৭৮ নং সূরাহ | সূরাহ নাবা | Surah no 78 | Surah Naba |

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম। 

অর্থ- আল্লাহর নাম নিয়ে পড়া শুরু করছি, যিনি সীমাহীন দয়ালু এবং সীমাহীন করুণাময়।

নাযিল : মাক্কাহ, আয়াত : 40 টি।

কুরআনের সাফল্য ও বিশেষত্ব কি??

78:1 নং আয়াহ : তারা কোন বিষয়ে একে অপরকে জিজ্ঞাসাবাদ [69:48-50] করছে??

# গোটা পৃথিবীতে কুরআন সম্পর্কে যত আলোচনা হয়, পৃথিবীর অন্য কোনও ‌ব‌ই সম্পর্কে এত আলোচনা ইতিপূর্বে কোনও দিন হয় নি, হচ্ছে না, হবেও না। এটাই পবিত্র কুরআনের সাফল্য ও বিশেষত্ব।

বিজ্ঞানে ভরপুর কুরআন।

78:2 নং আয়াহ : মহান মহান তথ্য [54:5, 36:2] দ্বারা ভরপুর (কুরআন) সম্পর্কে [38:88]??

78:3 নং আয়াহ : যে বিষয়ে তারা নিজেরাই বিভিন্ন মতানৈক্য করছে??

কুরআন মিথ্যা নয়।

78:4 নং আয়াহ : কখনও (কুরআন মিথ্যা) নয়, শীঘ্রই তারা জানতে [41:53] পারবে।

78:5 নং আয়াহ : আবারও বলছি (কান খুলে শুনে রাখো), কখনও (কুরআন মিথ্যা) নয়। খুব শীঘ্রই তারা জানতে [38:88] পারবে।

পৃথিবীর প্লেট গুলো সঞ্চালন‌শীল।

78:6 নং আয়াহ : আমরা কি পৃথিবীর প্লেট গুলোকে সঞ্চালিত করি নি??

পাহাড় পর্বত পেরেকের মতো।

78:7 নং আয়াহ : এবং পাহাড় পর্বত গুলোকে কি পেরেক সদৃশ্য করি নি??

# পৃথিবীর ক্রাষ্ট/ ভূত্বক মূলত 15-75 KM মোটা। পর্বতীয় ভূমি‌তে 75 KM মতো মোটা। কেননা, এক Plate অন্য প্লেটের নিচে যাওয়ার কারণে সেখানকার ক্রাষ্ট ফোল্ড হয়ে পাহাড় পর্বত ও পর্বযমালা গুলো সৃষ্টি হয়। এত‌এব বলা যায়- পাহাড় পর্বত বা পর্বতমালা গুলোর গভীর মূল থাকে। 

   অর্থাৎ পাহাড় পর্বত বা পর্বতমালা গুলো যতটা উঁচু, তার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি তার মূল রয়েছে। যেন অনেকটা পেরেকের মতো। পেরেকের সামান্য একটু (মাথাটা) দেখা যায়, বেশিরভাগ‌টা থাকে ভিতরে। তাই এখানে পাহাড় পর্বত বা পর্বতমালা‌ গুলোকে পেরেকের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে।

   আমরা এখানে হিমালয় পর্বতমালা‌র কথা বলতে পারি। উচ্চতা 9 কিমির কাছাকাছি হলেও সেখানকার ক্রাষ্ট প্রায় 75 কিমি মতো মোটা। অর্থাৎ উপরে যতটা রয়েছে, যতটা দেখতে পাচ্ছি, তারচেয়ে প্রায় 9 গুণ বেশি রয়েছে নিচে।

মানুষের বিপরীত জীব/ বিপরীত সৃষ্টি হল- জিন।

78:8 নং আয়াহ : আর আমরা তোমাদের‌ বিপরীত জীব হিসাবে (জিন) সৃষ্টি করেছি [15:27]।

# সমস্ত সৃষ্টির বিপরীত বা এন্টি আছে। যেমন ধরুন- প্রোটনের বিপরীতে এন্টি প্রোটন আছে। ইলেকট্রনের বিপরীতে পজিট্রন আছে। কোয়ার্কের বিপরীতে এন্টি কোয়ার্ক আছে। পদার্থ/ ম‍্যাটারের বিপরীতে এন্টি ম‍্যাটার আছে। মহাবিশ্ব/ ইউনিভার্সের বিপরীতে এন্টি ইউনিভার্স আছে। তেমনই মানুষের বিপরীতে কিছু থাকা উচিৎ ছিল। আর তা হল- জিন।

ঘুম না হ‌ওয়ার কারণে মানসিক রোগ হয়।

78:9 নং আয়াহ : আর আমরা তো ঘুমকে নিয়ে আসি মানসিক পেরেসানি/ মানসিক রোগ দূর করার উপায় হিসাবে [40:61, 10:67]।

# যাদের মানসিক রোগ রয়েছে, তাদেরকে ডাক্তার এজন্য‌ই ঘুমের ওষুধ দেন। কারণ, মানসিক রোগের চিকিৎসা‌ই হল ঘুম।

রাত হয় কিভাবে??

