বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম।
অর্থ- আল্লাহর নাম নিয়ে পড়া শুরু করছি, যিনি সীমাহীন দয়ালু এবং সীমাহীন করুণাময়।
নাযিল : মাক্কাহ, আয়াত : 20 টি।
নাবী (সা) কে আদুরে সম্বোধন।
73:1 নং আয়াহ : হে চাদর জড়িয়ে [74:1] শুয়ে ঘুমিয়ে থাকা ব্যক্তি।
আট ঘন্টার বেশি ঘুমানো ভালো নয়।
73:2 নং আয়াহ : উঠুন [74:2], অল্প সময় ছাড়া রাত্রি জাগরণ করুন।
চার থেকে ছয় ঘন্টা ঘুমানো।
73:3 নং আয়াহ : অর্ধেক রাত বা তার চেয়ে একটু কম রাত্রি জাগরণ করুন।
# ‛অর্ধেক রাত’ বলতে- 6 ঘন্টা, ‛তারচেয়ে একটু কম’ বলতে- 4 ঘন্টা মতো। পরের আয়াহতে 8 ঘন্টা ঘুমানোর নির্দেশনা রয়েছে।
■ আট ঘন্টা ঘুমানো। ■ কুরআন ধীরস্থির ভাবে পড়ে উপলব্ধি করা।
73:4 নং আয়াহ : অথবা (অর্ধেক রাতের) একটু বেশি ১। আর কুরআন পাঠ করুন ধীরস্থির ২ ভাবে।
১ ‛একটু বেশি’ বলতে 8 ঘন্টা মতো ধরে নিন। অর্থাৎ ঘুমের পরিমাণ হওয়া উচিৎ 4-8 ঘন্টা। এই নির্দেশনা শুধু রাতের জন্য প্রযোজ্য। দিনেও ঘুমানো যায় (24:61, 30:23)। বিস্তারিত তথ্য রয়েছে 73:20 তে।
২ ‛ধীরস্থির ভাবে’ বলতে- যেন কি বলা হয়েছে, তা গভীরে গিয়ে উপলদ্ধি করতে পারো (4:43)। শুধু গাধার মতো পড়ে চলে যাওয়ার কোনও মূল্য নেই, তা অর্থহীন (62:5)। মনে রাখতে হবে- পবিত্র কুরআন গবেষণার জন্য নাযিলকৃত বই, শুধু পড়ে চলে যাওয়ার বই নয় (38:29, 47:24)।
# বলে রাখা দরকার যে, ভারত উপমহাদেশের সাধারণ মুসলিমরা পবিত্র কুরআন না বুঝেই পাঠ করে। পবিত্র কুরআনের এরচেয়ে বেশি অপমান আর কি হতে পারে! আমরা গবেষণার বইটিকে শুধুমাত্র খতম করার বইয়ে পরিণত করেছি।
শুধুমাত্র পড়ে চলে যাওয়ার বইয়ে পরিণত করেছি। শুধুমাত্র নেকির আশায় পড়ে থাকি। বাড়িতে ভুতপ্রেত না আসে, সেই জন্য পড়ে থাকি। ভুতপ্রেত তাড়াবার জন্য পড়ে থাকি। আহা! এ কি অপমান! যদিও মহাবিশ্বে ভুতপ্রেত নেই। আর ‛জিন ধরা’ বলে কিছু হয় না।
বলে রাখা ভাল যে, আরবি কুরআন আরবদের জন্য বোঝা সহজ। আমাদের জন্য খুবই কঠিন, তাই নিজের মাতৃভাষায় কুরআন পড়তে হবে। এমনই ইঙ্গিত রয়েছে 14:4 এ এবং 41:44 এ।
কুরআন গুরুত্বপূর্ণ বাণী।
73:5 নং আয়াহ : নিশ্চয়ই আমরা আপনার উপর গুরুত্বপূর্ণ [56:81, 86:13-14] বাণী/ কুরআন নাযিল করছি।
রাত গবেষণা ও আত্মসংযমের কার্যকর।
73:6 নং আয়াহ : নিশ্চয়ই রাত্রি জাগরণ আত্মসংযমের জন্য অধিক উপযোগী এবং স্পষ্ট ভাবে মনোযোগ দিয়ে পাঠ করার জন্য কার্যকর সময়।
# তারমানে এই নয় যে, ঘুম ত্যাগ করে গবেষণা ও আত্মসংযম করতে হবে। কমপক্ষে 4 ঘন্টা ঘুমাতে হবে।
আল্লাহ মানুষের পরিস্থিতি বোঝেন।
73:7 নং আয়াহ : নিশ্চয়ই দিনের বেলা আপনার দীর্ঘ কর্ম ব্যস্ততা রয়েছে।
