বিবাহ, ত্বালাক ও হালালা।

লেখকের কথা।

আমি লেখক ন‌ই, আলেম ন‌ই, বক্তা‌ও ন‌ই, আমি বিপ্লবী। তাই লেখক হিসাবে আমার কথাও নেই। একজন অতি সাধারণ মুসলিম মাত্র, ছাত্র মাত্র। বর্তমানে ইসলাম ও মুসলিম‌দের প্রতি অমুসলিম‌দের চরম ঘৃণা রয়েছে। যদিও এই ঘৃণা প্রাকৃতিক নয়, বরং কৃত্রিম। অবশ্যই এতে সন্দেহ নেই যে, তা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করা ঘৃণা। যাতে এই ঘৃণা‌কে ভোটে পরিবর্তন করে ক্ষমতা ভোগ করা যায়।

সেই পরিস্থিতি‌তে দাঁড়িয়ে ‛বিবাহ, ত্বালাক ও হালালা’কে হাতিয়ার করে সমাজে ও সোশ্যাল মিডিয়ায় মুসলিম‌দের কে খুব সহজে ট্রোল করা হচ্ছে। বলা এভাবে- “3 বার কবুল বললে বিবাহ, 3 বার ত্বালাক বলদে ডিভোর্স, কিন্তু হালালা সারা রাত”! সোশ্যাল মিডিয়ায় মুসলিম নারীদের কে ‛হালালা’ প্রসঙ্গে মারাত্মক আক্রমণ করা হচ্ছে। মুসলিম নারীদের পোষ্ট দেখলেই সেখানে কমেন্ট করা হচ্ছে এভাবে- “কার কার সঙ্গে হালালা করেছ?? বাবার সঙ্গে, কাকার সঙ্গে, নাকি দাদা বা ভাইয়ের সঙ্গে?? নাকি অন্য কারোর সঙ্গে”?? শেষে বলা হচ্ছে- “হালালা থেকে বাঁচতে ইসলাম ত‍্যাগ করে আমাদের ধর্মে চলে এস”। অন্য বিষয় হল- হালালা’কে কেন্দ্র করে তথাকথিত প্রগতিশীল মুসলিম মেয়েদের ব্রেন ওয়াশ করে প্রেমের ফাঁদে ফেলে ধর্মান্তরিত করা হচ্ছে।

আর তা 1-2 টা নয়, পশ্চিমবঙ্গের কথা বললে- প্রতিমাসে হাজার হাজার মুসলিম মেয়েকে প্রেমের ফাঁদে ফেলে ধর্মান্তরিত করা হচ্ছে। এমনকি এটা সাংগঠনিক ভাবে চলছে। শুধু পশ্চিমবঙ্গে নয়, বরং গোটা ভারতের অবস্থা এক‌ই। এমনকি স্লোগান দেওয়া হয় যে, “বেটি বাঁচাও, মুসলিম বাহু লে আও” (The Indian express, 1 Des, 2017 ও Navbharat Times, 29 Des, 2014)। এমনকি পুরস্কার ঘোষণা করা হয় যে, “যদি পুরুষ কোনও মুসলিম মেয়েকে প্রেমের ফাঁদে ফেলে ধর্মান্তরিত করতে পারে, তাহলে তাকে ‛এত’ টাকা দেওয়া হবে” (হিন্দি AajTak, 15 Feb, 2015)। এমনকি গুগলে গিয়ে লিখুন- “Muslim larki se”। তারপর আপনাকে গুগল অপশন দেবে ঠিক এভাবে- “Muslim larki se shadi kaise kare”??। এর মানে কি! এরমানে, মানুষ এভাবে গুগলে সার্চ করে এবং করছে।

এমন পরিস্থিতিতে সম্মানিত আলেমদের ব‍্যাপক ভূমিকা থাকা উচিৎ ছিল। কিন্তু দুঃখজনক ভাবে বলতে হচ্ছে, তারা পুরোপুরি নিষ্ক্রিয়। ‛ধর্মব‍্যাবসা’ এখন যেন তাদের আল্লাহ প্রদত্ত দায়িত্ব হয়ে গেছে। এখন 1 ঘণ্টা বক্তব্য রেখে, কে কত টাকা নেয়, সেই কম্পিটিশন চলছে। কেউ 50 হাজার, তো কেউ 60 হাজার, তো কেউ 1 লাখ। অথচ আল্লাহ বলেছেন- “বলুন : আমি (মুহাম্মাদ) তোমাদের থেকে কোনও ধরণের পারিশ্রমিক চাই না। কেননা, আমি ভণ্ড ন‌ই” (কুরআন, 38:86)। আবার অন‍্যত্রে বলা হয়েছে- “আমার (মুহাম্মাদের) পারিশ্রমিক আমার রবের কাছে রয়েছে” (কুরআন, 34:47)। অন্য দিকে- যারা পারিশ্রমিক চান/ নেন, তাদেরকে অনুসরণ করতে নিষেধ করা হয়েছে (কুরআন, 36:21)।

তাই একজন অতি সাধারণ মুসলিম হয়েও কলম ধরার কাজটা আমি করলাম। এখানে প্রশ্ন হবে, হ‌ওয়া উচিৎ যে, “আপনার একাডেমি‌ক শিক্ষা উচ্চমাধ্যমিক মাত্র, তাও ইংরেজি‌তে ফেল করেছেন। আবার মাদ্রাসার মুখ আপনি দেখেন নি। আপনি কি যোগ্য”?? না, আমি যোগ্য ন‌ই, একেবারেই যোগ্য ন‌ই। তবে যদি অযোগ্য হতাম, তাহলে ব‌ইটা অন্য কেউ লিখত। আর দ্বিতীয় এবং গুরুত্বপূর্ণ বিষয়- যারা যোগ্য, তারা নিষ্ক্রিয় কেন?? তারা কোথায়??

যাইহোক, ব‌ইটা লেখার একমাত্র উদ্দেশ্য হালালা’র প্রোপাগাণ্ডার বিরুদ্ধে ব‌ই লেখা নয়। সত্যি বলতে, বিবাহ, ত্বালাক ও হালালা সম্পর্কে মুসলিম সমাজ একেবারেই অজ্ঞ (এটার বলার জন্য দুঃখিত)। এটাই সত্য। অজ্ঞ বলাও ঠিক হবে না, বরং মুসলিমদেরকে অজ্ঞ বানিয়ে রাখা হয়েছে। আর এই ‛মহান কাজটা’ করেছেন আমাদের সম্মানিত আলেমগণ। আলেমগণ কুরআন ও হাদীশে‌র ইসলাম গোপন রেখে ‛নিজেদের তৈরি একটা নকল ইসলাম’ মুসলিম সমাজে ছড়িয়ে দিয়েছেন। একজন সাধারণ মুসলিম ‛আলেমদের তৈরি করা নকল’ ইসলামটাকে আসল ইসলাম হিসাবে পালন করে আসছে।

প্রশ্ন হবে- “না, আলেমগণ এমন নন, যেমনটা আপনি বলছেন। আলেমগণ নাবীদের ওয়ারিশ”। হ‍্যাঁ, এটা রয়েছে ইবনু মাজাহ এর 223 এ‌। এছাড়াও রয়েছে আবুদাউদ এর 3641 ও তিরমিযী এর 2682 তে। অবাক করা তথ্য দিই! এটাও আলেমদের তৈরি করা হাদীশ। মুহাদ্দিস যুবাইর আলী যাঈ দ্বাইফ বলেছেন। এছাড়াও দারুস সালাম (সৌদি) দ্বাইফ বলেছে।

এখন ব‌ইটা পড়তে শুরু করুন, আপনি যা পড়বেন, সেটাই আপনার অজানা মনে হবে এবং প্রচলিত ইসলাম মিথ্যা মনে হবে। আর শেষে পৌঁছে আমার দাবি মিথ্যা প্রমাণিত হলে আপনার জুতা ও আমার মুখ। কঠিন ভাষা ব্যবহার করার জন্য দুঃখিত। কেননা আমি লেখক ন‌ই, বক্তা ন‌ই, আলেম‌ও ন‌ই। আমি বিপ্লবী, তাই আমার ভাষা একটু কঠিন। তবে আমার উদেশ্য কাউকে আঘাত করা নয়। যদি কেউ আঘাত পান, কষ্ট পান, তার জন্য দুঃখিত ও ক্ষমাপ্রার্থী।

বিপ্লবী, হোসেন কুরানী আল হিন্দী।

ইসলামে কন্যা সন্তান ও তার মর্যাদা।

নাবী (সা) বলেছেন- “যদি কারোর 3 কন‍্যা সন্তান থাকে এবং সে তাদেরকে উত্তম ভাবে লালন পালন করে, উত্তম পোষাক, উত্তম খাদ্য ও উত্তম শিক্ষা দেয়, তাহলে ঐ কন‍্যা সন্তান গুলো বিচার দিবসে তাকে (পিতাকে) জাহান্নামী হতে দেবে না” (আদাবুল মুফরাদ, হাদীশ 76)। এছাড়াও হাদীশটি রয়েছে ইবনু মাজাহ এর 3669 এ, ইবনু হিব্বান এর 446 এ। হাদীশটি বিস্তারিত ভাবে রয়েছে মুসনাদ আহমাদ এর 8425, 14247, 17403 এ, আবুদাউদ এর 2203 এ, ত্বাবারানী আওসাত এর 4860 এ এবং আদাবুল মুফরাদ এর 78 এ।

কন‍্যার উপর পুত্রকে প্রাধান্য দেওয়া হারাম/ নিষিদ্ধ।

মারাত্মক হাদীশ, এমন হাদীশ আপনি আলেমদের থেকে কখনও শোনেন নি। নাবী (সা) বলেছেন- “যদি কেউ কন‍্যাদের উপর পুত্রদের প্রাধান্য না দেয়, সে জান্নাতী” (মুস্তাদারাক হাকিম, 7348)। উক্ত বক্তব্য‌টি আবুদাউদ এর 5146 এও রয়েছে। ইমাম যাহাবী (রহি) বলেছেন- হাদীশটি সহীহ। মানে, পুত্র ও কন‍্যাকে সমান সমান বিচার না করলে, সে জাহান্নামী।

আরও একটি সুন্দর হাদীশ, যার প্রেমে পড়তে বাধ্য হবেন আশা করছি। আনাস (রা) থেকে বর্ণিত। আল্লাহর রাসূল (সা) এর কাছে এক ব্যক্তি বসে ছিলেন। এমন সময় তার পুত্র সেখানে এল, তিনি তাকে চুমু খেলেন এবং নিজের কোলে বসালেন। এরপর তার কন‍্যা সেখানে এল, তিনি তাকে নিজের পাশে বসালেন। তখন তাকে (নাবী) বললেন : তুমি কেন তাদের উভয়ের সঙ্গে সমান আচরণ করলে না (সিলসিলা সহীহাহ, হাদীশ 3098)??

