বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম।
অর্থ- আল্লাহর নাম নিয়ে পড়া শুরু করছি, যিনি সীমাহীন দয়ালু এবং সীমাহীন করুণাময়।
নাযিল : মাক্কাহ, আয়াত : 28 টি।
কুরআন বিস্ময়কর/ মনোমুগ্ধকর।
72:1 নং আয়াহ : বলুন- “আমার প্রতি ওহী করা হয়েছে যে, জিনদের একদল মনোযোগ সহ শুনেছে”। এবং তারা বলেছে- “নিশ্চয়ই আমরা বিস্ময়কর/ মনোমুগ্ধকর কুরআন ১ শুনেছি [46:29-30]।
১ প্রথমবার পবিত্র কুরআন শুনেই তারা কিভাবে বুঝল যে, তা পবিত্র কুরআন?? আসলে তাদের কাছে পূর্বে প্রেরিত রাসূলরা এ সম্পর্কে তাদের জানিয়ে রেখেছিলেন (6:130, 3:81)।
# এখানে কোনও ইসলাম বিদ্বেষী বলতে পারেন- “জিনদের নামে শুধু কুরআনের প্রশংসা করা হয়েছে”! আসলে তা নয়। হোসেন কুরানী’র এই অনুবাদটি সম্পূর্ণ পড়ুন, জিনদের মতো আপনিও ইমান আনতে বাধ্য হবেন। বলতে বাধ্য হবেন- “নিশ্চয়ই আমরা বিস্ময়কর/ মনোমুগ্ধকর কুরআন পড়েছি”!
কুরআন কল্যাণকর পথের সন্ধান দেয়।
72:2 নং আয়াহ : যা মহা সত্যে পৌঁছনোর [84:6] পথ দেখায়। অতঃপর আমরা স্বীকার করেছি তাকে। আর আমরা কখনও আমাদের প্রভুর সঙ্গে কাউকে শরিক [31:13] করব না।
আল্লাহর স্ত্রী ও সন্তান নেই।
72:3 নং আয়াহ : আর এও যে, তিনি সমস্ত কিছুর ঊর্ধ্বে, সমস্ত মর্যাদা তারই জন্য। আমাদের প্রভু না স্ত্রী গ্ৰহণ করেছেন, আর না সন্তান [6:101, 2:116-117]।
বোধবুদ্ধিহীনরাই আল্লাহ সম্পর্কে মিথ্যা বলে।
72:4 নং আয়াহ : এবং এও যে, আমাদের মধ্যে যারা বোধ বুদ্ধিহীনরাই আল্লাহ সম্পর্কে সীমাহীন মিথ্যা বলত।
মানুষ ও জিন উভয়ই আল্লাহ সম্পর্কে মিথ্যা বলে।
72:5 নং আয়াহ : এবং এও যে, আমরা ভাবতাম- মানুষ ও জিন আল্লাহ সম্পর্কে কখনও মিথ্যা [22:3, 22:9] বলতে পারে না!
জিনদের কাছে আশ্রয় প্রার্থনা হারাম।
72:6 নং আয়াহ : এবং এও যে, মানুষদের মধ্যে কিছু মানুষ জিনদের কাছে আশ্রয়/ সাহায্য প্রার্থনা করত। এভাবে তারা জিনদের অহংকার বাড়িয়ে ছিল।
জিনরাও ভেবেছিল- আল্লাহ আর রাসূল পাঠাবেন না।
72:7 নং আয়াহ : এবং এও যে, তারা (মানবজাতি) তেমনই ভেবেছিল, যেমন তোমরা ভেবেছিলে যে, আল্লাহ রাসূল হিসাবে কাউকে পাঠাবেন না।
জিনরা সৌরজগততে যেতে পারছিল না।
72:8 নং আয়াহ : এবং এও, আমরা চারিদিকে খোঁজ খবর নিয়েছি। এমনকি সৌরজগতেও। সেখানে পেয়েছি কঠোর পাহারা। আর অগ্নিশিখা [67:5, 37:7-10]।
জিনরা ইতিপূর্বে ফেরেস্তাদের কথাবার্তা শুনতো।
72:9 নং আয়াহ : এবং এও, আমরা পূর্বে সেখানে বসতাম (ফেরেস্তাদের কথাবার্তা) শোনার জন্য, কিন্তু এখন যে (কথাবার্তা) শুনতে যাবে, সে পাবে অগ্নিশিখা।
কি হচ্ছিল, জিনরা বুঝতে পারছিল না।
72:10 নং আয়াহ : এবং এও, আমরা বুঝতে পারছিলাম না যে, পৃথিবীবাসীর ক্ষতি হতে চলেছে, নাকি তাদের প্রভু তাদের কল্যাণ চাইছেন??
