বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম।
অর্থ- আল্লাহর নাম নিয়ে পড়া শুরু করছি, যিনি সীমাহীন দয়ালু এবং সীমাহীন করুণাময়।
নাযিল : মাক্কাহ, আয়াত : 40 টি।
কিয়ামাত দিবস সত্য।
75:1 নং আয়াহ : না, আমি শপথ করছি কিয়ামাত দিবসের।
# এখানে ‛না’ বলতে আসলে কি?? আসলে এটা আরবি বাক রীতি। যার আর্থ- মিথ্যা নয়। মিথ্যা নয় বলতে- কিয়ামত দিবস মিথ্যা নয়। অর্থাৎ তা সত্য। তাই শপথ করা হচ্ছে।
আল্লাহ নাবী (সা) এর শপথ করলেন।
75:2 নং আয়াহ : এবং না, আমি শপথ করছি নিজেকে তিরষ্কার কারীর/ দোষী ১ সাব্যস্ত কারীর
১ আসলে এখানে আল্লাহ নাবী (সা) এর শপথ করেছেন। ঘটনাটা উল্লেখ রয়েছে 80:1-2 এ। নাবী (সা) এর কাছে একজন দৃষ্টিহীন মানুষ ইসলাম/ কুরআন জানতে এসে ছিলেন। কিন্তু নাবী (সা) তার উপর বিরক্ত হয়েছিলেন। ঐ ঘটনার পেক্ষিতে আল্লাহ নাবী (সা) কে ধমক দিয়েছিলেন এবং তিরষ্কার করেছিলেন। শুধু ধমক ও তিরষ্কার নয়, কিছু দিন যাবত ওহী নাযিল বন্ধও ছিল। এই পেক্ষিতেই সূরাহ দুহা নাযিল হয়েছিল।
ঐ ঘটনার পর থেকে নাবী (সা) সর্বদা নিজেকে তিরষ্কার করতেন/ নিজেকে সর্বদা দোষী মনে করতেন। আর সেই পেক্ষিতেই আল্লাহর কাছে নাবী (সা) এর গুরুত্ব বোঝাতে আল্লাহ নাবী (সা) এর শপথ করছেন। যদিও নাবী (সা) এর সেই ভুলের জন্য আল্লাহ ক্ষমা করে দিয়েছেন। বিস্তারিত তথ্য রয়েছে 80:1 এর টিকায়।
সংশয়বাদী/ নাস্তিকরা এটাই ভাবে।
75:3 নং আয়াহ : মানুষ কি ভাবে যে, আমরা তার হাড় গুলোকে একত্রিত [16:38] করতে পারবো না??
আঙুলের ছাপের গুরুত্ব।
75:4 নং আয়াহ : কেন পারবো [50:15, 75:40] না?? বরং আমরা তার ‛আঙুলের গুরুত্বপূর্ণ অংশটাও’ (১) পুনরায় পূর্ণ বিন্যাস্ত করতে পারবো।
১) আঙুলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হল- আঙুলের ছাপ, এতে সন্দেহ নেই। কিন্তু প্রশ্ন হবে- চোখের রেটিনাও তো গুরুত্বপূর্ণ, সেই সম্পর্কে কোথায় কথা বলা হয়েছে?? আপনাকে যেতে হবে 40:19 এ। যান ঘুরে আসুন।
পুনরুত্থান অস্বীকারের কারণ।
75:5 নং আয়াহ : বরং মানুষ ভবিষ্যতেও কুকর্ম [12:53] করতে চায়।
# আর এই জন্যই বেশিরভাগ নাস্তিক পুনরুত্থান অস্বীকার করে। কারণ, পুনরুত্থান মানেই জবাবদিহিতা। আর তারা তো জবাবদিহিতা থেকেই রেহাই পেতে চায়। তবেই অবৈধ যৌনাচারে লিপ্ত হতে পারবে। পুনরুত্থান মানেই হারামকে হারাম মেনে নিতে হবে। তাদের সমস্যাটা এখানেই।
সৌরজগৎ ধ্বংস দিবস।
75:6 নং আয়াহ : সে জিজ্ঞাসা করে- কিয়ামত/ সৌরজগৎ ধ্বংস দিবসটা কবে অনুষ্ঠিত হবে??
