নাবী (সা) কে কটুক্তি ও তার শাস্তি।

লেখকের কথা।

বলা হয়- শাতিমুর রাসূল বা শাতিমে রাসূলের শাস্তি হল মৃত্যু‌দণ্ড। এমন কথা আলেমগণের মুখে কথা শুনে শুনে বড় হয়েছি। কিন্তু এমন বক্তব্য না পেয়েছি কুরআনে, আর না পেয়েছি কোনও সহীহ হাদীশে। তবুও যে সমস্ত হাদীশকে সহীহ বলে পেশ করা হয়, সেগুলো দেখব, আপনাদেরকে দেখাব। যে সমস্ত সহীহ হাদীশকে বিকৃত করে তুলে আনা হয়, সেগুলো‌ও দেখব, আপনাদেরকে দেখাব।

সব শেষে আপনার মনে হবে- আমরা আলেমদের থেকে একটা “নকল ইসলাম” শিখেছি, তারা আমাদের‌কে “নকল ইসলাম” শিখিয়েছেন। আর এভাবেই মুসলিম সমাজ‌কে গোঁড়ামি, কুসংস্কার ও উগ্ৰতা‌র দিকে ঠেলে দিয়েছেন। আর ইসলাম‌কে বে-হিসেব ভাবে বদনাম করে চলেছেন, মানে পরোক্ষভাবে।

বিপ্লবী, হোসেন কুরানী আল হিন্দি।

শাব্দিক বিশ্লেষণ।

শাতিমুর রাসূল বা শাতিমে রাসূল শব্দের অর্থ কি?? শাতিম শব্দের অর্থ- ব‍্যঙ্গ বিদ্রুপ, অপমান, কটুক্তি, গালাগালি ইত্যাদি। রাসূল অর্থ- প্রেরিত, যাকে প্রেরণ করা হয়েছে। শাতিমুর রাসূল বা শাতিমে রাসূল শব্দের অর্থ হল- রাসূল‌কে ব‍্যঙ্গ বিদ্রুপকারী, অপমানকারী, কটুক্তিকারী, গালাগালি দাতা।

নাবী (সা) কে কটুক্তি, কুরআনের নির্দেশ কি??

নাবী (সা) কে উদ্দেশ্য করে আল্লাহ বলেছেন- “অবশ্যই আমরা জানি, তারা আপনাকে যে কটুক্তি করে, তাতে আপনার মন/ মস্তিষ্ক সংকুচিত হয়” (কুরআন, 15:97)। এরপর বলা হয়েছে- “এত‌এব আপনি ধৈর্য্য ধারণ করুন, তারা যা বলে তাতে। আর আপনি তাদেরকে উদাহরণ সৃষ্টি‌কারী ভাবে ইগনোর করুন” (কুরআন, 73:10)। আরও বলা হয়েছে- “তাদেরকে উদাহরণ সৃষ্টি‌কারী ভাবে ক্ষমা করে দিন” (কুরআন, 15:85)। আরও বলা হয়েছে- “যারা ধৈর্য্য ধরে ও ক্ষমা করে, তারাই মূলত দৃঢ় সংকল্প ও সৎসাহস রাখে” (কুরআন, 42:43)।

যাইহোক, আল্লাহ বলেছেন- “সমান নয় উৎকৃষ্ট ও নিকৃষ্ট। শত্রুর নিকৃষ্ট‌কে আচরণ‌কে উৎকৃষ্ট আচরণ দ্বারা আঘাত করুন। ফলত দেখবেন- আপনার সঙ্গে শত্রুও আপনার অন্তরঙ্গ বন্ধুতে পরিণত হয়েছে” (কুরআন, 41:33)। এর মতো বক্তব্য রয়েছে 23:96, 28:54 আয়াতে।

নাবী (সা) কে কটুক্তি, হাদীশ যা বলে।

আইশাহ (রা) বলেছেন- “নাবী (সা) তাঁর জীবনে কখনও খারাপের সঙ্গে খারাপ আচরণ করতেন না। তিনি ক্ষমা করে দিতেন এবং কখনও সেই প্রসঙ্গ আর তুলতেন‌ও না, এমন ভাবে ক্ষমা করতেন” (তিরমিযী, হাদীশ 2016)।

তাই নয়, মাক্কাহতে নাবী (সা) থাকাকালীন মাক্কাহবাসী নাবী (সা) এর উপর মারাত্মক ধরণের অত‍্যাচার করেছিল কিন্তু নাবী (সা) মাক্কা বিজয় করেও তাদের সবাই‌কে ‛গণ ক্ষমা’ করে দেন। তখন ক্ষমা করেন, যখন মাক্কা‌হ ছিল তাঁর হাতের মুঠোয় (আবুদাউদ, হাদীশ 3021-3024)।