# আসলে পবিত্র কুরআন একবার নয়, দু বার নাযিল হয়েছিল। একবার একত্রিত ভাবে, আরেকবার 22/23 বছর ধরে ধীরে ধীরে এবং প্রয়োজন মুতাবিক। প্রথমবার একত্রিত ভাবে পবিত্র কুরআন নাযিল হয় সৌরজগতের কোনও একটি স্থানে। এজন্য জিনদের পৃথিবীর বাইরে সৌরজগত ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা জারি করে দেওয়া হয়। যদিও ইতিপূর্বে তারা সৌরজগৎ ভ্রমণ করতে পারতো। বাকিটা 72:8-9 এ রয়েছে। আরও দেখুন 97:1 এর টিকা।
কিন্তু কেন এই নিষেধাজ্ঞা, সেটা জিনরা বুঝতে পারছিলেন না। তাই তারা চারিদিকে খোঁজ শুরু করে যে, কেন সৌরজগৎ ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। অবশেষে তারা নাবী (সা) কে একদল সাহাবা সহ হেজাজের উকাজ বাজারে ফজরের নামাজে কুরআন তিলাওয়াত করতে শোনেন। তখন তারা বুঝতে পারেন যে, এই কারণেই তাদের সৌরজগৎ ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে (বুখারী, হাদীশ 4921)।
জিনরাও বিভিন্ন দলে মতে বিভক্ত।
72:11 নং আয়াহ : এবং এও, আমাদের মধ্যে কেউ পূণ্যবান, আর কেউ তেমন (পূণ্যবান) নয়। আমরা ছিলাম বিভিন্ন তারীকাতে (মত ও পথে) বিভক্ত।
আল্লাহকে পরাজিত করা অসম্ভব।
72:12 নং আয়াহ : এবং এও, এখন আমরা বুঝতে [72:6] পারলাম যে, আমরা পৃথিবীতে আল্লাহকে কখনও পরাজিত করতে পারব না। আর না (মহাশূন্যে) পালিয়ে [35:44] গিয়ে তাকে পরাজিত [29:22] করতে পারব [11:20]।
কিছু জিন কুরআন স্বীকার করে নিল।
72:13 নং আয়াহ : এবং এও, আর যখন আমরা শুনলাম পথনির্দেশের বাণী। তখন আমরা তাকে স্বীকার করলাম [72:1]। আর যে স্বীকার করবে তার প্রভুকে, না তাকে প্রাপ্য অপেক্ষা কম (প্রতিদান) দেওয়া হবে, আর তার সঙ্গে কোনও অন্যায় করা [10:44, 36:54] হবে।
জিনরাও মুসলিম এবং কাফিরে বিভক্ত।
72:14 নং আয়াহ : এবং এও, আমাদের মধ্যে কিছু রয়েছে মুসলিম, আর কিছু সত্য বিমুখ। আর যে (আল্লাহর কাছে) আত্মসমর্পণ করল, তারাই বেছে নিল কল্যাণের [72:2] পথ।
সত্য বিমুখরাই জাহান্নামের জ্বালানি হবে।
72:15 নং আয়াহ : অন্যদিকে যারা সত্য বিমুখ, তারা হবে জাহান্নামের জ্বালানি”[2:24, 66:6]।
আরব বিশ্বে তেল উৎপাদনের ভবিষ্যৎ বাণী।
72:16 নং আয়াহ : আর যদি তারা সঠিক তারিকা (মত ও পথের) দৃঢ় [72:11] থাকত, তাহলে তাদেরকে অবশ্যই প্রচুর পরিমানে তরলের ভান্ডার [95:1, 87: প্রদান করতাম।
আরব বিশ্বের শাসকদের পরিণতি।