75:7 নং আয়াহ : যখন পরিস্থিতি অনুভব করে ভয়ে ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে চোখ দাঁড়িয়ে যাবে।
সুদূর ভবিষ্যতে চাঁদ পৃথিবীর উপগ্রহ থাকবে না।
75:8 নং আয়াহ : এবং যখন চাঁদ [54:1] গণ্ডি পেরিয়ে যাবে।
# আসলে চাঁদ প্রতি বছর 2-4 ইঞ্চি করে পৃথিবী থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। একটা সময়ে চাঁদ পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ বলকে হারিয়ে দিয়ে পৃথিবীর গণ্ডি পেরিয়ে যাবে।
চাঁদের পরিণতি।
75:9 নং আয়াহ : সূর্যের সঙ্গে চাঁদের ধাক্কা হবে (এর ফলে সূর্য বিস্ফরিত [70:8, 52:9-10] হবে)।
সৌরজগতের বাসিন্দাদের পরিণতি।
75:10 নং আয়াহ : সেদিন (যারা সৌরজগতে/ পৃথিবীতে থেকে যাবে) সেই সমস্ত মানুষরা [52:22] বলবে- “এখন পালাবার স্থান কোথায়”??
75:11 নং আয়াহ : মোটেও না, পালিয়ে যাওয়ার কোনও স্থান পাবে না।
75:12 নং আয়াহ : সেদিন (মৃত্যুর পর) তাদের স্থান হবে একমাত্র [75:30-31] আপনার প্রভুর কাছে।
মানুষকে তার আমলনামা পড়তে দেওয়া হবে।
75:13 নং আয়াহ : সেই দিবসে মানুষকে জানিয়ে [17:14] দেওয়া হবে সেই বিষয়, যা সে আগে পাঠিয়েছে এবং যা সে পিছনে ছেড়ে এসেছে [36:12]।
মানুষ তার নিজের পাপ ও পূণ্য সম্পর্কে জানে।
75:14 নং আয়াহ : যদিও মানুষ তার নিজের (পাপ ও পূণ্য) সম্পর্কে যথেষ্ট ভাবে জানে।
ভিন্ন অনুবাদ : কিন্তু তবুও মানুষ তার নিজের (পাপ ও পূণ্য) চোখে দেখতে পাবে [99:7-8]।
ভিন্ন অনুবাদ : তবে মানুষ একদিন নিজের শরীর সম্পর্কে যথেষ্ট জ্ঞান অর্জন করবে [51:21]।
ভিন্ন অনুবাদ : কিন্তু মানুষ একদিন নিজেকে বাস্তবের চেয়েও বেশি সুক্ষ্ম ভাবে দেখতে পাবে।
মানুষের সবচেয়ে খারাপ গুণ/ বৈশিষ্ট্য।
75:15 নং আয়াহ : যদিও সে নিজের (পাপের পক্ষে) বিভিন্ন অজুহাত পেশ করে/ যুক্তি দেখায়।
নাবী (সা) ওহী ভুলে যাওয়ার ভয় করতেন।
75:16 নং আয়াহ : আপনি তাড়াতাড়ি (ওহী মুখস্থ করার) জন্য দ্রুত জিহ্বা সঞ্চালন [87:6] করবেন না।
# আসলে নাবী (সা) সর্বদা কুরআন ভুলে যাওয়ার ভয় করতেন। এজন্য জিবরীল (আ) তার কাছে পাঠ করার সঙ্গে সঙ্গে তিনি দ্রুত মুখস্ত করে নিতে চাইতেন। সেই জন্য এখানে তাকে তা করতে নিষেধ করা হচ্ছে। অন্যত্রে বলা হয়েছে- “আমরা আপনাকে মুখস্থ করিয়ে দেব, আপনি কখনও তা ভুলে যাবেন না”(87:6)।
ওহী/ কুরআন একত্রিত ও অবিকৃত রাখার দায়িত্ব আল্লাহ নিয়েছিলেন।