তাহাজ্জুদ নামাজ আদায়ের ইঙ্গিত।
73:8 নং আয়াহ : সুতরাং (রাত্রিতে) আপনি আপনার প্রভুর নাম স্মরণ [17:79] করুন। আর (পার্থিব বিষয় চিন্তা ভাবনা থেকে নিজেকে দূরে রেখে) তার প্রতি খুবই গভীর ভাবে নিমগ্ন হয়ে যান।
আল্লাহই ওয়াকীল/ উকিল।
73:9 নং আয়াহ : তিনি পূর্ব ও পশ্চিমের প্রভু [2:115] । তিনি ছাড়া কোনও উপাস্য [21:22, 23:91] নেই। এতএব তাকেই ওয়াকীল/ উদ্ধারকারী হিসাবে [4:132, 17:54]।গ্ৰহণ করুন।
মানুষের কটাক্ষকে উপেক্ষা করার নিয়মনীতি।
73:10 নং আয়াহ : আর তারা যা বলে, তাতে আপনি ধৈর্য্য ধারণ করুন। এবং তাদেরকে অতি ভদ্রতার সঙ্গে পরিহার করুন।
আল্লাহ মানুষকে অবকাশ দেন।
73:11 নং আয়াহ : আর আমার উপর ছেড়ে দিন অপবাদ দাতা ও বহু নিয়ামতের অধিকারীদের। এবং তাদেরকে (কিছু দিনের জন্য) অবকাশ দিন [63:10-11, 2:15, 3:178]।
জাহান্নামীরা শিকলে বাঁধা থাকবে।
73:12 নং আয়াহ : নিশ্চয়ই আমাদের কাছে আছে শিকল [69:32, 104:9, 111:5] ও প্রজ্বলিত আগুন [104:6-7]।
জাহান্নামে কুলগাছ থাকবে, তাই হবে তাদের খাদ্য।
73:13 নং আয়াহ : আর (তাদের জন্য) আছে কাঁটাযুক্ত খাদ্য [17:60, 56:32] ও কষ্টদায়ক শাস্তি [104:6-7]।
টেকটোনিক প্লেটের সঞ্চালন।
73:14 নং আয়াহ : সেদিন টেকটোনিক প্লেট ও পর্বত গুলো অধিক সঞ্চালিত হবে [99:1]। আর (এ কারণে) পর্বত গুলো ধূলার স্তুপের মতো ধসে [101:5, 20:105-107] পড়তে থাকবে।
নাবী (সা) মূলতঃ মূসা (আ) এর মতোই ছিলেন।
73:15 নং আয়াহ : নিশ্চয়ই আমরা তোমাদের প্রতি একজন রাসূল পাঠিয়েছি তোমাদের উপর সাক্ষী [2:143, 4:41] করে। ঠিক যেমন ফিরআউনের প্রতি পাঠিয়েছিলাম একজন (১) রাসূল [44:17]।
# এখানে নাবী (সা) কে মূসা (আ) এর সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। প্রশ্ন হবে- কেন?? উত্তরটা বাইবেলে রয়েছে। ঈশ্বর মূসা (আ) কে বলছেন- “I will raise up for them a Prophet like you from among their brethren, and will put My words in His mouth, and He shall speak to them all that I command Him” (ডিউটোরনোমি- 18:18, NKJV)।
এর অনুবাদ হবে এমন- “আমি এমন একজনকে নাবী বানাবো, যিনি হবেন আপনার মতো। আর তা তাদের (বানী ইসরাঈলদের) ভাইদের (আরবদের) মধ্যে থেকে। আমি আমার বাক্য/ ওহী তার মুখে দেব। আর তিনি তাই বলবেন, যা আমি তাকে বলতে বলবো”। যাইহোক, 38:4 ও 40:24 দেখুন, মূসা (আ) এবং নাবী (সা) এর মধ্যে দারুণ মিল দেখতে পাবেন।
১) কিন্তু ফিরআউনের কাছে তো একজন রাসূলকে পাঠানো হয় নি, দুজন রাসূলকে পাঠানো হয়েছিল (20:43, 26:15)। তাহলে এখানে একজন বলা হল কেন?? এটা যেমন পরস্পর বিরোধী তথ্য, তেমনই ব্যাকারণগত ভুলও, আবার তা গাণিতিক ভুলও!