78:10 নং আয়াহ : আর আমরা রাতকে নিয়ে আসি আড়াল সৃষ্টি করে [38:32, 91:4]। যেভাবে কাপড় দ্বারা কোনও কিছুকে আড়াল করা হয়।

# আসলে সৌরজগতে দিন/ রাত কিছুই নেই। পৃথিবীর ঘূর্ণনের ফলে পৃথিবীর এক অংশ সূর্যের সামনে অন্য অংশ সূর্যের বিপরীতে চলে যায়। সূর্যের সামনে দিন, বিপরীত দিকে রাত হয়।

সূর্যের আলো ও সৌরবিদ্যুৎ।

78:11 নং আয়াহ : আর আমরা দিন/ আলোকে নিয়ে আসি শক্তি (সৌরবিদ্যুৎ) অর্জনের [91:1] জন্য।

বায়ুমন্ডলের স্তর 7 টি।

78:12 নং আয়াহ : এবং তোমাদের উপর 7 টি বায়ুমন্ডলীয় সুদৃঢ় স্তর [23:17] বানিয়েছি।

সূর্য‌ই পৃথিবীতে আলো ও তাপের উৎস।

78:13 নং আয়াহ : আর আমরা প্রদীপ‌ (সূর্য) কে করেছি পৃথিবীতে আলো ও তাপের উৎস।

সূর্য তাপের কারণেই পানি বাষ্পীভূত হয়।

78:14 নং আয়াহ : আর আমরা (সূর্য তাপ দ্বারা সৃষ্ট) জলীয়বাষ্পে ভরপুর মেঘমালা থেকে বৃষ্টি নামাই।

78:15 নং আয়াহ : যেন তা দ্বারা আমরা বের করতে পারি ভুট্টা এবং উদ্ভিদ/ শাক সবজি।

অ্যামাজন রেইন ফরেষ্ট।

78:16 নং আয়াহ : এবং হারিয়ে যাওয়া‌র মতো রেইন ফরেষ্ট‌ [80:30, 56:73, 36:80] সমূহ।

বিচার দিবস নির্ধারিত রয়েছে।

78:17 নং আয়াহ : নিশ্চয়ই মিমাংসা দিবসটি নির্ধারিত সয়মেই আসবে।

শিংগায় প্রথম ফুঁ।

78:18 নং আয়াহ : সেদিন শিংগায় ফুঁ [27:87] দেওয়া হবে, তখন তোমরা (ঘরবাড়ি থেকে) দলে দলে বের হবে।

আমাদের মহাবিশ্ব‌ই জাহান্নামে পরিণত হবে।

78:19 নং আয়াহ : মহাবিশ্বকে নতুন (জাহান্নাম) রূপে সামনে আনা [89:23] আসবে [14:48]। অতঃপর তাতে বহু দরজা‌র [15:44] সৃষ্টি হবে।

# আমাদের এই মহাবিশ্ব‌ই জাহান্নামে পরিণত হবে। দেখুন 77:33 এর টিকা এবং 69:17 এর টিকা।

পৃথিবী পাহাড় পর্বতহীন হয়ে যাবে।

78:20 নং আয়াহ : পাহাড় পর্বত গুলোকে অস্থির করা হবে [99:1, 69:14] এবং তা মরিচিকা‌য় (সমান্তরাল [70:9, 20:105-107] ভূমি‌তে) পরিণত হবে।

78:21 নং আয়াহ : নিশ্চয়ই (তাদের জন্য) জাহান্নাম অপেক্ষা [70:17-18] করবে।

উগ্ৰ/ সীমালঙ্ঘন/ আইন ভঙ্গকারীদের পরিণতি জাহান্নাম।

78:22 নং আয়াহ : (জাহান্নাম) উগ্ৰ/ সীমালঙ্ঘন/ আইন ভঙ্গকারীদের ফিরে আসার [79:37, 19:72] স্থান।

জাহান্নামের শাস্তি কয়েকদিনের জন্য নয়।

78:23 নং আয়াহ : তারা সেখানে অবস্থান করে যুগ যুগ [2:80, 3:24] ধরে।

জাহান্নামী‌রা বিশ্রাম ও পানিয় পাবে না।

78:24 নং আয়াহ : তারা সেখানে বিশ্রামের স্বাদ পাবে না, আর না পাবে পানীয়,

জাহান্নামীদের পানিয় কেমন হবে??