75:17 নং আয়াহ : নিশ্চয়ই তা একত্রিতকরণ [17:106, 76:23] এবং (যেভাবে নাযিল হচ্ছে, সেভাবে) পাঠ করানোর দায়িত্ব [15:9, 87:6] রয়েছে আমাদের উপর।
# অনেকেই পবিত্র কুরআন গ্ৰন্থাবদ্ধ ও উসমান (রা) এর ভূমিকা সম্পর্কে প্রশ্ন তোলেন। কিন্তু পবিত্র কুরআন নাবী (সা) লিখিত অবস্থায় রেখে গিয়েছিলেন। এই সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে আয়াত রয়েছে 80:13 ও 52:2-3 এ। আর শুধু লিখিত অবস্থায় নয়, নাবী (সা) নিজে তো হাফিজও ছিলেন এবং হাজার হাজার হাফিজ তৈরিও করে গিয়েছিলেন।
আজও আমরা লিখিত পবিত্র কুরআনের উপর ভরসা রাখি না, ভরসা রাখি বর্তমানের লক্ষ লক্ষ হাফিজদের উপর। তাদের মধ্যে হোসেন কুরানীও অন্যতম একজন হাফিজ। সুতরাং উসমান (রা) এর দ্বারা কুরআন বিকৃত করা সম্ভব ছিল না। কেননা, তখন ছিল কয়েক হাজার নয়, লক্ষ লক্ষ হাফিজ। কারণ, তখন প্রায় প্রতিটা মুসলিম নারী ও পুরুষই তখন হাফিজ হতেন।
এমনকি উসমান (রা) এর দ্বারা পবিত্র কুরআনের সূরাহ এবং আয়াত নিজের ইচ্ছায় সাজানোরও কোনও সুযোগ ছিল না। কারণ, ছিল লক্ষ লক্ষ হাফিজ। এমনকি উসমান (রা) নিজেও হাফিজ ছিলেন। সেই জন্যই প্রশ্ন হয়- যদি উসমান (রা) এর দ্বারা কুরআনের সূরাহ ও আয়াত সাজানো হয়ে থাকে, তাহলে তিনি কিভাবে পবিত্র কুরআন, সূরাহ ও আয়াত সাজানোর পূর্বে হাফিজ হলেন??
যাইহোক, পবিত্র কুরআন সাজানো হয়েছিল আল্লাহর ইচ্ছা অনুযায়ি। অর্থাৎ কোন সূরাহ কার পরে/ আগে হবে, কোন আয়াহ কার পরে/ আগে হবে ইত্যাদি (75:17 ও 75:19 তার প্রমাণ)। পবিত্র কুরআন নাবী (সা) এর যুগে হতেই সাজানো ছিল। তার প্রমাণ হাদীশেও রয়েছে। পেশ করছি হাদীশটা।
দেখুন- “প্রতি বছর জিবরীল (আ) নাবী (সা) কে এক বার কুরআন শোনাতেন ও তার থেকে শুনতেন। কিন্তু যে বছর তার মৃত্যু হয়, সে বছর তিনি রাসূল (সা) দু বার শুনিয়েছেন ও শুনেছেন”(বুখারী, হাদীস 4998)। যা প্রমাণ করে পবিত্র কুরআনের সূরাহ ও আয়াত সমূহ আল্লাহর নির্দেশ মুতাবিক সাজানো ছিল। যদিও নাযিল হয়েছিল এলোমেলো ভাবে। আর কোনও প্রমাণ দেওয়ার প্রয়োজন আছে কি??