তাহলে এখন উত্তর কি হবে?? উত্তর সহজ। এখানে মূলতঃ নাবী (সা) এর সঙ্গে মূসা (আ) এর সঙ্গে তুলনা করা হচ্ছে। তাই এখানে হারূন (আ) এর কথা বাদ দিয়ে শুধু মূসা (আ) এর কথা তুলে ধরা হয়েছে।
এছাড়াও 26:10-13 পড়ুন। দেখতে পাবেন- মূসা (আ) এর অনুরোধে হারূন (আ) কে রাসূল বানানো হয় (19:53)। নেতৃত্ব ছিল মূসার হাতে। তাই এখানে শুধু মূসার কথা বলা হচ্ছে।
এছাড়াও আরও একটি কারণ হল- মূসা (আ) ও হারূন (আ) এর উদেশ্য ছিল একই। তাই এখানে উভয়কে একজন গণ্য করা হয়েছে। এটা কোনও ব্যাকারণগত ভুল নয়, পরস্পর বিরোধী তথও নয়। এটা পবিত্র কুরআনের সৌন্দর্য্য। পবিত্র কুরআনে এই বিষয়টি একবার নয়, বহু স্থানে দেখা যাবে। এই ধরণের উদাহরণ 20:63 তেও আছে। এবং 51:38 এও। সেখানেও মূসা (আ) ও হারূন (আ) কে উদেশ্যর ভিত্তিতে একজন গণ্য করা হয়েছে। আর পবিত্র কুরআনে দুজনকে একজন, একজন কে বহুজন বলে গণ্য করার রীতি রয়েছে।
পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে- “তুব্বা জাতি (50:24) রাসূলদের অস্বীকার করেছিল”। আবার বলা হয়েছে- নূহের জাতি 26:105, আদ জাতি (26:123),সামূদ জাতি (26:141), লূতের জাতি (26:160), আইকাবাসীরা রাসূলদেরকে (26:176) অস্বীকার করেছিল”। কিন্তু এখানে লক্ষ্যণীয় বিষয় হল- এদের কাছে একজনের বেশি রাসূল যায় নি। তবুও বলা হচ্ছে- রাসূলদের অস্বীকার করেছিল। কেন?? এগুলো সুস্পষ্ট ব্যাকারণগত ভুল! গাণিতিক ভুল!
উত্তর কি হবে?? উত্তর সহজ- আসলে প্রত্যেক রাসুলের মূল বক্তব্য ছিল একই (16:36, 21:25), তাদের শরিয়তও ছিল একই (41:43, 42:13)। তাই তারা তাদের কাছে প্রেরিত রাসূলকে অস্বীকার করার মাধ্যমে সমস্ত রাসুলদেরকেই অস্বীকার করেছিল। একজন রাসূলকে অস্বীকার করার অর্থই হল- সমস্ত রাসুলকে অস্বীকার করা। তাই এখানে একজন রাসূল (মূসা) কে অস্বীকার করার কথা বলা হয়েছে। ফিরআউন মূসা (আ) কে অস্বীকার করার মাধ্যমে হারুন (আ) কেও অস্বীকার করেছিল।
তাই এখানে একজনের উল্লেখ করা হয়েছে। পবিত্র কুরআনে এ রকম উদাহরণ প্রচুর রয়েছে। এগুলো পবিত্র কুরআনের ব্যাকারণগত ভুল নয়, পবিত্র কুরআনের বিশেষ বৈশিষ্ট্য ও আরবি ভাষা অলংকার।এই জন্যই তো আমরা বলি- “আমরা রাসূলদের মাঝে পার্থক্য করি না”(2:136, 2:285)।
ফিরআউন মূসা (আ) কে অস্বীকার করলো।
73:16 নং আয়াহ : অতঃপর ফিরআউন রাসূলকে অস্বীকার করলো। এতএব আমরা তাকে কঠোর ভাবে [10:90] ধরলাম ১।
১ এটা আরবি বাক রীতি। যার অর্থ- কঠোর শাস্তি দিলাম। ‛ধরলাম’ বলতে- হাত দিয়ে ধরা নয়।