নারী সম্পর্কে ইসলাম যা বলেছে।

নারীরা আল্লাহর পক্ষ থেকে পাওয়া আমানত। নাবী (সা) বলেছেন- “তোমরা নারীদের বিষয়ে আল্লাহকে ভয় কর। তোমরা তাদেরকে আল্লাহর পক্ষ থেকে পাওয়া আমানাত হিসেবে গ্রহণ করেছ”(মুসলিম, হাদীশ 1218 এর 1)। এই ছাড়াও নাবী (সা) বলেছেন- “আমি তোমাদের‌কে নারীদের কল‍্যাণের ওসিয়ত করে যাচ্ছি” (বুখারী, হাদীশ 3331)।

হালালা ‛ইসলামে হারাম’ ও ‛তার শাস্তি’।

প্রথমত, হালালা নাবী (সা) এর পূর্বে আরবে প্রচলিত বহুল নিকৃষ্ট ও ঘৃণ্য একটি প্রথা। দ্বিতীয়ত, হালালা ইসলামে কঠোর ভাবে নিষিদ্ধ। তৃতীয়ত, হালালা‌ হল পরিকল্পিত ধর্ষণ। চতুর্থ‌, হালালা কারী ও যার জন্য হালালা করা হল, উভয় অভিশপ্ত। পঞ্চম, হালালাকারী ও যার জন্য হালালা করা হল, উভয়ের শাস্তি মৃত্যু‌দণ্ড। মৃত্যু‌দণ্ড বলতে, সাধারণ মৃত্যু‌দণ্ড অথবা ফাঁসিতে মৃত্যু নয়। ইসলামের শাস্তি হল- তাদেরকে ‛প্রকাশ‍্যে রজম’ করতে হবে। রজম মানে, জনগণ তাদেরকে ‛পাথর মেরে’ হত্যা করবে।

উপরিউক্ত দাবিগুলোর প্রমাণ আছে, নাকি ইসলাম‌কে ‛ভালো দেখানোর’ জন্য মিথ্যা বলছেন?? চিন্তা করতে হবে না, এখনই হাদীশ গুলো উপস্থিত করব। একেবারে প্রথম হাদীশ- “নাবী (সা) লানত/ অভিশাপ দিয়েছেন তাদেরকে, যে হালালা করে, যার জন্য করে” (ইবনু মাজাহ, হাদীশ 1934)। হাদীশটি তিরমিযী‌র 1120 তে, নাসাঈ এর 3416 তে, আহমাদ এর 8287 তে, বাইহাকী এর 14571 তেও। হাদীশটি ইবনু মাজাহ এর 1934 এ ইবনু আব্বাস (রা) হতে, ইবনু মাজাহ‌ এর 1935 এ আলী (রা) হতে, যা মুসনাদ বাযযার এর 821 এ বিস্তারিত রয়েছে। আবার মাসান্নাফ ইবনু আবু শাইবাহ এর 17973 এ আবু হুরাইরা (রা) থেকেও বর্ণিত হয়েছে।

এখানে শেষ নয়, নাবী (সা) হালালা কারীকে ভাড়াটিয়া পাঠা বলেছেন, তিনি বললেন- “আমি কি তোমাদেরকে ভাড়াটিয়া পাঁঠা সম্পর্কে জানাব না?? তারা বললেন : হে আল্লাহর রাসূল, অবশ্যই। তিনি বললেন : সে হল হালালা’কারী” (ইবনে মাজাহ, হাদীশ 1926)। হাদীশ‌টি নাসাঈ এর 5511 ও 5579 তে, হাকাম এর 2840-2841 তে, দারাকুত্বনী এর 3618 তে, মুসনাদ রুইইয়ানী এর 226 এও রয়েছে। এখানেই শেষ নয়, নাবী (সা) বলেছেন- “যে হালালা করে, যার জন্য করে, উভয়ে আল্লাহর কাছেও অভিশপ্ত বলে গণ্য হবে” (ইবনু মাজাহ, হাদীশ 1936)। হাদীশটি ইবনু জারূদ এর 741 তেও রয়েছে।

হালালা’কারী ও যার জন্য করা হয়, তাদের শাস্তি কি?? নাবী (সা) এর যুগে এমন ঘটনা ঘটে নি। তাই তার কোনও শাস্তিও নাবী (সা) থেকে বর্ণিত হয় নি। তবে হালালা যে ধর্ষণ, এতে কোনও সন্দেহ নেই (পরবর্তীতে প্রমাণ দেব)। তাই ধর্ষণের যে শাস্তি, হালালা করার জন্য এক‌ই শাস্তি। উমার (রা) হালালা’র শাস্তি ঘোষণা করলেন, বললেন- “হালালা কারী ও যার জন্য হালালা করা হয়, উভয়ের শাস্তি- রজম/ প্রকাশ‍্যে পাথর মেরে হত্যা” (মুসান্নাফ ইবনু আবু শাইবাহ, হাদীশ 17959)। হাদীশ‌টি রয়েছে বাইহাকী কুবরা এর 14191 তে, আব্দুর রাযযাক এর 10777 তে এবং সাঈদ বিন মানসুর এর 1992 তেও।

পরবর্তীতে মুয়াবিয়াহ (রা) খিলাফতের বদলে রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেন, যা ইতিহাসে উমাইয়াহ রাজতন্ত্র নামে পরিচিত। খিলাফত চলে যায়, রাজতন্ত্র আসে। এর সঙ্গে সঙ্গে বহু ইসলামী আইন বদলে যায়। মুসলিম সমাজে বহু আরবীয় কুসংস্কার প্রবেশ করে, তার মধ্যে হালালা‌’ও অন‍্যতম। এজন্য পরবর্তীতে উমার (রা) এর ছেলে আব্দুল্লাহ ইবনু উমার (রা) এর কাছে ‛হালালা’ করার ঘটনা শোনান হল, তিনি বললেন- “এটা হল : সিফাহ/ পরিকল্পিত ধর্ষণ। যদি এমন নোংরামি খলিফা‌হ উমার দেখতেন, তাহলে মারাত্মক কঠিন শাস্তি (রজমের শাস্তি) দিতেন” (প্রাগুক্ত, হাদীশ 17961)। এছাড়াও বাইহাকী কুবরা এর 14190 এও রয়েছে উক্ত হাদীশটি।

এছাড়াও আব্দুল্লাহ ইবনু উমার (রা) এর হালালা বিষয়ে প্রশ্ন করা হল যে, এই হিল্লাহ বিয়ে কি বৈধ?? তিনি বললেন- “রাসূল (সা) এর যুগে আমরা এই আরবীয় নোংরা রীতিকে সিফাহ/ পরিকল্পিত ধর্ষণ বলে গণ্য করা হোত” (হাকাম, হাদীশ 2842)। এছাড়াও হাদীশটি রয়েছে ত্বাবারানী আওসাত্ব এর 6246 এ এবং বাইহাকী কুবরা এর 14189 এ। কিন্তু এরপরেও ‛মূর্খ‌গণ’ এবং ‛না পড়ে পণ্ডিত‌গণ’ ইসলাম ও মুসলিম‌দের বদনাম করার জন্য হালালা’র ঢোল পিটিয়ে বেড়ায়। শুধুমাত্র সোশ্যাল মিডিয়ায় নয়, বরং জাতীয় স্তরের নিউজ চ‍্যানেল এবং খবরের কাগজে। আর এমনি এমনি নয়, তা তাদের বৃহৎ পরিকল্পনার অংশ।

হালালা‌’র শাব্দিক বিশ্লেষণ।

সবাই এটাকে ‛হালালা’ বললেও শব্দটি সঠিক নয়। মূল শব্দ‌টি হল- ‛তাহলীল’ করা, যার অর্থ- অবৈধ‌ (হারাম) কে বৈধ (হালাল) করা। অবৈধ বলতে! পরে বিস্তারিত আলোচনা হবে। আনেকে এটাকে ‛হিল্লা‌ বা হিল্লা‌হ’ বিবাহ বলেও জানে। তবে এটাও সঠিক শব্দ নয়। সঠিক শব্দ- ‛হীলাহ’। যার অর্থ- চালাকি, চতুরতা, ষড়যন্ত্র ইত্যাদি। যদিও অনেকে মনে করেন- “হালালা থেকে হিল্লা/ হিল্লাহ শব্দের উৎপত্তি”। তা ভুল। আরবিতে এই বিবাহ‌কে বলা হয়- ‛যাওজাল তাহলীল’ বা ‛যাওজ আল তাহলীল’। আবার এটাকে অনেক ক্ষেত্রে ‛নিকাহ আত তাহলীল’ও বলা হয়। যার অর্থ- স্ত্রীকে স্বামীর জন্য হালাল/ বৈধ করার জন্য বিবাহ। মানে! একটু ধৈর্য্য রাখুন, পরবর্তী অংশে চোখ রাখুন।

হালালা কেন করা হয়??

মানুষের ধারণা- স্বামী স্ত্রীকে ত্বালাক, ত্বালাক, ত্বালাক বললেই ডিভোর্স হয়ে যায়। এরপর যখন স্বামীর মনে হবে- “ভুলটা আমার ছিল, আমি ভুল করেছি এবং স্ত্রীকে কোনও ভাবে ছাড়তে চাই না”। কিন্তু এখন ত্বালাক তো হয়ে গেছে। স্ত্রী এখন স্বামীর জন্য হারাম/ অবৈধ হয়ে গেছে। একটা অপশন ছাড়া কোনও উপায় নেই তাকে ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য। সেটা কি!

অন্য একজন পুরুষের সঙ্গে 1 রাতের জন্য ঐ ত্বালাক প্রাপ্তা স্ত্রীর বিবাহ দিতে হবে। পরদিন সকালে নতুন স্বামী ঐ স্ত্রীকে ‛ত্বালাক, ত্বালাক, ত্বালাক’ বলে ডিভোর্স দেবে। তবেই পুরাতন স্বামীর কাছে ফিরে যেতে পারবে। অর্থাৎ পুরাতন স্বামীর জন্য হালাল/ বৈধ হবে। এ কারণে এটাকে সম্ভবত ‛হালালা’ বলা হয়। অবাক করা ব‍্যাপার হল- এই নিয়মের উল্লেখ নাকি আবার কুরআনে (??) আছে 2:230 এ!

“বিস্তারিত বলুন, বুঝতে পারছি না”। বলব, আপাতত 2 টি আয়াত দেখুন- “প্রত‍্যেকে তার নিজ কর্ম/ অর্জনের জন্য দায়ী” (কুরআন, 74:38, 52:21)। আবার এও বলা হয়েছে- “কোনও বোঝা বহনকারী অন্যের বোঝা বহন করবে না” (কুরআন, 17:15 ও 53:38)। অথচ এখানে দোষ করল স্বামী, শাস্তি পেল স্ত্রী। স্বামী‌র বোঝা স্ত্রীকে বহন করতে হল। তা কিভাবে কুরআনের নির্দেশনা হতে পারে! হতে পারে, এটা ভাবাই মূর্খ‌তা। তাহলে! বিস্তারিত বলি, নাকি??

দুটি শব্দের বিশ্লেষণ।

যে নতুন স্বামীর সঙ্গে ঐ ত্বালাক প্রাপ্তা স্ত্রীর বিবাহ দেওয়া হল, ঐ স্বামী‌কে বলা হয়- ‛মুহাল্লিল’ (হালাল কারী)। আর যে স্বামীর কাছে ফিরে যাওয়ার জন্য নতুন স্বামীর সঙ্গে বিবাহ দেওয়া হল, ঐ স্বামী‌কে। মানে, পুরাতন স্বামী‌কে বলা হয়- ‛মুহাল্লালা লাহু’ (যার জন্য হালাল করা হল)। মনে হয় এতটুকু বুঝিয়ে বলতে পারলাম। এবার প্রশ্ন হবে- ইসলামে এই দুই স্বামীর শাস্তি কি, তাই তো?? “হালালা ‛ইসলামে হারাম’ এবং ‛হালালা’র শাস্তি” অংশটা আরও একবার দেখে আসুন।

ইসলামে বিবাহ।

বিবাহ ফরজ। মানে, বাধ‍্যতামূলক। মানে, করতে হবে নয়, ক‍রতেই হবে। নাবী (সা) বলেছেন- “বিবাহ আমার সুন্নাহর/ রীতির অংশ। সুতরাং যে ব্যক্তি আমার সুন্নাহ/ রীতি অনুযায়ী আমল/ কর্ম করে না, সে আমার দলভুক্ত নয়” (সিলসিলা সহীহাহ, হাদীশ 2383)। ইবনু মাজাহ এর হাদীশ 1846, আল ফিরদাউস এর হাদীশ 6920 তেও রয়েছে উক্ত বক্তব্য। এর কাছাকাছি বক্তব্য রয়েছে বুখারীর 5063 তে। কেন, কেন বিবাহ জরুরি??