প্রশ্ন হবে- “রজমের ও দুধ পানের আয়াত সম্পর্কে কিছু বলুন”। বলব। ওগুলো ক্ষণিক সময়ের বিধান প্রদান করার জন্য আয়াত হিসাবে নাযিল হয়েছিল। যা পরে তিলাওয়াত ও বিধান হিসাবে অন্য আয়াহ দ্বারা রহিত হয়ে যায়। নাবী (সা) তা কুরআন হিসাবে লিপিবদ্ধ করান নি (হাকিম, হাদীশ 8071)। এমনকি যখন উমার (রা) নাবী (সা) কে বললেন- “তা কুরআনে লিপিবদ্ধ করা হোক। তখন নাবী (সা) বললেন : আমি তা করতে পারব না” (নাসাঈ কুবরা, হাদীশ 7110)। কারণ, তা পাঠ হিসাবে রহিত হয়ে গিয়েছিল। তবে বিধান হিসাবে নাবী (সা) তা চালু রেখেছিলেন।
বলে রাখি যে, এই প্রসঙ্গে উমার (রা) প্রায় একথা বলতেন- “আর কিছু মানুষ বলে : রজম করার কী দরকার! আল্লাহর কিতাবে তো কেবল বেত্রাঘাতের কথাই আছে। (তারপর উমার বলেন) অথচ আল্লাহর রাসূল (সা) রজম করেছেন এবং আমরাও তাঁর পরে রজম করেছি। যদি লোকেরা এই কথা না বলত যে, ’তিনি (উমার) আল্লাহর কিতাবে এমন কিছু সংযোজন করেছেন, যা তাতে নেই, তাহলে আমি রজমের আয়াতটি যেভাবে নাযিল হয়েছিল, সেভাবেই তা কিতাবে লিপিবদ্ধ করতাম” (নাসাঈ কুবরা, হাদীশ 7116)। তিনি এজন্য তা করেন নি, কেননা নাবী (সা) তা লিপিবদ্ধ করতে নিষেধ করেছিলেন।
এখন প্রশ্ন হবে- “ছাগলে খাওয়া আয়াত সম্পর্কে বলুন” (ইবনে মাজাহ, হাদীশ 1944)। বলব তো। ঐ রহিত আয়াত গুলোই তাতে লেখা ছিল, যা ছাগলে খেয়েছিল। সুতরাং তা যদি ছাগলে খেয়েই ফেলে, তাতে কি ক্ষতি হবে! দ্বিতীয়ত, ঐ আয়াত গুলোতে কি ছিল, তাও হাদীশে সুরক্ষিত রয়েছে (ইবনে মাজাহ, হাদীশ 2553 ও মুসলিম হাদীশ, 1452/1)।
প্রশ্ন হবে- “রজমের আয়াতের তিলাওয়াত ও বিধান কোন আয়াহ দ্বারা রহিত হয়”?? 24:2 দেখুন। আর দুধ পানের আয়াত দুটি?? 4:23 দ্বারা। বলে রাখা ভাল- আজও যদি পৃথিবীর সমস্ত কুরআন জ্বালিয়ে দেওয়া হয়, তাতে কি পবিত্র কুরআন নষ্ট হয়ে যাবে?? না, পৃথিবীতে প্রায় এক কোটি হাফিজ রয়েছে। পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন বা অসম্ভব কাজ হল- পবিত্র কুরআন বিকৃত করা।
প্রশ্ন হবে- “তাহলে আবুবকর (রা) কুরআন সংগ্রহ কেন করেছিলেন”?? নাবী (সা) সমগ্র পবিত্র কুরআন লিপিবদ্ধ অবস্থায় রেখে গিয়েছিলেন, আর রেখে গিয়েছিলেন হাজার হাজার হাফিজ। কিন্তু নাবী (সা) বই আকারে তা রেখে যান নি। আবুবকর (রা) শুধুমাত্র পবিত্র কুরআনকে বইয়ের রুপ দিয়েছিলেন।
আর উল্লেখযোগ্য বিষয় হল- আবুবকর নিজেও হাফিজ ছিলেন। বই আকারে প্রকাশ করার দায়িত্ব পেয়েছিলেন যায়িদ ইবনু সাবিত (বুখারী, হাদীশ 4986)। তিনিও হাফিজ ছিলেন। তিনি শুধু হাফিজই ছিলেন না, তিনি নাবী (সা) এর যুগে অন্যতম ওহী লেখক ছিলেন। ওহী লেখকদের চরিত্র সম্পর্কে আল্লাহ সাক্ষ্য দিয়েছেন 80:15-16 তে।