72:17 নং আয়াহ : যাতে আমরা তাদেরকে পরীক্ষা করতে পারি। আর যে মুখ ফিরিয়ে নেবে তার প্রভু বিধান ১ থেকে, তাকে প্রদান করবেন সীমাহীন শাস্তি।
১ কোনও কোনও শাসক আল্লাহর বিধান হতে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল (যেমন- ইরাকের সাদ্দাম হোসেন, লিবিয়ার মুহাম্মাদ গাদ্দাফি)। তারা সীমাহীন শাস্তি ভোগের মাধ্যমে মৃত্যু বরণ করেছিল।
আল্লাহর সঙ্গে অন্য কাউকে ডাকা হারাম।
72:18 নং আয়াহ : মাসজিদ সমূহ আল্লাহরই, সুতরাং আল্লাহর সঙ্গে অন্য কাউকে [31:13] ডেক না।
নামাজে নাবী (সা) কে বাধা দেওয়া হোত।
72:19 নং আয়াহ : আর আল্লাহর বান্দা (মুহাম্মাদ) যখন তাকে (আল্লাহকে) ডাকার জন্য দাঁড়ালেন। তখন তারা (মাক্কাহর ইসলাম বিরোধীরা) তাকে ঘিরে [96:9-10] ধরার চেষ্টা করল।
নাবী (সা) নাবী হওয়ার আগেও কখনও শিরক করেন নি।
72:20 নং আয়াহ : বলুন- “আমি মূলত আমার প্রভুকে [26:213, 28:88] ডাকি। আর তার সঙ্গে কাউকে শরিক [31:13, 39:11] করি [39:14] না” (১)।
১) ‛করবো না’ অর্থ- আগে করতেও পারি, নাও পরি। কিন্তু পরে করবো না। তবে “করি না” অর্থ- আগে করতাম না। পরে করবো কি, পরের কথা। যেমন- ‛আমি ভাত খাই না’ অর্থ- আগে কখনও খাই নি।
তারমানে কি?? তারমানে হল- নাবী (সা) ওহী পাওয়ার আগেও শিরক করতেন না। কিছু হাদীশের গ্ৰন্থেও এর সমর্থনে হাদীশ রয়েছে। যেমন বুখারীতে বলা হয়েছে- নাবী (সা) মূর্তির/ দেব দেবীর নামে যাবেহ করা পশুর মাংস খেতেন না, শুধু বিসমিল্লাহ বলে যাবেহ করা পশুরই মাংস খেতেন (হাদীশ 5499)।
এছাড়াও তাওয়াফের সময় মূর্তি স্পর্শ করে প্রার্থনা করা ছিল একটি আরবিয় রীতি। একবার নাবী (সা) এর মুক্ত করা দাস তথা পালিত পুত্র যায়েদ বিন হারেসাহকে নিয়ে কাবাগৃহ তাওয়াফ করছিলেন। সে সময় যায়েদ মূর্তিকে স্পর্শ করলে তিনি তাকে নিষেধ করেন। দ্বিতীয়বার যায়েদ আরেকটি মূর্তিকে স্পর্শ করেন, বিষয়টির নিষেধাজ্ঞার ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়ার জন্য। তিনি পুনরায় তাকে নিষেধ করেন। এরপর থেকে নাবী ঘোষণা হওয়ার আগ পর্যন্ত যায়েদ কখনও মূর্তি স্পর্শ করেননি। তিনি কসম করে বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা) কখনোই মূর্তি স্পর্শ করেননি। অবশেষে আল্লাহ তাকে ওহী প্রেরণের মাধ্যমে সম্মানিত করেন (তাবারানী কাবীর, হাদীশ 4668 এবং হাকেম, হাদীশ 4956)।
নাবী (সা) এর অলৌকিক ক্ষমতা ছিল না।
72:21 নং আয়াহ : এও বলুন- “আমি তোমাদের কোনও ক্ষতি করার বা উপকার করার ক্ষমতা রাখি [10:49] না”।