উত্তর রয়েছে কুরআনের 30:21 এ- “আল্লাহর নিদর্শনের মধ্যে অন‍্যতম নিদর্শন যে, তিনি তোমাদের মধ্যে থেকে তোমাদের জন্য স্বামী/ স্ত্রী সৃষ্টি করেছেন। যেন তোমরা তাদের কাছে (শারীরিক/ মানসিক) প্রশান্তি পেতে পার”। আর যাদের স্বামী/ স্ত্রী নেই, তারা ঠিক এভাবে প্রার্থনা করবে- “হে আমাদের প্রভু, আমাদের‌কে এমন স্বামী/ স্ত্রী ও সন্তান সন্ততি দিন, যাদের‌কে দেখলে আমাদের চোখ জুড়িয়ে যায়। আর আমাদের‌কে বানিয়ে দিন মুত্তাকী‌দের ইমাম/ নেতা” (কুরআন, 25:74)।

স্বামী তার স্ত্রীর মালিক নয়, স্ত্রী তার স্বামীর সার্টিফিকেট।

বলা হয়েছে- “হে সত্য স্বীকার করা সম্মানিত মানুষ‌জন, তোমাদের জন্য হালাল/ বৈধ নয় নারীদের মালিক সেজে বসা” (কুরআন, 4:19)। আরও বলা হয়েছে- “তোমরা স্ত্রীদের সঙ্গে উত্তমতার সঙ্গে বিবাহ জীবন কাটাও। এমনকি স্ত্রীদের পছন্দ না করলেও” (কুরআন, 4:19)। এছাড়াও নাবী (সা) বলেছেন- “আর তোমাদের মধ্যে সে উত্তম, যে তার স্ত্রীর নিকট উত্তম (তিরমিযী, হাদীশ 1162)। এছাড়াও আবুদাউদের 4682 তে, আহমাদের 7402 এ, তারগীবের 1923 এ। মানে, স্বামী স্ত্রীর মালিক তো নয়, কিন্তু স্ত্রী তার স্বামীর সার্টিফিকেট।

স্ত্রীকে গালাগালি ও মারধোর।

একবার নাবী (সা) কে স্ত্রীদের অধিকার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হল। তিনি বললেন- “তোমরা যা খাবে, তাদেকেও তা খাওয়াবে এবং তোমরা যা পরবে, তাদেরকেও তা পরাবে। তাদেরকে মারধোর করবে না, কটু কথা বা গালাগালি‌ও করবে না” (আবুদাউদ, হাদীশ 2144)। হাদীশটি রয়েছে নাসাঈ কুবরা’র 9106 এও।

নারীদের অধিকার রক্ষায় ইসলাম।

নাবী (সা) বলেছেন- “হে আল্লাহ, আপনি সাক্ষী থাকুন : আমি আমার উম্মাহকে সতর্ক করেছি, কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছি যে, তারা ইয়াতীম/ অসহায় ও নারীদের অধিকার রক্ষায় সচেষ্ট ও সচেতন থাকবে” (নাসাঈ কুবরা, হাদীশ 9105)। হাদীশটি আরও রয়েছে ইবনু মাজাহ’র 3678 এ, মুসনাদ আহমাদের 9666 তে, ইবনু হিব্বানের 5565 তে, সহীহ জামে 2447 এও।

নিজের ইচ্ছামত স্বামী/ স্ত্রী নির্বাচন।

আল্লাহ পুরুষ‌দেরকে বলেছেন- “তোমরা যাদেরকে পছন্দ কর, তাদেরকে বিবাহ করে নাও” (কুরআন, 4:3)। নিজ পচ্ছন্দ মতো নারীকে বিবাহের প্রস্তাব দেওয়া- “তোমরা যদি নারীদের‌কে গোপনে/ ইশারা ইঙ্গিতে বিবাহের প্রস্তাব দাও, তাতে তোমাদের পাপ হবে না” (কুরআন, 2:235)। প্রকাশ‍্যে প্রস্তাব দেওয়া যাবে না! গোপনে প্রস্তাব যদি বৈধ হয়, প্রকাশ‍্যে অবৈধ কিভাবে হবে। কারণ, গোপনে অবৈধ হতে পারত। যখন তা বৈধ, প্রকাশ‍্যে অবৈধ হ‌ওয়ার তো গল্প‌ই নেই।

প্রশ্ন হবে- “নারীরা কোনও পুরুষ‌কে বিবাহের প্রস্তাব দিতে পারবে না”?? অবশ্যই পারবে। দলিল! একটু আধটু কষ্ট করে বুখারীর 5087 তে যান। কি পাব?? এটা- “এক মহিলা রাসূল (সা) এর কাছে এসে বললেন : হে আল্লাহর রাসূল, আমি আমাকে আপনার হাতে সমর্পণ (আপনাকে বিবাহ) করতে এসেছি”। আর কোনও দলিল দিতে হবে, নাকি যথেষ্ট?? আরও একটা দলিল দিই! মাইমূনা বিনতু আল হারিশ (রা) এর নাম শুনেছেন! তিনি নাবী (সা) এর একজন স্ত্রী। তিনি‌ও তার দিদির স্বামীর মাধ্যমে নাবী (সা) কে বিবাহের প্রস্তাব দিয়েছিলেন (নাসাঈ, হাদীশ 3273)।

অভিভাবকদের দ্বারা বিবাহ।

ইসলামে যেমন নিজের পছন্দে অনুযায়ী বিবাহ করা যায়,  তেমনই অভিভাবক‌রা নিজেও উদ্যোগেও বিবাহ দিতে পারে। বলা হয়েছে- “তোমাদের মধ্যে যারা ‛বিবাহ হীন’ তাদের বিবাহ দিয়ে দাও” (কুরআন, 24:32)। এক্ষেত্রে যদি পাত্র/ পাত্রীর আপত্তি থাকে, তাহলে জোর করে তাদের বিবাহ দেওয়া যাবে না। আইশাহ (রা) নাবী (সা) জিজ্ঞাসা করলেন- “যে মেয়েকে তার অভিভাবক বিবাহ দেয়, তার নিকট থেকেও সম্মতি নিতে হবে কি না! তিনি বললেন : হ্যাঁ, তার সম্মতি নিতে হবে” (মুসলিম, হাদীশ 1420)।

আরও বলা হয়েছে- এক নারী নাবী (সা) এর কাছে এসে বলেন : আমার পিতা তার ভাইপোকে তার দুর্দশাগ্রস্ত অবস্থা থেকে উদ্ধারের জন্য তার ভাইপোর সঙ্গে আমার বিবাহ দিয়েছে। নাবী (সা) বলেন : চাইলে বিবাহ বহাল রাখতে পার, না চাইলে না। তখন ঐ নারী বললেন : আমার পিতা যা করেছেন, তা আমি বহাল রাখলাম। তবে আমার উদ্দেশ‍্য ছিল : যেন নারীরা সুস্পষ্ট ভাবে জেনে নেয় যে, ‛পিতাদের’ কোন‌ও এখতিয়ার নেই”(ইবনু মাজাহ, হাদীশ 1874)।

আলবানী (রহ) মতে, উক্ত হাদীশটি দ্বাইফ হলেও ‛দারুস সালাম’ (সৌদি) সহীহ বলেছে। উক্ত নারী যা বলেছেন, তা আবার কুরআনের 4:19 এর পক্ষে। যেখানে বলা হয়েছে- “জোর করে নারীদের মালিক সেজে থাকা হালাল/ বৈধ নয়”। আরও একটি হাদীশ- এক নারীর স্বামী মারা যায়। তার দেওর তাকে বিবাহের প্রস্তাব দেয়। ঐ নারীর পিতা অন্য পুরুষের সঙ্গে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে বিবাহ দেয়। নারী নাবী (সা) এর কাছে বিচার চান। নাবী (সা) তার পিতাকে বললেন : তোমার বিবাহ দেওয়ার কোনও অধিকার নেই। ঐ নারীকে বললেন- তুমি যাকে পছন্দ কর, তাকে বিবাহ করে নাও” (মুসান্নাফ আব্দুর রাযযাক, হাদীশ 10304) এছাড়াও ইবনু মানসূর এর হাদীশ 566 ও নাসাঈ কুবরা এর হাদীশ 5359 এও রয়েছে উক্ত বক্তব্য।

এমনকি ইয়াতীম/ অনাথ নারীর থেকে অনুমতি নেওয়া বাধ্যতামূলক। নাবী (সা) বলেছেন- “তোমরা ইয়াতীম মেয়েদেরকে বিয়ে করার জন্য তাদের নিকট থেকে সম্মতি গ্রহণ কর। যদি তারা চুপ থাকে, তবে সেটা অনুমতি। আর যদি সে অস্বীকার করে, তবে তাকে বাধ্য করা যাবে না” (দারেমী, হাদীশ 2224)। এছাড়াও আবুদাউদ এর 2093 তে, ইবনু হিব্বান এর 4085 তে, মাওয়ারিদুজ জাম‌আন এর 1038 তে এবং মুসনাদ মাউসিলি এর 7327 এও রয়েছে উক্ত বক্তব্য।

‛বিবাহ পূর্ব’ প্রেম ভালবাসা হারাম নয়।

না, হারাম/ নিষিদ্ধ নয়। সম্পূর্ণ হালাল/ বৈধ। তবে হালাল বলতে, যদি মনে করেন যে, “বিবাহের আগে একে অপরকে জড়িয়ে ধরা, চুমু খাওয়া, শারীরিক সম্পর্ক করা কিংবা স্বামী স্ত্রী‌র মতো এক সঙ্গে থাকা (লিভ ইন করা), তাহলে তা সুস্পষ্ট হারাম। তাহলে যেটা হারাম নয়, সেটা কি?? একে অপরকে পছন্দ করা। ফোনে কথা বলা, চ‍্যাট করা, পাবলিক প্লেসে সাক্ষাৎ করা, রেষ্টুরেন্টে গিয়ে চা/ কফি খাওয়া ইত্যাদি। প্রশ্ন হবে- গার্লফ্রেন্ড‌কে বাইকে নিয়ে ঘোরা যাবে?? হ‍্যাঁ, যাবে। তবে ভদ্রতা বজায় রেখে। এমনকি আপনি গার্লফ্রেন্ডের স্কুটির পিছনে বসে ঘুরতেও পারবেন (ভদ্রতা বজায় রেখে)। দলিল দিতে হবে তো নাকি?? চিন্তা করবেন না, আমি রয়েছি তো, দলিল দেব। কুরআনের 28:23-28 এ যান। কি পাব?? মূসা (আ) বিবাহের আগেই স্ত্রী ও শালী‌র সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। মানে, ‛সফ্ট প্রেম’ হারাম নয়। এ কারণেই ‛পালিয়ে বিয়ে’ হারাম নয়।

পালিয়ে বিবাহ কি বৈধ??

হ‍্যাঁ, পালিয়ে বিবাহ বৈধ। তাহলে সেই হাদীশে‌র কি হবে?? কোন হাদীশে‌র?? যেখানে বলা হয়েছে- ওলী ছাড়া বিবাহ বাত্বিল, বাত্বিল ও বাত্বিল। ও আচ্ছা, এটা! আপনি কি ভাবছেন, আমি ঐ হাদীশটা জানতাম না! ভাই, আমার নাম হোসেন কুরানী, এটা ভেবে কথা বলুন। আসলে উত্তর রয়েছে ঐ হাদীশে‌র শেষাংশে। দেখুন- “যার ওলী নেই, তার ওলী হবে দেশের শাসক/ সরকারি কর্মচারী” (তিরমিযী, হাদীশ 1102) এছাড়াও ইবনু মাজাহ এর 1879 তে, আবুদাউদ এর 2083 তে, দারেমী এর 2223 তে, মুসনাদ আহমাদ এর 24372 তে এবং সহীহুল জামে এর 2709 এও রয়েছে উক্ত বক্তব্য।

আরও কিছু রেফারেন্স দেব নাকি?? তারমানে, হাদীশটি আমি জানতাম, তাই না?? যাইহোক, এরমানে কি দাঁড়াল! দাঁড়াল যে- ওলী অবশ্যই চাই, নয়ত বিবাহ বাত্বিল গণ‍্য হবে। এখন ওলী বলতে শুধু পিতামাতা নয়, আত্মীয় স্বজন‌ও হতে পারে, দেশের শাসক/ সরকারি কর্মচারী‌ও হতে পারেন। মানে, ওলী বিবাহের অন‍্যতম শর্ত। বোঝাতে পারলাম কি?? এটা না বোঝা মূর্খ‌তার প্রমাণ বহন করবে।

বিবাহে সাক্ষী‌ও অন‍্যতম শর্ত।

আইশাহ (রা) নাবী (সা) হতে বলেছেন- “ওলী এবং দুজন ন‍্যায়পরায়ণ সাক্ষী ছাড়া বিবাহ হয় না” (ইবনু হিব্বান, হাদীশ 4075 ও সহীহুল জামি, হাদীশ 7557)। প্রশ্ন হবে- “ওলী ও দুজন সাক্ষী শর্ত কেন”?? যাতে বিবাহ নিয়ে ছেলেখেলা না হয়। যেমন, বর্তমানে বিবাহ নিয়ে ছেলে খেলা চলছে, তা নয়। অনেকে আবার Living এ থাকছে স্বামী স্ত্রী‌র মতো করেই। এমনকি বাচ্ছা‌ও নিচ্ছে। এমন ছেলেখেলা না হয়।

বিবাহের মূল শর্ত ‛মোহর’ এবং মোহর কি??