যাইহোক, কুরআন মোট 7 টি আরবি গোত্রীয়/ আঞ্চলিক ভাষায় নাযিল হয়েছিল (মুসলিম, হাদীশ 819/1 ও 818/1)। প্রশ্ন হবে- “7 টি গোত্রীয়/ আঞ্চলিক ভাষায় বলতে কি রকম”?? কুরাইশ গোত্র সহ অন্য আরও 6 টি গোত্রীয়/ আঞ্চলিক ভাষায়। যেমন- বাংলা ভাষার বহু আঞ্চলিক রুপ রয়েছে, ঐ রকম। যেমন- “আমার নাম হোসেন কুরানী” অথবা “হামার নাম হোসেন কুরানী”। “আমার” শব্দ “হামার” হয়ে গেল। অথচ উভয়ই বাংলা, অর্থ একই কিন্তু শাব্দিক ভিন্নতা রয়েছে। ঐ রকম।
আবুবকর (রা) এর নির্দেশে যে কুরআন সংকলন করা হয়েছিল, তা সংকোলিত হয়েছিল 7 টি আরবি গোত্রীয়/ আঞ্চলিক ভাষাতেই। যা আবুবকর (রা) এর কাছেই ছিল। পরে উমার (রা) খলিফা হলেন, তখন তার কাছে ছিল। তার মৃত্যুর পর তার কন্যা ও নাবী (সা) এর স্ত্রী হাফসাহ (রা) এর কাছে রাখা ছিল। এই হলো কাহিনী।
প্রশ্ন হবে- “তাহলে উসমান (রা) কুরআন সংকলন করে ছিলেন কেন”?? সংকলন করেন নি, শুধু আবুবকর (রা) এর 7 আরবি গোত্রীয়/ আঞ্চলিক ভাষা্য সংকলন থেকে কুরাইশ সংকলনকে আলাদা করেছিলেন। আর তাও নিজ ইচ্ছায় নয়। বহু সাহাবা (রা) এর পক্ষে ছিলেন। বিস্তারিত জানতে চাইলে বুখারীর 4987 হাদীশটি দেখে নিন।
প্রশ্ন হবে- “আলাদা করার প্রয়োজন হলো কেন”?? এ প্রশ্নের উত্তরও সহজ। আসলে 7 গোত্রীয়/ আঞ্চলিক ভাষাতেই পবিত্র কুরআনের প্রচলন ছিল এবং ঐ 7 গোত্রীয়/ আঞ্চলিক ভাষার হাফিজও ছিল। ধীরে ধীরে ইসলাম প্রচার ও প্রসার হচ্ছিল। যারা ইসলাম সম্পর্কে অল্প জানতেন, তারা একটি আরবি গোত্রীয়/ আঞ্চলিক ভাষার পবিত্র কুরআনকেই “সঠিক” বলে মনে করছিলেন, অন্য গোত্রীয়/ আঞ্চলিক ভাষার পবিত্র কুরআন গুলোকে “ভুল” বলে মনে করছিলেন।
মুসলিম উম্মাহকে এই মতবিরোধ/ ফিতনা থেকে বাঁচানোর জন্যেই উসমান (রা) উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তাও নিজ হতে উদ্যোগ নেন নি। যাইহোক, প্রথমে তিনি হাফসাহ (রা) এর কাছে থাকা মূল পবিত্র কুরআনটি নিসে আসেন। তারপর সেখান থেকে শুধু কুরাইশদের ভাষায় নাযিল হওয়া পবিত্র কুরআন আলাদা করে দেন। কেননা, নাবী (সা) এর ভাষা ছিল কুরাইশ আরবি। আর সেই কুরাইশদের ভাষার পবিত্র কুরআনই আজ আমাদের কাছে রয়েছে।
এখানে একটা প্রশ্ন হবে- “উসমান (রা) কি অন্য 6 টি গোত্রীয়/ আঞ্চলিক ভাষার পবিত্র কুরআনকে ধ্বংস করে দিলেন না”?? না, প্রথম থেকেই পবিত্র কুরআন 7 টি গোত্রীয়/ আঞ্চলিক ভাষায় নাযিল হচ্ছিল না। কুরাইশদের ভাষাতেই নাযিল হচ্ছিল (মুসলিম, হাদীশ 819/1)। নাবী (সা) এর বিশেষ অনুরোধে একাধিক গোত্রীয়/ আঞ্চলিক ভাষায় নাযিল করা হয়।
