৌন সম্পর্ক তৈরি করা হারাম হয়ে যায়।
অর্থাৎ পবিত্র কুরআন প্রথমে যৌনতাকে একটি গণ্ডিতে আবদ্ধ করে। পরে স্ত্রী ছাড়া দাসীদের সঙ্গেও যৌন সম্পর্ক তৈরি করা হারাম করে দেওয়া হয়। এখানে কেউ নাবী (সা) এর দাসী সহবাসের প্রসঙ্গ আনতে পারেন। প্রসঙ্গ আনার দরকার নেই। কেননা, হাদীশটি দ্বায়িফ/ জয়ীফ। 66:1 এর টিকায় যান, বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে।
আমানত ও ওয়াদা রক্ষাকারী, তারাও।
70:32 নং আয়াহ : আর যারা আমানাত রক্ষা ও ওয়াদা পালনকারী।
যারা সত্যের জন্য সাক্ষ্য দানে অটল, তারাও।
70:33 নং আয়াহ : এবং যারা সত্যের পক্ষে [4:135] সাক্ষ্যদানে অটল।
যারা পুলিশ, তারাও।
70:34 নং আয়াহ : এবং যারা তাদের স্বালাত/ আল্লাহর বিধান রক্ষাকারী/ পুলিশ।
যারা উপরিউক্ত গুণের অধিকারী, তারাই জান্নাত সমূহে সম্মানিত হবে।
70:35 নং আয়াহ : তারাই হবে জান্নাত সমূহের মধ্যে সম্মানিত।
কাফিররা নাবী (সা) কে দলবল দ্বারা ভয় দেখানোর চেষ্টা করতো।
70:36 নং আয়াহ : এতএব যারা সত্য অস্বীকার করেছে, তাদের কি হল যে, তারা আপনার দিকে ছুটে আসছে!
70:37 নং আয়াহ : দলে দলে, ডান দিক থেকে ও বাম দিক থেকে।
জান্নাতের লোভ তো সবরই হয়, যতই মুখে ‛না’ বলুক।
70:38 নং আয়াহ : তাদের প্রত্যেকেই কি এই লোভ করে যে, তাকে নিয়ামত পূর্ণ জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে??
‛ভ্রুণ বিদ্যা’ সম্পর্কে জ্ঞান বৃদ্ধির ভবিষ্যৎ বাণী।
70:39 নং আয়াহ : কখনও (তাদেরকে জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে) না। আমরা তাদের যে ভাবে (ধাপে ধাপে) সৃষ্টি [39:6, 23:12-14] করেছি, তা তারা (বিজ্ঞানের উন্নতি হলেই) জানতে পারবে।
সূর্য প্রতিদিন ভিন্ন ভিন্ন স্থান থেকে উদিত হয় এবং অস্ত যায়।
70:40 নং আয়াহ : এতএব (তাদেরকে জান্নাতে দাখিল করানো হবে) না। আমি শপথ করছি সূর্যের ‛সমস্ত পূর্বস্থ স্থানের’ এবং সূর্যের ‘সমস্ত পশ্চিমস্থ স্থানের’ মালিকের [43:38, 55:17। নিশ্চয়ই আমরা সক্ষম।
অন্যান্য গ্ৰহে উত্তম/ অনুগত সৃষ্টি রয়েছে।
70:41 নং আয়াহ : এটা করতে যে, তাদের স্থলে তাদের চেয়ে উত্তম/ অনুগত (সৃষ্টি ভিন্ন গ্ৰহ থেকে) নিয়ে আসতে পারি [65:12, 42:29, 5:18]। আর তারা (যতই উন্নতি করুক) আমাদেরকে অতিক্রম করতে/ পরাজিত [72:12, 29:22] পারবে না ১।
১ কিন্তু কেন?? কারণ, আমরা সময়ের আওতায় থাকতে বাধ্য, তার বাইরে যেতে পারবো না। আমরা সময়ের হাতে বন্দী। আর আল্লাহ হলেন সময় (বুখারী, হাদীশ 6181)।
অপ্রয়োজনীয় কথাবার্তা ও কাজকর্ম থেকে দূরে থাকা।
70:42 নং আয়াহ : সুতরাং তাদেরকে ছেড়ে দিন। তারা মত্ত থাকুক অপ্রয়োজনীয় কথাবার্তায় এবং অপ্রয়োজনীয় কাজ কর্মে [39:8, 47:12]। ততক্ষণ পর্যন্ত, যতক্ষণ না তারা দেখা পায় সেদিনের, যেদিনের ওয়াদা তাদেরকে করা হয়েছে।
একত্রিত ভূমি থেকে সবাই বের হবে।
70:43 নং আয়াহ : সেদিন তারা দ্রুত গতিতে বের হবে ‛একত্রিত ভূমি’ থেকে [69:16-17, 84:1-5]। যেন তারা ছুটছে কোনও লক্ষ্যের দিকে [54:8]।
সত্য অস্বীকারকারীদের করুণ অবস্থা হবে।
70:44 নং আয়াহ : (সেদিন) তাদের দৃষ্টি নিচু থাকবে এবং তাদেরকে আচ্ছন্ন [54:7] থাকবে জিল্লাত/ লাঞ্ছনা তথা অপমান [10:27, 68:43]। ওটা সেদিনের ঘটনা হবে, যে দিনের ওয়াদা তাদেরকে দেওয়া হয়েছিল।