ইসলামে ‛মোহর’ হল বিবাহের মূল শর্ত (বুখারী, হাদীশ 5151)। মোহর নেই বলে বিবাহ ছেলেখেলা হয়ে গেছে। এমনকি মোহর না থাকার জন্য নারী সুরক্ষায় ব‍্যাঘাত ঘটছে। মোহর আসলে কি?? মোহর হল- যদি পুরুষ স্ত্রীকে ত্বালাক বা ডিভোর্স দেয়, তাহলে ডিভোর্স পরবর্তী‌তে স্ত্রী যেন অন‍্যের উপর বোঝা না হয়, স্ত্রী যেন নিজের খরচ নিজে চালাতে পারে, নিজে ঐ টাকায় ব‍্যাবসা করেও জীবন যাপন কিংবা বিনিয়োগ করে জীবন যাপন করতে পারে।

মোহরের পরিমাণ কত হ‌ওয়া উচিৎ??

আদর্শ মোহর কত?? নাবী (সা) এর বেশিরভাগ স্ত্রীদের ক্ষেত্রে মোহর ছিল 500 দিরহাম। দিরহাম কি?? রূপার কয়েনকে দিরহাম বলা হয়, আর সোনার কয়েনকে দীনার বলা হয়। যাইহোক, এখন 1 দিরহামে রূপার পরিমাণ থাকত 3 গ্ৰাম। এই হিসাবে 500× 3= 1500 গ্ৰাম রূপা বা দেড় কেজি রূপা। হাদীশ- আইশাহ (রা) কে জিজ্ঞাসা করা হল যে, রাসূল (সা) এর স্ত্রীদের মোহর কত ছিল। তিনি বললেন : “তাঁর স্ত্রীদের মোহরের পরিমাণ ছিল 12 উকিয়া ও 1 নাশ” (মুসলিম, হাদীশ 1426) এছাড়াও নাসাঈ এর 3347 তে, ইবনু মাজাহ এর 1886 তে এবং আবুদাউদ এর 2105 এও রয়েছে উক্ত বক্তব্য।

12 উকিয়া বলতে কি?? 1 উকিয়া হয় 40 দিরহামে। মানে, 12× 40= 480 দিরহাম। আর 1 নাশ বলতে, অর্ধ উকিয়া বা 20 দিরহাম। মানে, মোট 500 দিরহাম। যার পরিমাণ দাঁড়াত 1 কেজি 500 গ্ৰাম বা দেড় কেজি রূপা। যার বর্তমান মূল্য (আগষ, 2026) ₹ 3 লক্ষ 30 হাজার টাকা (ভারতীয় মুদ্রায়)। অবশ্য আজ থেকে 7-8 মাস আগে রূপার দাম ছিল 4 লক্ষ টাকা কেজি। মানে, তখন দেড় কেজির দাম হোত ₹ 6 লক্ষ টাকা।

যদিও মুসলিম সমাজে মোহর নিয়ে ছেলেখেলা করা হয়, তাই মোহর নির্ধারণ করা হয় ₹ 3 হাজার, 5 হাজার বা 10 হাজার টাকা। এগুলো হাস‍্যকর। 3, 5, 10 হাজার টাকায় 1 মাস চলবে না। অথচ মোহরের উদ্দেশ্য হল- ডিভোর্সের পর নারী যেন ‛জীবন যাপন’ করার মতো সম্পদ হাতে পায়। যা পূর্বেই বলা হয়েছে।

তবে যদি পাত্র পাত্রী আরও বেশি মোহর নির্ধারণ করতে চায়, করতে পারে। যেমন, 1 কোটি, 10 কোটি, 100 কোটি, 1000 কোটি হোক বা 10 হাজার কোটি কিংবা 1 লক্ষ কোটি, সেটা করা যাবে। আবার যদি পাত্র পাত্রী মাত্র ₹ 1 টাকা নির্ধারণ করতে চায়, তাও পারবে। যদি এখানে হাদীশের কথা বলি, তাহলে এম‌ন‌ও হয়েছে- “পাত্র পাত্রী‌কে কুরআনের সূরাহ শেখানো‌কে মোহর হিসাবে গণ‍্য করেছে” (বুখারী, হাদীশ 5087)।

‛গায়ে হলুদ’ অনুষ্ঠান ইসলামে নেই।

‛গায়ে হলুদ’ বিষয়টি বিবাহে এমন ভাবে পালিত হয়, যেন ‛গায়ে হলুদ’ না দিলে বিবাহ অবৈধ হয়ে যাবে। অথচ তা ইসলামী বিবাহের কোনও অংশ‌ই নয়‌। গায়ে হলুদ মূলত হিন্দু সমাজ থেকে আমদানিকৃত বিষয়। কিন্তু আমরা তা ‛ধর্ম মনে করে’ পালন করি, অথচ তা বর্জন করা সময়ের দাবি। কারণ, তা কুসংস্কার, তা পালন করা গোঁড়ামি। কেননা, হিন্দুগণ তা এজন্য করেন যে, “বিবাহে বা বিবাহ জীবনে অশুভ কোনও কিছু না ঘটে”।

শুধু তাই নয়, গায়ে হলুদ ছাড়াও মুসলিম সমাজে আরও বহু রীতিনীতি রয়েছে, যা বিবাহ পরবর্তী সুখ শান্তির জন্য পালিত হয়। যা মূলত হিন্দু সমাজ থেকেই আমদানি করা হয়েছে। এই সমস্ত কিছু বর্জন করতে হবে। কেন?? 2 টি হাদীশ দেখুন- “শুভ অশুভ/ সুলক্ষণ কুলক্ষণে বিশ্বাস করা শিরক” (আবুদাউদ, হাদীশ 3910)। মানে, ঐ সমস্ত কুসংস্কার পালন করলে “মূর্তিপূজার সমান” গুনাহ হবে এবং ‛তাওবা’ না করে ঐ অবস্থায় মৃত্যু হলে মুশরিক বলে গণ‍্য হবে। দ্বিতীয় হাদীশটি দেখুন- “যে অন্য কোনও সম্প্রদায়ের ধর্মীয় রীতি অনুসরণ করবে, সে তাদের মধ্যে গণ‍্য হবে” (আবুদাউদ, হাদীশ 4031)।

প্রশ্ন হবে- হলদি মেখে বিবাহে‌র হাদীশ রয়েছে, ওটা এখন কি হবে?? না, ওটা গায়ে হলুদের হাদীশ নয়। হাদীশটা আমি জানি, তা বুখারীতেই রয়েছে। যেখানে বলা হয়েছে- আব্দুর রহমান ইবনু আওফ (রা) এর শরীরে হলুদ দাগ দেখে নাবী (সা) বললেন- “কি ব‍্যাপার আব্দুর রহমান”?? তিনি বললেন- “আমি বিবাহ করেছি” (বুখারী, হাদীশ 3937)। এই হাদীশটা তো??

হ‍্যাঁ, হাদীশটিকে দেখিয়ে কেউ কেউ ‛গায়ে হলুদের’ দলিল দিয়ে থাকেন। আসলে তা গায়ে হলুদের দলিল নয়। তার গায়ের হলুদ রঙ বলতে, তা ‛জাফরান’ এর দাগ ছিল। এর প্রমাণ দিন। আমি জীবনে কখনও দলিল ছাড়া কথা বলেছি?? সুতরাং দলিল দেব, আবুদাউদ এর 2109 এ যান। শুধু তাই নয়, জাফরানের হলুদ গোছের রঙ নাবী (সা) নিজেও ব‍্যবহার করতেন। এমনকি পোষাকেও। দেখুন- আবুদাউদ এর 4210 এবং মুসলিম এর 1187 এর 1 নং হাদীশ। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মানুষ বিবাহে জাফরানের রঙ ব‍্যবহার করা হোত সৌন্দর্য্য বৃদ্ধি‌র জন্য। তাই হলুদ রঙ দেখে নাবী (সা) তাকে প্রশ্ন করেছিলেন।

মেহেদী অনুষ্ঠান কি বৈধ??

মেহেদী লাগান বৈধ, তবে ঐ অনুষ্ঠান করা অবৈধ। তাতে শুধু টাকা নষ্ট হয়, যা বৈধ নয়। কুরআনে কথা বলা হয়েছে 17:27 এ। তবে বলে রাখতে চাই- মেহেদী সৌন্দর্য্য চর্চার অংশ (কুরআন, 7:32)। তাই মেহেদী লাগান বৈধ। তবে তা বিবাহে‌র জন্য জরুরি নয়, বিবাহে‌র অংশ‌ও নয়। মেহেদী ছাড়াও বিবাহ বৈধ। হাদীশ, নাবী (সা) নারীদেরকে মেহেদী লাগাতে উৎসাহ দিয়েছেন আবুদাউদ এর 4166 তে। তবে, নাবী (সা) বিবাহে‌র জন্য নয়, তিনি নারীদের‌কে সর্বক্ষণ মেহেদী লাগিয়ে রাখতে বলেছেন।

বরযাত্রী, বিবাহ অনুষ্ঠান ও বর্তমান সমাজ।

আমাদের সমাজে আমরা যে বিবাহ অনুষ্ঠান দেখতে পাই, কুরআন ও হাদীশে তা নেই। ইসলামে বরযাত্রী নেই। বর তার সঙ্গে 2-4 জনকে আনতে পারে। 200-500 লোক সহ বর আসবে, তাদেরকে ভালমন্দ খাওয়াতে হবে, সেই খাওয়ানোর দায়িত্ব কনে পক্ষের- এই রীতি ইসলামে তো নেই-ই উপরন্তু তা সুস্পষ্ট হারাম। কেননা, তা কনে পক্ষের উপর অত‍্যাচার। তবে ইসলামে বরযাত্রী ‛না’ থাকলেও ‛কনে যাত্রী’ / ওয়ালীমাহ রয়েছে (হিন্দু সমাজে ‛বৌভাত’ নামে পরিচিত)। এখানেই শেষ নয়, ইসলাম তা ফরজ ঘোষণা করেছে। আর ওয়ালীমাহ’র সমস্ত খরচ বহন করতে হবে বর বা বর পক্ষকে। বলা হয়েছে, আব্দুর রহমান ইবনু আওফ বিবাহ করেন। নাবী (সা) তাকে বললেন- “ওলীমাহ করেছ?? না করলে, কমপক্ষে একটি ছাগল যাবেহ করেও ওলীমাহ কর” (বুখারী, হাদীশ 5155)। এছাড়াও মুসলিমের 1427 এর 1-3 এবং আবুদাউদের 2109 এও রয়েছে হাদীশটি।

বিবাহের দিন যা করতে হয়।

বর 2-4 জন সহ আসবে। কনের পক্ষ থেকে যিনি ওলী/ অভিভাবক হবেন, তিনি বলবেন- “এত টাকা মোহরের বিনিময়ে এই নারীকে তোমার সঙ্গে বিবাহ দিলাম” (বুখারী, হাদীশ 5087)। এটাই ইসলামী রীতি, এর বিপরীত রীতি হারাম। হ‍্যাঁ এখানে দুজন সাক্ষী থাকা বাধ‍্যতামূলক। এই সম্পর্কে পূর্বে কথা বলেছি। এখানে অভিভাবক খুত্ববাহ/ ভাষণ দেবেন। যদিও তা জরুরি নয়।

বিবাহের খুত্ববাহ, যা পাঠ করা জরুরি নয়।

জরুরি না হলেও আমরা মনে করি- “খুত্ববাহ ছাড়া বিবাহ পরিপূর্ণ হবে না”। অথচ বিবাহে‌র জন্য স্পেশাল কোনও খুত্ববাহ-ই নেই। কি অবাক করা বিষয়, তাই না?? অথচ তা আজ জরুরি হয়ে গেছে। আর যা জরুরি, তা আমরা ভুলে ‛নতুন ইসলাম’ তৈরি করেছি। যাইহোক, খুত্ববাহ বলতে যা আছে, তাকে বলা হয়- খুত্ববাতুল হাজাহ। যার অর্থ- প্রয়োজন হলেই যা পাঠ করা যায়। এটাকে বিবাহের খুত্ববাহ‌ও বলা হয়। আরবিতে ‛খুত্ববাতুন নিকাহ’ বলা হয়।