সুতরাং উসমান বিশেষ অনুরোধে নাযিল করা অন্যান্য 6 টি গোত্রীয়/ আঞ্চলিক ভাষার পবিত্র কুরআনকে রহিত করে দেন উম্মাহর স্বার্থে। পবিত্র কুরআনের নির্দেশনাকে সামনে রেখেই। আল্লাহ বলেছেন- “ফিতনা হত্যার চেয়েও মারাত্মক”(2:191)। এছাড়াও মুসলিম উম্মাহ বিভক্ত হয়ে পড়ছিল, যা 3:103 ও 8:46 আয়াতের বিরুদ্ধে যাচ্ছে। তাই উসমান (রা) এর সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল, তা পবিত্র কুরআন বিরোধী সিদ্ধান্ত ছিল না।
আরেকটা প্রশ্ন- “তাহলে 15:9 এর কি হবে! যেখানে আল্লাহ পবিত্র কুরআন রক্ষার ঘোষণা করেছেন”?? উত্তর সহজ- আল্লাহ পবিত্র কুরআন রক্ষার ঘোষণা করেছেন, তাই আজও কুরআন সুরক্ষিত। আল্লাহ বলেন নি যে, 7 গোত্রীয়/ আঞ্চলিক ভাষাতেই কুরআন রক্ষা করব।
75:18 নং আয়াহ : সুতরাং যখন আমরা তা পাঠ করি, তখন আপনি পাঠের অনুসরণ করুন।
ওহী/ কুরআন বুঝিয়ে দায়িত্বও নিয়েছিলেন আল্লাহ।
75:19 নং আয়াহ : তারপর তা (ওহী) বুঝিয়ে দেওয়ার ১ দায়িত্বও আমাদের।
১ ‛বুঝিয়ে দেওয়ার’ বলতে কি?? পবিত্র কুরআনের কোন সূরাহ কার আগে/ পরে হবে, কোন আয়াহ কার আগে/ পরে হবে ইত্যাদি।
মানুষ ইহজীবনের সুখ চায়, কিন্তু মৃত্যু সমস্ত কিছু কেড়ে নেবে।
75:20 নং আয়াহ : মোটেও এর বিপরীত হবে না। তোমরা ইহজীবনকে [87:16] ভালোবাসো।
কিন্তু মানুষ পরবর্তী জীবন চায় না, যদিও সেখানে মৃত্যু নেই!
75:21 নং আয়াহ : এবং তোমরা পরবর্তী জীবনকে তুচ্ছ ভেবে [87:17] নিয়েছো (অথচ তা উত্তম ও স্থায়ী)।
বিচার দিবসে কিছু মুখমণ্ডল উজ্বল হবে।
75:22 নং আয়াহ : সেদিন (বিচার দিবসে) কিছু মুখমণ্ডল উজ্বলতায় [80:38-39] ভরে যাবে।
উজ্বল মুখমণ্ডলের পরিণতিই আল্লাহর দর্শন লাভ।
75:23 নং আয়াহ : (তারা) তার প্রভুর (সিদ্ধান্তের) দিকে অপালক ভাবে তাকিয়ে [84:6] থাকবে।
বিচার দিবসে কিছু মুখমণ্ডল ম্লান হবে।
75:24 নং আয়াহ : এবং সেই দিবসে (বিচার দিবসে) কিছু মুখ মন্ডল হবে ম্লান/ অনুজ্বল [80:40]।
ম্লান মুখমণ্ডলের পরিণতিই কঠোর ব্যবহার।
75:25 নং আয়াহ : সে ভেবে নেবে যে, তার সঙ্গে কোমর ভাঙা/ কঠোর ব্যবহার করা হবে।
রূহের কাজ স্নায়ুতন্ত্রকে সচল রাখা।
75:26 নং আয়াহ : (এমন ভাবা) মোটেও ভুল নয়। যখন স্নায়ুতন্ত্র থেকে রূহ/ আত্মা [17:85, 2:28] আলাদা হতে থাকবে।
আল্লাহ ঝাড়ফুঁককে ব্যঙ্গ বিদ্রুপ করলেন।
75:27 নং আয়াহ : তখন বলা হবে- “ঝাড়ফুঁক ১ করে (তোমাকে উদ্ধার করার) মতো কেউ আছে কি”??