78:25 নং আয়াহ : তবে পাবে অতি উত্তপ্ত পানীয় ও অত্যন্ত শীতল পানিয় [38:57]।

78:26 নং আয়াহ : এটাই তাদের প্রতিদান এবং তা তাদের জন্য উপযুক্ত।

জাহান্নামী‌দের বৈশিষ্ট্য।

78:27 নং আয়াহ : নিশ্চয়ই তারা হিসাব নিকাশকে (বিচার দিবসকে) পরোয়া করতো না।

78:28 নং আয়াহ : আর তারা আমাদের আয়াত গুলোর উপর অপবাদ দিয়ে অস্বীকার করতো।

আমাদের প্রতিটা কর্মের সংরক্ষণ চলছে।

78:29 নং আয়াহ : আমরা নিঁখুত [18:48] ভাবে (তাদের) সমস্ত কিছু গণনা সহ লিখিত [82:10-11] ভাবে সংরক্ষণ [50:17-18] করছি। 

জাহান্নামী‌দের যা বলা হবে।

78:30 নং আয়াহ : (বলা হবে) সুতরাং এখন শাস্তির স্বাদ নিতে থাকো। আমরা (এখন তোমাদের) শুধুই শাস্তি বৃদ্ধি করব।

পরবর্তী জীবনে সফল হবে কারা??

78:31 নং আয়াহ : নিশ্চয়ই মুত্তাকী (অপকর্ম থেকে দূরত্ব অবলম্বন‌কারী) দের জন‍্যেই [3:85] থাকবে (পরবর্তী জীবনের) সফলতা।

জান্নাতে বিভিন্ন ধরণের আঙুর থাকবে।

78:32 নং আয়াহ : (সেখানে থাকবে ভিন্ন ভিন্ন ফলের) বাগান সমূহ এবং বিভিন্ন ধরণের আঙুর [2:25, 69:23, 76:14] সমূহ।

জান্নাতী সঙ্গী/ সঙ্গীনি সমূহ।

78:33 নং আয়াহ : (তাদের জন্য সেখানে থাকবে) সমবয়স্ক নবযৌবন প্রাপ্ত সঙ্গী সমূহ/ সঙ্গী‌নি [56:37, 52:20] সমূহ।

# এখানে তাদের কথা বলা হচ্ছে, যারা ইহজীবনে বিবাহ ছাড়াই মারা গিয়েছে। হোক নারী বা পুরুষ। তারা সমবয়স্ক নবযৌবন প্রাপ্ত সঙ্গী সমূহ/ সঙ্গী‌নি সমূহ পাবে। তারাও পাবে, যাদের ইহজীবনে‌র স্বামী/ স্ত্রীর মধ্যে একজন জাহান্নামে যাবে, অন্য জন জান্নাতে। এখানে প্রশ্ন হবে- হুর কি?? জান্নাতী সঙ্গী/ সঙ্গীনি (52:20)। হুর শব্দের অর্থ হল- সাদা পোশাক পরিহিত/ পরিহিতা।

   প্রশ্ন হবে- যারা ইহজীবনে স্বামী স্ত্রী ছিল এবং উভয়েই জান্নাতে যাবে, তাদের কি হবে?? উত্তর সহজ- তারা জান্নাতে‌ও স্বামী স্ত্রী থাকবে (43:70)। তবে তাদেরকে সুদর্শন/ সুদর্শনা সমবয়স্ক নবযৌবন প্রাপ্ত/ প্রাপ্তা করে দেওয়া হবে (55:70)। তবে তারাও চাইলে ইচ্ছা মতো হুর পেতে পারে (50:35)।

এখন খুব গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হবে- “জান্নাতে যারা প্রবেশ করবে, তাদের বয়স কত হবে”?? নাবী (সা) বলেছেন- “জান্নাতে প্রবেশ‌ করার সময় জান্নাতীদের বয়স 30 বা 33 বছর” (তিরমিযী, হাদীশ 2545)। পুনরুত্থানের সময় কত হবে?? এক‌ই। জাহান্নামীদের বয়স কত হবে?? এক‌ই। জিনদের বয়স কত হবে?? মানুষের মতোই। মানে, পরবর্তী জীবনে সবার বয়স হবে 30 বা 33 বছর‌ই।