যদিও তা বিবাহ ছাড়াও যেখানে সেখানে পাঠ করা হোত। এজন্য আমি এখানে আর ঐ খুত্ববাহ উল্লেখ করছি না। একটি হাদীশে এই সম্পর্কে বিস্তারিত কথা বলা হয়েছে। যদি পড়তে চান, নং বলে দিচ্ছি, পড়ে নেবেন। তা রয়েছে ইবনু মাজাহ‌’র 1893 এ। তবে হাদীশটি 1892 এ বিস্তারিত থাকলেও, মুহাদ্দিস আলী যাঈ তা দ্বাইফ বলেছেন। তাই আমিও তা এখানে উদ্ধৃতি করছি না। যাইহোক, ইবনু মাজাহ’র 1893 এ যা রয়েছে, তা ইবনু হিব্বানের 6568 তেও রয়েছে, তাও খুব বিস্তারিত। মুসনাদ আহমাদের 2749 এ এবং সবচেয়ে বড় কথা, তা রয়েছে মুসলিমের 868 তে‌ও। যত গুলো হাদীশ নং দিলাম, ওগুলো দেখলে বুঝবেন- এটা শুধু বিবাহের খুত্ববাহ নয়।

 এছাড়াও তিরমিযী‌র 1105 এ, আবুদাউদের 2118 তে, মুসনাদ আহমাদের 4115 তে এবং দারেমীর 2241 এ।

ওয়ালীমাহ অনুষ্ঠান, তাতে যোগ দেওয়া বাধ‍্যতামূলক।

বিবাহ অনুষ্ঠান বলতে, তা মূলত ওয়ালীমাহ অনুষ্ঠান। যা অনুষ্ঠিত হবে বরের বাড়িতে। সেখানে কনের পক্ষ থেকে তার আত্মীয় স্বজন আসবে। অবশ্য বর নিজেও সেখানে তার আত্মীয় স্বজন‌ ও বন্ধুবান্ধবকে দাওয়াত করতে পারবেন। অবশ্যই সেখানে খাওয়া দাওয়া‌র আয়োজন থাকবে। যাইহোক, বলে রাখি- শুধু ওয়ালীমা‌হ করতে হবে নয়, বরং ‛করতেই’ হবে। নয়ত বিবাহ শুদ্ধ হবে না।

নাবী (সা) বলেছেন- “কমপক্ষে একটি মাত্র ছাগল যাবেহ করেও ওয়ালীমাহ কর” (বুখারী, হাদীশ 6082)। আরও বলা হয়েছে- “সেই ওয়ালীমাহর খাদ্য কতই না মন্দ, যা খাওয়ার জন্য কেবল ধনীদের দাওয়াত দেওয়া হয়। আর গরীবদেরকে তা থেকে বঞ্চিত করা হয় বলে, তারা তাতে যোগ দিতে পারে না। যে দাওয়াতে সাড়া দেয় না, সে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সা) এর সঙ্গে নাফরমানী করল” (মুসলিম, হাদীশ 1432 এর 1)। আরও বলা হয়েছে- “যখন তোমাদের কাউকে খাওয়ার জন্য দাওয়াত দেওয়া হয়, তখন সে যেন দাওয়াতে সাড়া দেয়। অতঃপর ইচ্ছা করলে আহার করবে, না হয় করবে না” (মুসলিম, হাদীশ 1430 এর 1)। মানে, ওয়ালীমাহ অনুষ্ঠান করা বাধ্যতামূলক, দাওয়াত করা হলে যোগ দেওয়া‌ও অবশ্য কর্তব্য।

বিবাহে গানবাজনা, এক হারিয়ে যাওয়া ইসলামী রীতি।

রুবাই বিনতু মুয়াইইয ইবনু আফরা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন : আমার বাসর রাতের পরের (ওয়ালীমাহর) দিন নাবী (সা) এলেন, আমার বিছানার ওপর বসলেন, যেমন বর্তমানে তুমি আমার কাছে বসে আছ। সে সময় আমাদের কিশোরী মেয়েরা দফ বাজাচ্ছিল ও বদরের যুদ্ধে শহীদ হ‌ওয়া আমার বাপ-চাচাদের বীরত্বের গান গাইছিল। তাদের একজন বলে বসল : আমাদের মধ্যে এক নাবী আছেন, যিনি আগামী দিনের কথা জানেন। তখন রাসূল (সা) বললেন : এই অংশটুকু বাদ দিয়ে আগে যা (গান) গাইছিলে, তাই গাও (বুখারী, হাদীশ 5147)।

ভাবা যায়! এমন হাদীশ থাকতেও উক্ত গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাত মুসলিম সমাজ থেকে উধাও! অথচ হাদীশটি শুধুমাত্র বুখারী‌তে নয়, বহু গ্ৰন্থে রয়েছে। যেমন, ইবনে হিব্বান, হাদীশ 5878 ও ইবনে মাজাহ, হাদীশ 1897 ও তিরমিযী, হাদীশ 1090 ও আবুদাউদ, হাদীশ 4922)। অথচ আমাদের সমাজে গানবাজনাকেই ‛হারাম ঘোষণা’ করে দেওয়া হয়েছে। অন‍্যদিকে নাবী (সা) সফরে গান শুনতে শুনতে‌ই সফর করতেন। এমনকি নাবী (সা) এর যুগে মাসজিদে‌র ভিতরে গানবাজনা হয়েছে।

দলিল দিন। অবশ্যই দেব। তবে এখানে‌ই শেষ নয়। তখন মাদীনাহর অলিগলিতেও গান বাজনা হোত। নাবী (সা) এর যুগে মাসজিদে‌র ভিতরে গানবাজনা হোত, দলিল রয়েছে বুখারীর 949 ও 952 নং হাদীশে। যান, যান দেখে আসুন। তবে হাদীশটি মুসলিমে রয়েছে 892 এর 1 এ, ইবনু মাজাহ‌তে 1898 এ। নাবী (সা) গান শুনতে শুনতে সফর করতেন, এটাও রয়েছে বুখারীর 6210 এ। হাদীশটি মুসলিমের 2323 এর 1 এও রয়েছে। তখন মাদীনাহর অলিগলিতেও গান বাজনা হোত, এর দলিল রয়েছে ইবনু মাজাহ‌’র 1899 এ।

এখানেই শেষ নয়। একটা ঘটনা বলি, শুনুন- কিছু তাবেঈ একবার মাদীনাহ‌তে গেলেন। এটা আশুরার দিন ছিল। তারা দেখলেন- “কিছু যুবতী মেয়ে দফ বাজাচ্ছে ও গান গাইছে”। বিষয়টি তাদের কাছে খটকা লাগল। যুবতী মেয়েরা দফ বাজাচ্ছে ও গান গাইছে! আবার গান তো হারাম। তারা গেলেন রুবাঈ বিনতু মুয়াইইয (রা) কাছে। গিয়ে তারা যা দেখেছেন, তা বললেন। তখন রূবাঈ বিনতু মুয়াইইয (রা) তার বিবাহের ঘটনা বললেন যে, আল্লাহর রাসূলের সামনে আমার বিবাহের উদ্দেশ্যে গানবাজনা হচ্ছিল, তিনি নিষেধ করেন নি। তাই গানবাজনা হারাম নয় (ইবনু মাজাহ, হাদীশ 1897)। প্রশ্ন হবে- রুবাই কে?? উপরে শুরুতে যার হাদীশ পড়লেন, মানে বুখারীর 5147 নং হাদীশটি তার‌ই বর্ণিত।

তাহলে ঐ হাদীশটার কি হবে, যেখানে বলা হয়েছে, নাবী (সা) তবলার আওয়াজ শুনে কানে আঙুল দিয়েছিলেন?? কিছুই হবে না। ঐ হাদীশটি দ্বাইফ/ জয়ীফ। চাইলে গুগলে গিয়ে Ibn majah, Hadees 1901 লিখুন। দারুস সালাম (সৌদির) তহকিককৃত হাদীশ পাবেন, যেখানে সুস্পষ্ট ভাবে বলা হয়েছে, হাদীশকি দ্বাইফ। কারণ উক্ত হাদীশে‌র রাবী ‛লাইশ’ একজন দুর্বল রাবী। তাহলে বুখারী‌র 5590 নং হাদীশে‌র কি হবে, যাতে বলা হয়েছে- “আমার উম্মাত হিরা (ব্যভিচার), হারীরা (রেশমী কাপড়), খামারা (মদ), ‛মায়াজিফা’ (বাদ‍্যযন্ত্র‌) কে হালাল/ বৈধ করে ফেলবে”।

ভাল কথা। এবার আমরা যুক্তি শুনুন- ব‍্যাভিচার হারাম, আপনি দেখাতে পারবেন (কুরআন, 17:32)। রেশমী কাপড় পড়া পুরুষের জন্য হারাম, তাও আপনি দেখাতে পারবেন (বুখারী, 5832-5834)। মদ হারাম, তাও আপনি দেখাতে পারবেন (কুরআন, 5:90)। বাদ‍্যযন্ত্র হারাম, এটা আপনি দেখিয়ে দিন। আর আপনি তা কখনও দেখাতে পারবেন না। কারণ, কুরআন ও সহীহ/ হাসান হাদীশের কোথাও বাদ‍্যযন্ত্র‌কে হারাম বলা হয় নি। প্রশ্ন হবে, তাহলে ‛মায়াজিফা’ মানে কি?? যদি বাদ‍্যযন্ত্র হোত, তাহলে বাদ‍্যযন্ত্র হারাম মর্মে আয়াত/ হাদীশ থাকত। তাহলে এর অর্থ কি?? “ইসলামে গানবাজনা” ব‌ইয়ে এই সম্পর্কে কথা বলব, ততদিন অপেক্ষা ছাড়া দ্বিতীয় অপশন নেই।

শেষ হাদীশ পেশ করি। বলা হয়েছে- আইশাহ (রা) নিজে দায়িত্ব নিয়ে এক আত্মীয়ের বিবাহ দিলেন আনসার পুরুষের সঙ্গে। তাকে স্বামীর সঙ্গে স্বামীর বাড়িতে পাঠান হল। তখন নাবী (সা) এলেন ও বললেন : “তার সঙ্গে কোনও গায়িকা পাঠাও নি, যে গিয়ে গানবাজনা করবে?? কারণ আনসার’রা তো আমদ ফূর্তি ও গানবাজনা পছন্দ করে” (ইবনু মাজাহ, হাদীশ 1900)। তবে আলবানী (রহ) বলেছেন- হাদীশের সনদ দ্বাইফ (ইর‌ওয়া, হাদীশ 1995 ও সিলসিলা দ্বাইফাহ, হাদীশ 2981)।

তবে মুহাদ্দিস আরনাউত বলেছেন- হাসান লিগাইরিহী। মানে, বাদ দেওয়া যাবে না। আর এর শাহেদ হাদীশ রয়েছে, তাও আবার বুখারীতে (হাদীশ 5162)। এছাড়াও হাদীশটি ইবনু আব্বাস (রা) আইশাহ (রা) থেকেও বর্ণনা করেছেন শরহু মুশকিলুল আশারের 3321 এ। হাদীশটি জাবির (রা) আইশাহ (রা) হতেও বর্ণনা করেছেন মুসনাদ আহমাদের 15209 এও। আবার হাদীশটি বেশ খানিকটা বিস্তারিত রয়েছে ত্বাবারানী আওসাত্বের 3265 তে।

মাসজিদে বিবাহ।

এ বিষয়ে হাদীশে বলা হয়েছে- “তোমরা মাসজিদে বিবাহ করবে, তোমরা বিয়ের ঘোষণা দিবে এবং এতে দফ বাজাবে” (তিরমিযী, হাদীশ 1089)। কিন্তু হাদীশটি দ্বাইফ। হাদীশে একজন রাবী রয়েছেন ঈশা ইবনু মাঈন, তিনি দ্বাইফ রাবী। দেখুন- সিলসিলা দ্বাইফাহ 978 ও দ্বাইফ জামে 966, আলবানী (রহ)। তবে এই হাদীশ দ্বাইফ হলেও মাসজিদ বিবাহের জন্য সর্বোত্তম স্থান, এতে কোনও সন্দেহ নেই, এর বিকল্প‌ও নেই।