১ অর্থাৎ ঝাড়ফুঁক তোমাকে উদ্ধার করতে/ বাঁচতে পারবে না। এর অর্থ- ঝাড়ফুঁক কার্যকারী নয়। এটা কুসংস্কার ও গোঁড়ামি। একটা হাদীশ দেখুন- “নিশ্চয়ই ঝাড়ফুঁক, তাবীজ ও বিভিন্ন ধরণের বালা/ আংটি/ সুতা ব্যবহার করা শিরক”(আবু দাউদ, হাদীস 3883)।
75:28 নং আয়াহ : তখন সে বুঝে নেবে- শেষ সময় এসে গেছে।
আত্মা বারযাখে যেতে চাইবে না, কিন্তু যেতেই হবে।
75:29 নং আয়াহ : এবং তার পায়ের সঙ্গে পা জড়িয়ে যাবে (না যাওয়ার ইচ্ছায়)।
# ‛পায়ের সঙ্গে পা জড়িয়ে যাবে’। এটা আরবি বাক রীতি, প্রবাদ। যার অর্থ- সে আলমে বারযাখে যেতে চাইবে না এবং সে আবারও ইহজীবনে ফেরত আসতে চাইবে, যাতে শাস্তি থেকে বাঁচতে পারে (23:99-100)। পরবর্তী আয়াত গুলো দেখলে তা পরিষ্কার হয়ে যাবে।
# অনেকেই এই আয়াহকে পরবর্তী জীবনের কিংবা বিচার দিবসের ঘটনা বলে মনে করেন। আসলে তা নয়। চাইলে দেখুন 70:43 আয়াহ।
75:30 নং আয়াহ : (কিন্তু) সেদিন তাকে আপনার প্রভুর দিকে যেতেই [9:101] হবে।
বারযাখে কেন যেতে চাইবে না??
75:31 নং আয়াহ : কারণ- সে না সত্য স্বীকার করছিল, আর না স্বালাত (আল্লাহর বিধান) পালন করেছিল।
75:32 নং আয়াহ : কিন্তু সে (কুরআনের প্রতি) অপবাদ দিয়েছিল এবং (তা হতে) মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল।
75:33 নং আয়াহ : পরে সে দাম্ভিকতা [31:18] দেখিয়ে তার পরিবার পরিজনের [83:31, 84:13] কাছে গিয়েছিল।
দাম্ভিকতা/ অহংকারের পরিণতি ধ্বংস, শুধুই ধ্বংস।
75:34 নং আয়াহ : (হে দাম্ভিকতা দেখানো ব্যক্তি) ধ্বংস তোমার জন্য, শুধুই ধ্বংস।
75:35 নং আয়াহ : আবারও (বলছি) ধ্বংস তোমার জন্য, শুধুই ধ্বংস [44:49-50]।
সংশয়বাদী/ নাস্তিকরা এটাই ভাবে।
75:36 নং আয়াহ : মানুষ কি এই ধারণা [45:24] করে যে, তাকে (ইহজীবনে) ছেড়ে দেওয়া [23:115, 69:16-17, 84:1-5] হবে অনন্তকালের [75:30] জন্য!
একটি মাত্র শুক্রাণু ডিম্বাণুকে নিষিক্ত করে।
75:37 নং আয়াহ : সে কি বের হওয়া বীর্যের মধ্যে একটি মাত্র শুক্রাণু [53:46] ছিল না??
# বলে রাখা ভালো যে, একবার বের হওয়া বীর্যের পরিমাণ প্রায় 4 ML মতো। যাতে প্রায় 40 লক্ষ শুক্রাণু থাকে।
# প্রশ্ন হবে- “শুধুমাত্র শুক্রাণু থেকে কি মানুষের সৃষ্টি হয়?? ডিম্বাণুর কি কোনও ভূমিকা নেই”?? আছে, এই সম্পর্কে কথাও বলা হয়েছে 76:2 এ। তবে শুক্রাণুর উল্লেখ এজন্য করা হয়েছে যে, শুক্রাণুর X ও Y সন্তানের লিঙ্গ নির্ধারণ করে।
নিষিক্ত ডিম্বাণু পরিণত হয় আলাকাহতে।
75:38 নং আয়াহ : পরে (নিষিক্ত ডিম্বাণু) পরিণত হয় আলাকাহতে [96:2]। অতঃপর তিনি তা হতে বিভিন্ন ধাপে ধাপে [39:6, 23:14] সৃষ্টি করেন সুগঠিত দেহ/ সত্ত্বা।
আলাকাহ হতেই জমজের সৃষ্টি হয়।
75:39 নং আয়াহ : অতঃপর তিনি তা (আলাকাহ) হতেই সৃষ্টি করেন জমজ সন্তান। এছাড়াও পুরুষ ও নারীতেও জমজ (সৃষ্টি করেন)।
পুনরুত্থানের পক্ষে অকাট্য যুক্তি।
75:40 নং আয়াহ : (যিনি জমজ সৃষ্টি করতে পারেন) তিনি কি মৃতকে জীবিত [17:50, 36:78-79] করতে সক্ষম হবেন না [19:66-67, 50:15]??