নাবী (সা) কোনও কিছু বানিয়ে বলেন নি।
72:22 নং আয়াহ : এও বলুন- “নিশ্চয়ই (আমি যদি কিছু বানিয়ে বলি, তাহলে) আল্লাহর শাস্তি থেকে কেউ কখনও আমাকে বাঁচাতে [10:15] পারবে না [39:13, 46:8]। আর তিনি ছাড়া আর কোথাও কোনও আশ্রয়ও পাব না [69:44-47]।
রিসালাত/ বার্তা প্রচার করাই নাবী (সা) এর দায়িত্ব।
72:23 নং আয়াহ : “শুধু আল্লাহর রিসালাত/ বার্তা প্রচার করাই আমার দায়িত্ব [16:82, 5:67, 88:21-22]। অতঃপর যে আল্লাহকে ও তার রাসূলকে অমান্য করবে, তবে নিশ্চয়ই তার জন্য থাকবে জাহান্নামের আগুন। আর তাতে তারা অনন্তকাল থাকবে”।
মাক্কাহ বিজয়ের ভবিষ্যৎ বাণী।
72:24 নং আয়াহ : শীঘ্রই তারা দেখতে পাবে তা, যার (মক্কা বিজয়ের) ওয়াদা [110:1-2] করা হয়েছে। তারা দেখতে পাবে- কে দুর্বল সাহায্যকারী, কারা সংখ্যায় ১ অনেক কম!
১ মাক্কাহর ইসলাম বিরোধীরা বলত- “আল্লাহ তোমাকে সাহায্য করছে না কেন?? তারমানে- তিনি (আল্লাহ) দুর্বল সাহায্যকারী। আর ইসলাম যদি সত্যই হয়, তাহলে তোমরা (মুসলীমরা) সংখ্যায় এত কম কেন”?? এখানে তাদেরকে জবাব দেওয়া হচ্ছে।
কিয়ামতের দিন ক্ষণ নাবী (সা) জানতেন না।
72:25 নং আয়াহ : বলুন- “আমি জানি না, যে (কিয়ামতের) ওয়াদা করা হয়েছে তোমাদের কাছে, তা নিকটেই, নাকি তার জন্য আমার প্রভু কোনও দীর্ঘ মেয়াদ স্থির [20:15] করেছেন।
গায়েবের জ্ঞান শুধু আল্লাহর কাছে।
72:26 নং আয়াহ : তিনিই শুধুমাত্র গায়েব [6:59] সম্পর্কে জানেন, তিনি তা কারোর কাছে প্রকাশ করেন না,
রাসূলদের কাছে গায়েবের জ্ঞান প্রকাশ করা হয়।
72:27 নং আয়াহ : তবে তার মনোনীত রাসূল ছাড়া [4:113]। অতঃপর নিশ্চয়ই তিনি তার আগে ও পিছে প্রহরী লাগিয়ে দেন,
ওহী সম্পর্কে সাবধানতা ও ওহীর গুরুত্ব।
72:28 নং আয়াহ : যাতে তিনি নিশ্চিত ভাবে জেনে নিতে ১ পারেন যে, তারা (রাসূলরা) তাদের প্রভুর রিসালাত/ বার্তা পৌঁছে দিচ্ছেন কিনা [5:67]। যা (ওহী) তাদের কাছে আছে, তা তিনি ঘিরে রেখেছেন। আর প্রত্যেকটা (শব্দ ও অক্ষর) গুণে রাখেন” [69:44-47]।
১ আল্লাহ কি সরাসরি জানতে পারেন না?? তিনি কি ফেরেস্তাদের উপর নির্ভরশীল?? উদাহরণ দিই?? ধরুন- আমি রান্না করতে পারি, তাবলে কি আমি বাড়িতে কাজের লোক রাখতে পারবো না?? কাজের লোক রাখার মানে এই নয় যে, আমি কাজের লোকের উপর নির্ভরশীল। আল্লাহ সরাসরিও জানতে পারেন, দেখুন- 3:15, 84:15 আয়াত।