“কবুল, কবুল ও কবুল” বলা ইসলাম বহির্ভূত রীতি।

যা সমাজে হয়- একজন বরের পক্ষ থেকে প্রস্তাব নিয়ে যাবে কনের কাছে গিয়ে বলবে : “লক্ষণ‌পুর নিবাসী অমুকের বড় পুত্র হোসেন কুরানী‌র সঙ্গে 3001 টাকা মোহরানায় আপনার সঙ্গে বিবাহ ঠিক করা হয়েছে। এই বিবাহ কি আপনি কবুল করবেন”?? তখন কনে বলবে : কবুল।

আবার‌ও বলা হবে : “লক্ষণ‌পুর নিবাসী অমুকের বড় পুত্র হোসেন কুরানী‌র সঙ্গে 3001 টাকা মোহরানায় আপনার সঙ্গে বিবাহ ঠিক করা হয়েছে। এই বিবাহ কি আপনি কবুল করবেন”?? তখন কনে বলবে: কবুল। এরপর আবারও কনেকে বলা হবে : “লক্ষণ‌পুর নিবাসী অমুকের বড় পুত্র হোসেন কুরানী‌র সঙ্গে 3001 টাকা মোহরানায় আপনার সঙ্গে বিবাহ ঠিক করা হয়েছে। এই বিবাহ কি আপনি কবুল করবেন”?? তখন কনে বলবে : কবুল।

তারপর যিনি কনের কাছে গিয়ে “উক্ত মন্ত্র” পড়লেন, তার সঙ্গে আরও দুজন থাকবে। যারা কনের থেকে “কবুল” শুনবেন। শুনে এসে তারা মজলিসে বলবেন যে, কনে “কবুল” বলেছে। তারপর এক‌ই ভাবে বরের কাছে কনের পক্ষ একজন প্রস্তাব পেশ করবেন 3 বার, তারপর বর‌ও 3 বলবে : কবুল। তারপর ইমাম খুত্ববাহ দিয়ে মোনাজত করে 1000- 2000 টাকানিয়ে চলে যাবেন।

প্রশ্ন হবে- এটাই কি ইসলামের নীতি নির্দেশনা?? আল্লাহ ও রাসূল থেকে এমন নিয়ম বর্ণিত হয় নি। সুতরাং এই নিয়ম ইসলামে নেই। তাহলে কি এসব মানুষের বানান নীতি নির্দেশনা?? শুধু এই নিয়ম কেন, মুসলিম সমাজে যে “ইসলাম” রয়েছে, যে “ইসলাম” আমাদের সম্মানিত আলেমগণ আমাদের‌কে শিখিয়েছেন, তা মূল ইসলামের 2-5 % মাত্র। বাকি পুরোটাই বানোয়াট। তাহলে কবুল, কবুল, কবুল ইসলামে নেই?? নেই। কিভাবে বিবাহ দিতে হয়, তা একটু আগেই আলোচনা করেছি।

বিবাহে নবদম্পতির জন্য শুভেচ্ছা ও দুয়া।

নাবী (সা) এভাবে দুয়া করতেন- “বারাকাল্লাহু লাকুম ওয়া বারাকাল্লাহু আলাইকুম ওয়া জামায়া বাইনাকুমা ফী খাইর” (ইবনু মাজাহ, হাদীশ 1905)। এর অর্থ- “আল্লাহ তোমাদের প্রতি বারাকা/ কল‍্যাণ দিক, আল্লাহ তোমাদের উপর বারাকা/ কল‍্যাণ দিক এবং তোমাদের‌কে দুজনকে খাইর/ উত্তমের মধ্যে একত্রিত রাখুক”।

আর যদি বিবাহের খবর অন‍্যের মুখ থেকে শোনে, তাহলে বলবে- “আল্লাহুম্মা বারিক লাহুম ওয়া বারিক আলাইহিম” (ইবনু মাজাহ, হাদীশ 1906)। এর অর্থ- “হে আল্লাহ, তাদের প্রতি বারিক/ কল‍্যাণ দিন, তাদের উপর বারিক/ কল‍্যাণ বর্ষণ করুন”। এছাড়াও বরের থেকে বিবাহের খবর শুনে বলতে হয়- “বারাকাল্লাহু লাকা” (বুখারী, হাদীশ 1907)। এর অর্থ- “আল্লাহ আপনাকে/ তোমাকে বারাকা/ কল‍্যাণ দান করুক”। আর কনের থেকে শুনলে বলতে হয়- “বারাকাল্লাহু লাকী”। অর্থ- “আল্লাহ আপনাকে/ তোমাকে বারাকা/ কল‍্যাণ দান করুক”।

স্ত্রীর জন্য তার স্বামীর দুয়া।

বিবাহের পর যখন স্ত্রী স্বামীর কাছে আসবে, নাবী (সা) তখন এই দুয়া পড়তে শিখিয়েছেন- “আল্লাহুম্মা ইন্নী আস‌আলুকা খাইরাহা ওয়া খাইরা মা জাবালতাহা আলাইহী, ওয়া আউযুবিকা মিন শাররিহা ওয়া শাররি মা- জাবালতাহা আলাইহী’’ (আবুদাউদ, হাদীশ 2160)। উক্ত হাদীশটি মিশকাতের 2446 এ, ইবনু মাজাহ’র 2252 তে, সহীহ জামে 341 এ রয়েছে।

উপরিউক্ত আরবি শব্দ গুলোর অর্থ- “হে আল্লাহ, আমি আপনার নিকট তার (স্ত্রীর) খাইর/ কল‍্যাণ চাই এবং তার সেই খাইর/ কল্যাণময় স্বভাব প্রার্থনা করি, যার উপর আপনি তাকে সৃষ্টি করেছন। আর আমি আপনার নিকট আশ্রয় চাই তার (স্ত্রীর) অনিষ্ট হতে এবং সেই মন্দ গুণের অনিষ্ট হতে, যা দিয়ে আপনি তাকে সৃষ্টি করেছেন”। মন্দ গুণ বলতে কি?? যা আমরা মাতাপিতার মাধ্যমে জিনগত ভাবে পেয়ে থাকি।

চারটি বিবাহ ও অজানা কিছু তথ্য।

তবে 4 টি স্ত্রী রাখার কথা মনু সংহিতা‌তেও রয়েছে 9:149 এ। বলা হয়েছে- “ব্রাহ্মণ চারটি স্ত্রী রাখতে পারবেন”। সে যাইহোক, ইসলামে কি 4 টি স্ত্রী রাখা কি বৈধ?? হ‍্যাঁ, দুটি শর্তে। যদি শর্ত পূরণ না হয়, তাহলে একাধিক স্ত্রী রাখা ‛হারাম, হারাম ও হারাম’। শর্ত দুটি কি?? ১) একাধিক স্ত্রী থাকলে, প্রতিটা স্ত্রীর প্রতি ন‍্যায় বিচার করতে হবে বা প্রতিটা স্ত্রীকে সমান অধিকার দিতে হবে। স্ত্রীদের যদি শাড়ি দেন, প্রতিটা স্ত্রীকে সমান মূল্য ও গুণমানের শাড়ি দিতে হবে। স্ত্রীদের গাড়ি উপহার দিলেও এই নীতি, বাড়ি উপহার দিলেও এই নীতি বজায় রাখতে হবে।

২) প্রথম স্ত্রী নিজের ইচ্ছামত পছন্দ করতে পারবেন, সেই অধিকার আপনার আছে। কিন্তু একের অধিক স্ত্রী চাইলে দ্বিতীয় বা তারপরের স্ত্রী গুলোকে ইয়াতীম (অনাথ/ গৃহহীন/ অসহায়) হতে হবে। এটা শর্ত। দলিল দিন। নিন, দিলাম- “আর যদি তোমরা চিন্তিত হ‌ও যে, ইয়াতীম নারীদের ব‍্যাপারে, তাহলে তোমরা তাদের মধ্যে যাদেরকে পছন্দ কর, তাদেরকে বিবাহ করে নাও একটি, দুটি, তিনটি কিংবা চারটি। তবে একাধিক স্ত্রীদের মধ্যে ন‍্যায় বিচার করতে না পারলে, বিবাহ কর মাত্র একটি” (কুরআন, 4:3)। আর বলে রাখি- “বিবাহ কর মাত্র একটি”, এই নির্দেশ একক ভাবে কোনও ধর্মগ্রন্থে নেই, কুরআন ছাড়া।

বহুবিবাহ প্রসঙ্গে ভারতের অবস্থান।

প্রচার করা হয় যে, “প্রতিটা মুসলিম‌ 4 টে করে বিবাহ করে”। আসল সত্য হল- 4 টে স্ত্রী আছে, এমন মাত্র 1 টি মুসলিম‌ও আপনি দেখাতে পারবেন না। আর বহুবিবাহ‌তে হিন্দু‌রাও পিছিয়ে নেই। একটা সময় (1954) পর্যন্ত হিন্দুরা মুসলিম‌দের চেয়েও বেশি পরিমাণে বহুবিবাহ করত। তথ্য সেটাই বলে। চাইলে গুগলে সার্চ করুন এটা লিখে- “how many percent hindus polygamy before 1955”। কি আসবে! 1955 এর আগে 5.8 % হিন্দু একাধিক স্ত্রী রাখত। তখন 5.7 % মুসলিম‌রা একাধিক স্ত্রী রাখত।

এর মানে, সামান্য হলেও হিন্দু‌রা মুসলিম‌দের থেকে বেশি বিবাহ করত। অবশ্য সেই সময়ে জৈন ও বৌদ্ধ‌রাও কম যেত না, বৌদ্ধরা 7.9 % ও জৈন‌রা 6.8 % পুরুষ একাধিক স্ত্রী রাখত। মানে, তারা তো হিন্দু ও মুসলিম উভয়কে হারিয়ে দিয়েছিল। বলা ভাল, তখন একাধিক স্ত্রী রাখার প্রতিযোগিতা‌ বৌদ্ধ‌রা জিতে গিয়েছিল এবং প্রথম প্রাইজ তারাই পেয়েছিল।

বহুবিবাহ ও বর্তমান ভারত।

না না, বর্তমানে শুধু মুসলিম‌রাই 4 টে বিবাহ করে, হিন্দু‌রা করে না। কিন্তু এটা জেনে আপনি অবাক হবেন যে, এই দাবিটা মারাত্মক মিথ্যা দাবি। মানে, ভারত সরকারের সমীক্ষা সেটাই বলছে। আপনি গুগলে গিয়ে শুধুমাত্র এটা লিখুন- According to the National Family Health Survey-5 (NFHS-5)। যা পাবেন, তা দেখে আপনি চমকে উঠবেন। কি পাব- “ভারতে 2.1 % খৃষ্টান একাধিক স্ত্রী রাখেন, 1.9 % মুসলিম একাধিক স্ত্রী রাখেন”।

আর হিন্দু শূন্য শতাংশ, তাই না?? না, হিন্দুরাও একাধিক স্ত্রী রাখেন এবং শতাংশে খুব কম‌ও নয়, “মোট 1.3 % হিন্দু একাধিক স্ত্রী রাখেন”। মানে, “মুসলিম‌রা 4 টে করে স্ত্রী রাখে” বলে চেল্লাতে চেল্লাতে দেখা গেল- প্রথম প্রাইজ খৃষ্টান‌রা নিয়ে গেল। মুসলিম‌রাও 2 শতাংশের কাছাকাছি একাধিক স্ত্রী রাখে, যা কাম‍্য নয়। কেননা, তারা কেউই কুরআনের ঐ 2 টি শর্ত মেনে বিবাহ করেন নি। তাই আমি তাদের শাস্তির দাবি জানাচ্ছি। তবে, হিন্দু‌রাও তো পিছিয়ে নেই, তাদের শাস্তির দাবি কে জানাবে! কেননা, তা প্রায় 1.5 % মতো, যা খুব কম‌ও নয়।

কাজিন ম‍্যারেজ/ কাজিনদের মধ্যে বিবাহ।

বলা হয়- “তোমরা তো ভাই বোনে বিবাহ কর”। যদিও তা মিথ্যা। ইসলাম চাচার কন‍্যা, পিসির কন‍্যা, মামার কন‍্যা ও মাসির কন‍্যাকে বিবাহের অনুমতি দেয়‌। প্রশ্ন হল- এতে সমস্যা কোথায়?? কোনও সমস্যা নেই, তারপর‌ও বলা হয় যে, “তোমরা তো ভাই বোনে বিবাহ কর”। অথচ যদি গুগলে গিয়ে লেখেন- “Cousin marriage in south India”, তাহলে দেখতে পাবেন- তামিলনাড়ু ও কর্ণাটকের মোট জনসংখ্যার প্রায় 23-28 % মানুষ কাজিন ম‍্যারেজ করে। কোথাও কোথাও 47 % পর্যন্ত। এবার গুগলে গিয়ে দেখে নিন যে, সেখানে মুসলিম‌দের জনসংখ্যা কত!