শিশুদের আচরণ হবে প্রাপ্ত বয়স্কদের মতো।
73:17 নং আয়াহ : তোমরা কিভাবে (রাসূলকে) অস্বীকার করো! শীঘ্রই এমন দিন আসতে চলেছে, যেদিন শিশুরা প্রাপ্ত বয়স্কদের মতো আচরণ করবে।
# এই ভবিষ্যৎ বাণী পূর্ণ হয়ে গেলে ছোট পরিসরে। এটা বোঝার জন্য বিশেষ ধরণের পান্ডিত্যের প্রয়োজন হবে না। আপনার আশেপাশের শিশুদের দেখুন। আমাদের মধ্যে যে বয়সে যেসব সুঝবুঝ আসত, এই সোস্যাল মিডিয়ায় যুগে তা বদলে গেলে। আমরা 18-20 বয়সে যে সব আচরণ করতাম, আজকে 10 বছরের শিশু সেই আচরণ করছে।
পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ভবিষ্যৎ বাণী।
73:18 নং আয়াহ : খুব শীঘ্রই বায়ুমণ্ডল ক্ষতিগ্রস্ত হবে। (এটা প্রমাণ যে) তার সব ওয়াদা বাস্তবায়িত হবে।
# এই ভবিষ্যৎ বাণীও পূর্ণ হয়ে গেছে। এর জন্য আর অপেক্ষা করার দরকার নেই। পরিবেশ সচেতনতা থাকলেই তা অনুমেয়। তবে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল ক্ষতির চরম পর্যায়ে এখনও পৌঁছায় নি।
ইসলাম গ্ৰহণে জোরজবরদস্তি নেই।
73:19 নং আয়াহ : নিশ্চয়ই এটা (কুরআন) জীবন বিধান। সুতরাং যে চায়, সে তার প্রভুর পথ গ্ৰহণ [18:29, 2:256, 88:21-22] করুক।
সাধারণ মানুষ তাহাজ্জুদ নামাজে যা পাঠ করবে।
73:20 নং আয়াহ : নিশ্চয়ই আপনার প্রভু ভাল জানেন যে, আপনি রাতের প্রায় তিন ভাগের দু ভাগ, কখনও অর্ধেক রাত, কখনও তিন ভাগের এক ভাগ জাগরণ করেন [73:3-4]। এবং আপনার সঙ্গে যারা আছে, তাদের মধ্যে একটি দলও। আল্লাহই রাত ও দিনের পরিমাণ (কম ও বৃদ্ধি হওয়া) ব্যবস্থায়িত করে দিয়েছেন [43:38]। তিনি ভাল জানেন যে, তোমরা (প্রতিটা ক্ষণ মেপে) হিসাব (রেখে জাগরণ) করতে পারবে না। তাই তিনি তোমাদেরকে ক্ষমা করে দিয়েছেন। এতএব (নামাজে) কুরআন থেকে যতটা সহজে পাঠ করা যায়, তা পাঠ করো [73:3-4]। তিনি জানেন যে, তোমাদের মধ্যে কেউ আছে রোগী, কেউ আল্লাহর অনুগ্রহ সন্ধানে (ব্যাবসা বাণিজ্য করতে) পৃথিবীতে সফর করবে, কেউ আল্লাহর পথে যুদ্ধ করবে। সুতরাং (নামাজে) তোমরা তা (কুরআন) থেকে যতটা সহজে পাঠ করা যায়, তা পাঠ করো [73:3-4]। এবং তোমরা স্বালাত/ আল্লাহর বিধান প্রতিষ্ঠা করো এবং তার জন্য যাকাত/ ট্যাক্স দাও। (তার সঙ্গে সম্ভব হলে) আল্লাহকে ‛উত্তম ঋণ’ দাও [64:17, 2:245, 2:261]। এবং তোমরা নিজেদের জন্য উত্তম যা কিছু আগে পাঠাবে, তা আল্লাহর কাছে সঞ্চিত/ রক্ষিত পাবে। এবং প্রতিদান হিসাবে অতি উত্তম কিছু পাবে। আর তোমরা ক্ষমা চাও [39:53], নিশ্চয়ই আল্লাহ ক্ষমাশীল ও করুণাময়।