আনাস ইবনু মালিক (রা) হতে বর্ণিত। খাইবার বিজয়ের সময় এক ইহুদী নারী নাবী (সা) এর খিদমতে বিষ মেশান ছাগল রান্না নিয়ে এল উপহার হিসাবে। সেখান হতে কিছু অংশ তিনি (নাবী) খেলেন, তিনি বুঝলেন : খাবারে বিষ মেশান আছে। অতঃপর মহিলাকে হাজির করা হল। তখন (নাবীকে) বলা হল : আপনি কি এই মহিলা‌কে হত্যা করবেন না? তিনি বললেন : না (বুখারী, হাদীশ 2617)।

অবশ্য পরে ঐ নারীকে মৃত্যু‌দণ্ড দেওয়া হয়েছিল। এজন্য নয় যে, নাবী (সা) কে বিষ খাইয়েছিল। বরং ঐ বিষের প্রভাবে বিশর ইবনুল বারায়া ইবনু মারূর (রা) নামক সাহাবা মারা গেলে, নাবী (সা) শাস্তি হিসাবে ঐ নারীকে মৃত্যু‌দণ্ড দিয়েছিলেন” (আবুদাউদ 4514)।

নাবী (সা) কে কটুক্তি, শাস্তি ও সহীহ হাদীশ!

ইবনু আব্বাস (রা) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন- জনৈক অন্ধ লোকের একটি উম্মু ওয়ালাদ (দাসী, তবে মালিকের সন্তানের মা) ছিল। সে নবী (সা) কে গালি দিত এবং তার সম্পর্কে কটুক্তি করত। অন্ধ লোকটি তাকে নিষেধ করা সত্ত্বেও সে বিরত হোত না। সে তাকে রাগারাগি করত, কিন্তু তাতেও সে বিরত হত না। একরাতে সে যখন নাবী (সা) কে গালি দিতে শুরু করল এবং তাঁর সম্পর্কে মন্দ কথা বলতে লাগল, সে একটি ধারাল ছুরি নিয়ে তার পেটে ঢুকিয়ে তাতে চাপ দিয়ে তাকে হত্যা করল। তার দুই পায়ের মাঝে একটি শিশু পতিত হয়ে রক্তে রঞ্জিত হল।

ভোরবেলা নাবী (সা) ঘটনাটি অবহিত হয়ে লোকজনকে সমবেত করে বললেন : “আমি আল্লাহর কসম করে বলছি: যে ব্যক্তি একাজ করেছে, সে যদি না দাঁড়ায়, তবে তার উপর আমার অধিকার আছে”। একথা শুনে অন্ধ লোকটি মানুষের ভিড় ঠেলে কাঁপতে কাঁপতে সামনে এসে নাবী (সা) এর সামনে এসে বলল : “হে আল্লাহর রাসূল, আমি সেই নিহত দাসীর মনিব। সে আপনাকে গালাগালি করত ও আপনার সম্পর্কে অপমানজনক কথা বলত।

আমি নিষেধ করতাম কিন্তু সে বিরত হত না। আমি তাকে ধমক দিতাম, কিন্তু সে তাতেও বিরত হত না। তার গর্ভজাত মুক্তার মত আমার দুটি পুত্র আছে, আর সে আমার খুব প্রিয়পাত্রী ছিল। গতরাতে সে আপনাকে গালাগালি শুরু করে এবং আপনার সম্পর্কে অপমানজনক কথা বললে আমি তখন একটি ধারাল ছুরি নিয়ে তার পেটে স্থাপন করে তাতে চাপ দিয়ে তাকে হত্যা করি”। তখন নাবী (সা) বলেন : “তোমরা সাক্ষী থাক, তার রক্ত বৃথা গেল” আবুদাউদ, হাদীশ 4361)।

এই হাদীশটি নাস্তিক, অমুসলিম ও ইসলাম বিদ্বেষী‌দের সব পছন্দের। কারণ, উক্ত হাদীশটিকে আলবানী (রহি) সহ বহু মুহাদ্দিস সহীহ বলেছেন। কিন্তু বহু মুহাদ্দিস দ্বাইফ‌ও বলেছেন। যেমন, শাইখুল ইসলাম মুহাদ্দিস মানসুর আব্দুল হামীদ বাইহাকী কুবরা এর 16863 তে বর্ণিত উক্ত হাদীশটিকে দ্বাইফ বলেছেন। সুতরাং নাস্তিক, অমুসলিম ও ইসলাম বিদ্বেষী‌‌দের পছন্দের উক্ত হাদীশটি দ্বাইফ, এত‌এব দলিল হিসেবে তা গ্ৰহণযোগ‍্য নয়।

উপরিউক্ত তথ‍্য খণ্ডণ করতে, সুন্দর একটা হাদীশ- নাবী (সা) নিজের ব্যাপারে কখন‌ও প্রতিশোধ নেন নি। তবে, আল্লাহর আইন লঙ্ঘন করা হলে (অপরাধের শাস্তি হিসেবে) আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার জন্য দণ্ড নিতেন (বুখারী, হাদীশ 3560)।

5/5 - (2 votes)
শেয়ার করুন:

মন্তব্য করুন