এটা করলেই বুঝবেন যে, সেখানকার হিন্দু‌রা মুসলিম‌দের চেয়ে বেশি কাজিন ম‍্যারেজ করে। এখানেই শেষ নয়, যদি আপনি গুগলে গিয়ে লেখেন- “দক্ষিণ ভারতে মামা ভাগ্নির বিবাহ”। তবে যা পাবেন, তা পেয়ে আপনি অবাক হয়ে যাবেন। কি পাব?? একটু কষ্ট করে নিজে লিখে চেক করে নিন, আমি বললে, কলরব বৃদ্ধি পেতে পারে। কিংবা গুগলে গিয়ে লিখুন- “ইভানকুলেট বিবাহ”। তাহলে যা পাবেন, তাতে অবাক হবেন। কি পাব?? নিজে লিখে চেক করে নিন।

এখন ভগবান শ্রীকৃষ্ণের প্রতি শ্রদ্ধা সম্মান ও ভক্তি বজায় রেখে একটা গুরুত্বপূর্ণ উদ্ধৃতি করতে চাই এবং তাঁর প্রতি সম্মানে লেখার মধ্যে (চন্দ্রবিন্দু) যোগ করলাম। যদিও তিনি আমার ঈশ্বর নন, কিন্তু পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষ তাঁকে ঈশ্বর হিসাবে মানেন। তাই আমি মুসলিম হয়েও তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা সম্মান ও ভক্তি প্রদর্শন করলাম। কেননা, তা আল্লাহর নির্দেশ (কুরআন, 6:108)। যেমন আল্লাহর ক্ষেত্রে তাঁর লিখেছি (চন্দ্রবিন্দু) যোগ করে, তেমনই তাঁর (ভগবান শ্রীকৃষ্ণের) ক্ষেত্রেও।

যাইহোক, এখন বিষয়টি উদ্ধৃতি করছি শুধু তথ্য হিসাবে, কাউকে আঘাত দেওয়ার জন্য নয়, ভগবান শ্রীকৃষ্ণের অপমান করার জন‍্যেও নয়। আর অপমান করাও তো ইসলামে নিষিদ্ধ (ঐ, 6:108)। এবার মূল বিষয়ে আসি- “ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তাঁর 2 জন পিসির কন‍্যাকে বিবাহ করেছিলেন”। আর এটা আমার বানান দাবি নয়। আপনি ভগবত পুরাণ খুলুন এবং চলে আসুন 10 নং স্কন্ধে‌র 58 নং অধ‍্যায়ের 31 নং শ্লোকে, বলা হচ্ছে- “মিত্রবন্দা ছিলেন ভগবান শ্রীকৃষ্ণের পিসি রাজাধিদেবীর কন‍্যা। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তাকে বিবাহ করেন”। এই অধ‍্যায়ে‌র 56 নং শ্লোকে বলা হচ্ছে- “শ্রুতকীর্তি ছিলেন ভগবান শ্রীকৃষ্ণের পিসি, যার কন‍্যা ছিলেন ভদ্রা। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তাকেও বিবাহ করেন”।

সুতরাং নিশ্চিত ভাবে বলা যায়- কাজিন ম‍্যারেজ খারাপ নয়। যদি খারাপ হোত, তাহলে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ কমপক্ষে এমন কাজ করতেন না। এছাড়াও অর্জুন‌ও সুভদ্রাকে বিবাহ করেছিলেন, যিনি ছিলেন ভগবান শ্রীকৃষ্ণের বোন। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনের মামাত ভাই। মানে, অর্জুনের মা কুন্তী ছিলেন ভগবান শ্রীকৃষ্ণের পিসি। মানে, সুভদ্রা অর্জুনের ‛মামাত বোন’। মানে, সুভদ্রা ভগবান শ্রীকৃষ্ণের বোন। মানে, সুভদ্রা ও অর্জুন ছিলেন একে অপরের কাজিন। রেফারেন্সের পালা, তাই না?? আপনাকে যেতে হবে- মহাভারতের আদি পর্বের 218 নং অধ‍্যায়ে‌র 14 নং শ্লোকে। যেখানে বলা হয়েছে- “অর্জুন সুভদ্রা‌র প্রেমে পড়েন”।

তারপর বহু ঘটনা রয়েছে, সেগুলো এখানে আর আনছি না। শুধু রেফারেন্সটা বলছি, আর তা হল- আদি পর্বের 220 নং অধ‍্যায়ে‌র 13 নং শ্লোকে বলা হয়েছে- “অর্জুন সুভদ্রাকে বিবাহ করেন”। যদিও প্রথমে ভগবান বলরাম সহমত ছিলেন না। পরে তাঁর পিতা ভগবান বাসুদেব বোঝালে ভগবান বলরাম সহমত হন। যাইহোক, যেটা বলতে চাইছি, তা হল- ঐ জন‍্যেই দক্ষিণ ভারতের হিন্দু‌রা কাজিন ম‍্যারেজ করে থাকেন। কেননা, কাজিন ম‍্যারেজ খারাপ নয়। যাইহোক, যেহেতু এখন অর্জুনের প্রসঙ্গ এল, সেহেতু বলে রাখি- অর্জনের‌ স্ত্রীর সংখ্যা ছিল 4 টি।

ত্বালাক সম্পর্কে প্রচলিত ভুল ধারণা ও তার শাস্তি।

আমরা ভাবি- ত্বালাক, ত্বালাক, ত্বালাক বললেই ত্বালাক/ ডিভোর্স হয়ে যায়/ যাবে। তা তো হবেই না, একেবারেই হবে না। উপরন্তু তা করলে পাপ হয়-ই, তার জন্য আবার স্বামীর শাস্তি‌ও হবে। একটা হাদীশ- “একত্রে 3 ত্বালাক বললেই উমার ইবনু খাত্তাব (খলিফা উমার) ত্বালাক দাতা স্বামীকে চাবুক মারার নির্দেশ দিতেন” (শারহু মায়ানীল আশার, হাদীশ 4188)। আরও হাদীশ রয়েছে সুনানুল বাইহাকী কুবরা, হাদীশ 14957 ও 14958 তে। যান, দেখে আসতে পারেন। ঘুরিয়ে বললে- বলা ভাল, পিঠের ছাল তুলে ফেলতেন। এর মানে হল, শুটিয়ে লাল করে দিতেন, নোংরামি বের করে দিতেন।

তাহলে ত্বালাক দেওয়ার আসল নিয়ম কেমন?? আর স্ত্রী কি স্বামী‌কে ত্বালাক দিতে পারে?? হ‍্যাঁ, পারে। আবার স্বামী‌র থেকে ত্বালাক নিতেও পারে। মানে কি?? ১) স্বামী স্ত্রীকে ত্বালাক দিতে পারে, ২) স্ত্রী স্বামীর থেকে ত্বালাক নিতেও পারে, ৩) আবার স্ত্রীও ত্বালাক দিতে পারে। মানে কি এসবের?? লাভ কি?? দলিল দেবেন কি?? নাকি যা ইচ্ছা, তা বলে চলে যাচ্ছেন?? যাব কোথায়! আমি শুধু লিখছি না, আপনার মস্তিষ্কে রয়েছি। মানে পালানোর উপায় নেই। সুতরাং দলিল দিতেই হবে।

একত্রে 3 ত্বালাক সম্পর্কে নাবী (সা) এর কঠোর ভাষা।

একবার আব্দুল্লাহ ইবনু উমার (রা) তার স্ত্রীকে পিরিয়ড চলাকালীন একত্রে 3 ত্বালাক দেন, এই খবর তার পিতা উমার ইবনু খাত্তাব নাবী (সা) কে জানালেন। নাবী (সা) বললেন- “তাকে নির্দেশ দাও, সে যেন তার স্ত্রীকে ফিরিয়ে আনে, নিজের কাছে রেখে দেয়। যতক্ষণ না সেই মহিলা পবিত্র হয়ে আবার ঋতুবতী হয় এবং আবার পবিত্র হয়। অতঃপর সে যদি ইচ্ছে করে, তাকে রেখে দিবে, আর যদি ইচ্ছ করে : তবে সহবাস/ শারীরিক সম্পর্ক না করে ত্বালাক দেবে। এটাই ত্বালাকের নিয়ম” (বুখারী, হাদীশ 5251 ও কুরআন, 65:1)।

এখানে শেষ নয়, একত্রে 3 ত্বালাক দিলে নাবী (সা) খুবই কঠোর ভাষায় বলেন- “সে কি ‛আল্লাহর কিতাব’ নিয়ে ছেলেখেলা করছে? অথচ আমি এখনও তোমাদের মাঝে জীবিত রয়েছি” (নাসাঈ, হাদীশ 3401)। তবে লক্ষণীয় যে, একত্রে 3 ত্বালাক দিলেও, তা 1 ত্বালাক বলে গণ‍্য করা হয়েছিল। এটা রয়েছে বুখারীর 5253 তে, আর রয়েছে মুসলিমের 1472 এর 1-3 এ। যদিও একত্রে 3 ত্বালাক দেওয়া‌কে কোনও কোন‌ও ‛সাহাবা’ হত‍্যা যোগ্য অপরাধ বলে মনে করতেন (নাসাঈ, হাদীশ 3401)। যদিও উমার ইবনু খাত্তাব (রা) এ ক্ষেত্রে 80 ঘা চাবুক মারতেন।

বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে, তাই না?? চিন্তা করবেন না, বিরক্ত হবেন না। আমি বুঝিয়ে বলছি। ধরুন, আপনি আপনার স্ত্রীকে ত্বালাক দিতে চাইছেন। তখন কি করবেন! এখান থেকে বলব। তবে বিষয়টি শুধু সামাজিক নয়, ইসলামে ত্বালাক বিষয়টি যথেষ্ট মানসিক। আমি এই বিষয়েও কথা বলব। সুতরাং মনোযোগ দিন। ধরুন- আপনার স্ত্রী খুবই গুরুত্বপূর্ণ ইসলামী নীতি আদর্শ উপেক্ষা করছে, আল্লাহর ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করছে না। অথবা শিথিলতা করছে। আর এটা বারবার করছে, কোনও ভাবে নিজেকে সংশোধন করছে না। আর সেই জন্য সংসারে অশান্তি হচ্ছে/ আপনার সঙ্গে মনোমালিন্য হচ্ছে। যদিও আপনি বারবার বুঝিয়েছেন।

স্ত্রীকে ত্বালাক দেওয়ার আগে চার শর্ত রয়েছে।

তখন আপনি স্ত্রীকে ত্বালাক দেওয়ার সিদ্ধান্ত করলেন, বা ত্বালাক দিতে চাইছেন। তখন প্রথম করণীয় কি?? এখন করণীয় হল- ১) স্ত্রীকে বোঝাতে হবে যে, তার (মানে, স্ত্রীর) ভুল হচ্ছে, যে জন্য সংসারে অশান্তি হচ্ছে। ২) এই বিষয়ে আল্লাহ এবং রাসূল কি বলেছেন, তাও বোঝাতে হবে। ৩) এখন থেকেই বিছানা আলাদা করে নিতে হবে দলিল দিই! দেখুন- “যদি তোমরা তাদের (আল্লাহ ও রাসূলের) অবাধ্যতা‌র ভয় পাও, তাহলে তাদেরকে বোঝাও। আর তাদের থেকে বিছানা আলাদা কর এবং (উক্ত বিষয়ে আয়াত ও হাদীশ) বর্ণনা কর” (কুরআন, 4:34)।