   কিন্তু প্রশ্ন হবে- “বয়স 30 বা 33 বছরই কেন হবে”?? উত্তর সহজ, বিজ্ঞান বলে- “30 বা 33 বছর পর থেকে প্রতি বছর মানুষের পেশি 3-10 শতাংশ হারে কমতে থাকে”। বিজ্ঞানের ভাষায় এটাকে Sarcopenia বলে। চাইলে গুগল করে দেখে নিন। মানে, 30 বা 33 বছর হল মানুষের যুবক/ যুবতী অবস্থার শেষ সীমা, এর পর থেকে মানুষ বুড়ো/ বুড়ি হতে থাকে। তাই আল্লাহ যুবক/ যুবতী অবস্থার সীমা বজায় রেখে পুনরুত্থানের আমাদের‌কে উঠাবেন।

জান্নাতে থাকবে পরিপূর্ণ পানপাত্র সমূহ।

78:34 নং আয়াহ : (সেখানে তাদের জন্য থাকবে) পরিপূর্ণ পানপাত্র [88:14, 76:15-16, 83:25-27] সমূহ।

জান্নাতে ফালতু কথাবার্তা ও মিথ্যা থাকবে না।

78:35 নং আয়াহ : তারা সেখানে শুনবে না কোনও ফালতু কথা বার্তা [19:62, 88:11], আর না শুনবে কোনও মিথ্যা [7:43, 15:47]।

78:36 নং আয়াহ : এগুলো আপনার প্রভুর পক্ষ থেকে প্রতিদান, হিসাব অনুযায়ী তা যথেষ্ট।

কেউ নিজ ইচ্ছায় শাফায়াত করতে পারবে না।

78:37 নং আয়াহ : যিনি মহাবিশ্ব ও পৃথিবী, আর যা কিছু রয়েছে উভয়ের মধ্যে (তার‌ও প্রভু)। তিনি রহমান, (তা সত্ত্বেও) তারা ১ তার সামনে কথা বলতে সক্ষম হবে না।

১ নাবী (সা) যুগে কেউ কেউ বলতেন- “অমুক মানুষ, অমুক নাবী, অমুক অমুক ফেরেস্তা‌রা আমাদের জন্য শাফায়াত করবে”। এখানে তাদেরকে জবাব দেওয়া হচ্ছে।

78:38 নং আয়াহ : সেদিন রূহ (জিবরীল) এবং (অন‍্যান‍্য) ফেরেস্তা‌রা সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে থাকবে। রহমান যাকে অনুমতি দেবেন [20:109, 19:87, 34:23], তিনি ছাড়া আর অন্য কেউ কোনও কথা বলতে পারবেন না [53:26]। আর (যিনি কথা বলবেন) তিনি উচিৎ কথাই বলবেন।

ইসলাম গ্ৰহণ করা, না করার স্বাধীনতা।

78:39 নং আয়াহ : সেই (বিচার) দিবস সত্য। সুতরাং এখন যে চায় [18:29, 76:3, 64:2], সে তার প্রভুর দিকে পৌঁছনোর পথ (ইসলাম) অবলম্বন করুক।

বিচার দিবসে সত্য অস্বীকার‌কারীদের আক্ষেপ।

78:40 নং আয়াহ : নিশ্চয়ই আমরা আসন্ন শাস্তি সম্পর্কে তোমাদের সতর্ক করছি। সেদিন তা (তাদের ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্র কর্ম স্ক্রিনে প্লে হতে) দেখবে [99:7-8], যা তার দু-হাত আগে পাঠিয়েছে। (তা দেখে) সত‍্য অস্বীকার‌কারী বলবে- “হায়, আজ যদি (আমিও মহাবিশ্বের) পদার্থের সঙ্গে মিশে [4:42] যেতাম”।

# অর্থাৎ মহাবিশ্বের সংকোচন হবে। প্রতিটা গ‍্যালাক্সি ও তাতে থাকা নক্ষত্র জগৎ মহাবিশ্বের কেন্দ্রে একত্রিত হতে থাকে এবং একত্রিত ভূমি গঠিত হবে। ঐ পদার্থের সঙ্গে আমাদের শরীর‌ও থাকবে। আল্লাহ আমাদের শরীর‌কে মহাবিশ্বের পদার্থ থেকে আলাদা করবেন এবং তাতে আত্মার সংযোজন করবেন (81:7, 82:4, 69:16-17, 84:1-5)। তাই তখন কাফির/ কাফিররা চাইবে- “যদি সে আবার‌ও ঐ পদার্থের সঙ্গে মিশে যেত, তাহলে হয়ত আল্লাহর শাস্তি থেকে বেঁচে যেত”।

5/5 - (1 vote)
শেয়ার করুন:

মন্তব্য করুন