নোট : প্রচলিত বঙ্গানুবাদে “বর্ণনা কর” অনুবাদ না করে, অনুবাদ করা হয়েছে- “তাদের‌কে প্রহার কর”। যা সম্পূর্ণ ভুল অনুবাদ। কেননা, নাবী (সা) বলেছেন- “স্ত্রীকে গালাগালি ও মারধোর করবে না” (আবুদাউদ, হাদীশ 2144)। তাই প্রহার অনুবাদ করা মানে, নাবী (সা) কে অবজ্ঞা করা। কেননা, ‛দ্বারাবা’ শব্দের অর্থ- ‛বর্ণনা করা’। কুরআনে কমপক্ষে 20-50 বার রয়েছে। যেমন, এটা রয়েছে 3:27 এ। এছাড়াও 14:24, 16:75 ও 76, 16:112, 25:9, 30:28, 36:78, 39:29, 43:17, 66:10 ও 11 নং আয়াতে। উক্ত আয়াত শুধু ‛দ্বারাবা’ শব্দ রয়েছে, তাছাড়া ‛দ্বারাবা’ দ্বারা গঠিত অন্য শব্দের সংখ্যা বহু। যাইহোক, মূল বিষয়ে আসি।

বিছানা আলাদা করতে বলা হয়েছে, এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। স্ত্রীর উপর মানসিক চাপ দেওয়ার জন্য। মানুষের শরীরের ক্ষিদে আছে, তা না পেলে মানুষ পাওয়ার চেষ্টা করবে। ফলত হতে পারে যে, স্ত্রী স্বামীর সঙ্গ পেতে চাইবে এবং মনোমালিন্য দূর হবে, সংসারে শান্তি ফিরে আসবে। এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এজন্য‌ও যে, এভাবে শুধু স্ত্রীর উপর চাপ নয়, স্বামীর উপর‌ও যথেষ্ট চাপ পড়বে। হতে পারে, বিছানা আলাদা হলে স্বামীও স্ত্রী সঙ্গ পেতে চাইবে। ফলত স্বামী স্ত্রীর প্রতি নরম হয়ে যাবে।

বিছানা আলাদা করেও সমস্যা মিটছে না, তখন কি করা যাবে?? ৪) তখন আপনি আপনার পরিবারের পক্ষ থেকে একটা সালিশ নিযুক্ত করবেন এবং আপনার স্ত্রীর পরিবারের পক্ষ থেকেও একটা সালিশ নিযুক্ত করবেন। তারা বিষয়টি নিয়ে আপনার ও আপনার স্ত্রীর সঙ্গে কথা বলবেন। যাতে আপনাদের মধ‍্যে সমস্যা মেটান যায়। এটা রয়েছে 4:35 এ। কিন্তু প্রশ্ন হবে- যদি তাতেও সমস্যা না মেটে, তাহলে?? তখন কি হবে!

ত্বালাক দেওয়ার সময় ছয়টি শর্ত রয়েছে।

তখন বিষয়টি ত্বালাকের দিকে এগিয়ে যাবে। এই সম্পর্কে কথা বলা হয়েছে 65:1 এ। তখন কি ত্বালাক, ত্বালাক, ত্বালাক বলতে হবে! না। তাহলে! এক সঙ্গে 3 ত্বালাক বলা যায় না, এই দলিল তো আগে দিয়ে রেখেছি। ঠিক নয় কি?? ত্বালাক দেওয়ার আগে 4 টি শর্ত রয়েছে। যেগুলো আগে উল্লেখ করা হয়েছে। যখন ত্বালাক দেবেন, তখন কিছু শর্ত রয়েছে, সেগুলো‌ও পূরণ করতে হবে। নয়ত ত্বালাক হবে না। 

যেমন, ১) পিরিয়ড অবস্থায় ত্বালাক দিতে পারবেন না (বুখারী, হাদীশ 5251)। ২) গর্ভবতী অবস্থায় স্ত্রীকে ত্বালাক দিতে পারবেন না (কুরআন, 2:228)। ৩) রাগের বসে ত্বালাক দিতে পারবেন না (আবুদাউদ, হাদীশ 2193)। ৪) ত্বালাক দেওয়ার সময় 2 জন সাক্ষী থাকতে হবে, তাও সশরীরে (কুরআন, 65:2)। ৫) মস্তিষ্ক বিকৃতি অবস্থা বা নেশাগ্রস্ত অবস্থায় ত্বালাক হবে না (আবুদাউদ, হাদীশ 4403)। ৬) স্ত্রীর সামনে দাঁড়িয়ে ত্বালাক দিতে হবে, সাক্ষীদের উপস্থিতিতে। মানে, ত্বালাক দেওয়ার সময় 6 টি শর্ত পূরণ করতে হবে, ত্বালাক দেওয়ার আগে 4 টি, নয়ত ত্বালাক হবে না। ওটা ত্বালাকের নাটক বলেও গণ‍্য হবে না।

আল্লাহ ‛ত্বালাক’ পছন্দ করেন না।

মানে, উক্ত 10 টি শর্তের একটি বাদ গেলেই ত্বালাক হবে না। মানে, এই ব‌ইটি পড়ার আগে অবশ্যই আপনার মনে হোত- “ত্বালাক দেওয়া তো খুবই সহজ”। আমার মনে হয় যে, এখন আপনার ধারণা বদলেছে। এখন মনে হচ্ছে- “এর কঠিন কাজ আর নেই”। এর মানে, আল্লাহ চান- “ত্বালাক না ঘটুক, মানুষের কল্যাণে আল্লাহ তার বৈধতা দিয়েছেন। এ জন্য নাবী (সা) বলেছেন- “আল্লাহর কাছে সবচেয়ে নিকৃষ্ট হালাল/ বৈধ কাজ ত্বালাক” (আবুদাউদ, হাদীশ 2178)। যদিও আলবানী (রহ) হাদীশটিকে দ্বাইফ বললেও (ইর‌ওয়া, হাদীশ 2040)। কিন্তু আলী যাঈ (রহ) হাসান বলেছেন। অন‍্যদিকে দারুস সালাম (সৌদি) সহীহ বলেছে।

ত্বালাক দেওয়ার ‛সঠিক’ পদ্ধতি।

ত্বালাকের 10 টি শর্ত পূরণ করে সাক্ষীদের সামনে স্ত্রীকে বলতে হবে- “তোমাকে ত্বালাক দিলাম”। ধরুন, উক্ত ত্বালাকটি ডিসেম্বরের 25 তারিখে ঘটছে। এরপর জানুয়ারির 25 তারিখে 10 টি শর্ত পূরণ করে বলতে হবে- “তোমাকে ত্বালাক দিলাম”। ঠিক এক‌ই ভাবে 10 টি শর্ত পূরণ করে ফেব্রুয়ারির 25 তারিখে বলতে হবে- “তোমাকে ত্বালাক দিলাম”। মানে, 3 টি ত্বালাক ঘটতে 3 মাস সময় লাগবে। এর সঙ্গে আরেকটি শর্ত রয়েছে, তা হল- এই 3 মাস স্ত্রী তার স্বামীর বাড়িতে‌ই থাকবে (কুরআন, 65:1)। এমনকি এক‌ই রুমে থাকবে। শুধু বিছানা আলাদা হবে। কেন?? কারণ যৌন আকর্ষণ যেন তাদের মধ্যে ত্বালাক ঘটতে না দেয়।

গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন- 1 টি বা 2 টি ত্বালাক হয়েছে, 3 টি ত্বালাক হয় নি। তখন স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যে মনোমালিন্য মিটে গেছে, তখন কি ত্বালাক বন্ধ করা যাবে?? অবশ্যই। ঐ জন‍্যেই তো 3 মাসে 3 টি ত্বালাক, যাতে সিদ্ধান্ত বদলানোর সুযোগ থাকে। আল্লাহ সেটাই বলেছেন- “তোমরা জান না, হয়ত আল্লাহ এরপর মনোমালিন্য মিটে যাওয়ার কোনও উপায় করে দেবেন” (কুরআন, 65:1)। আর ঐ জন‍্যই একত্রে 3 ত্বালাক বলা ইসলামে নিষিদ্ধ ও শাস্তি যোগ্য অপরাধ।

বিচ্ছেদ পরবর্তী জীবন।

ঠিক আছে, 3 মাস ধরে 3 টি ত্বালাক ঘটল, তারপর স্ত্রীর কি হবে?? স্ত্রী যেখানে ইচ্ছা, সেখানে চলে যেতে পারে। মানে, বাপের বাড়ি, আত্মীয়দের বাড়ি বা ভাড়া বাড়িতে। ভাড়া বাড়িতে জীবন যাপন কিভাবে করবে?? আপনি মনে হয় বুঝতে পারেন নি। আমরা ব‌ইয়ের শুরুর দিকে ‛মোহর’ সম্পর্কে আলোচনা করেছি তো। এখানে বিয়ের সময় যে মোহর ধার্য্য করা হয়েছিল, সেটা কাজে লাগবে। যান, ব‌ইয়ের শুরুর দিকে গিয়ে ‛মোহর’ অংশটুকু পড়ে আসুন। সেখানে এও দেখিয়েছি যে, মোহর হল- বিবাহের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত।

এখানে‌ও রয়েছে স্বামীর উপর একটি গুরুত্বপূর্ণ মানসিক চাপ। সেটা কি?? সেটা হল- স্বামী যদি স্ত্রীকে ত্বালাক দিতে চায়, তখন তাকে এটাও ভাবতে হবে- “ত্বালাক দিলেই মোহর দিতে হবে”। মানে, মোহর দেওয়ার ভয়ে স্বামী ত্বালাক থেকে পিছিয়ে যেতে পারে। অর্থাৎ বিবাহের সময় ধার্য্য করা মোহর ‛ত্বালাকের পথে’ বাধা দেবে। ঐ জন্য বিয়ের সময় ‛বেশি পরিমাণ’ মোহর ধার্য্য করতে হয়। কমপক্ষে “1.5 কেজি রূপা” ধার্য্য করা উচিৎ, যা ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ নীতি ও সুন্নাহ।

বিচ্ছেদের পর ফিরিয়ে নেওয়া।

3 মাসে 3 টি ত্বালাক ঘটল, বিচ্ছেদ হয়ে গেল। তারপর স্ত্রী তার বাপের বাড়ি/ ভাড়া বাড়িতে চলে গেল। স্বামী তার নিজ বাড়িতে র‌ইল। এখন কি স্বামী তার স্ত্রীকে ফিরিয়ে নিতে পারবে?? অবশ্যই পারবে। যদি স্ত্রী ফিরতে চায়, তাহলে স্বামী তাকে ফিরিয়ে নিতে পারবে। হালালা করতে হবে নাকি?? হালালা তো ইসলামে নেই, এর শাস্তি মৃত্যু‌দণ্ড। যান, ব‌ইয়ের শুরু থেকে আরও একবার ঘুরে আসুন। ঠিক আছে, কিন্তু ফিরিয়ে নেওয়ার দলিল দিন। দেব, চিন্তা করবেন না।

কুরআনের 2:228 এ যান, দলিল রয়েছে। ফিরিয়ে নেওয়া যাবে, তবে 3 মাসের মধ্যে। 3 মাসের বেশি হলে কি হবে?? স্পেশাল কিছুই হবে না, স্ত্রীকে নতুন ভাবে বিবাহ ও নতুন মোহর ধার্য্য করতে হবে। এর মানে, স্বামীর লোকসান, স্ত্রীর লাভ। মানে, আবার নতুন মোহর, মজাই মজা। যাইহোক, 3 মাসের মধ্যে হলে পুরাতন বিবাহ বহাল থাকবে।

বিচ্ছেদের পর নতুন স্বামী/ স্ত্রী গ্ৰহণ।

স্ত্রী যদি যদি ফিরে আসতে না চায়, স্বামী যদি ফিরিয়ে না নিতে চায়, তখন কি হবে?? স্বামী যেদিন ইচ্ছা, সেদিন অন্য কাউকে বিবাহ করে নিতে পারবে। আর বিচ্ছেদের 3 মাস পর স্ত্রীও যাকে ইচ্ছা তাকে বিবাহ করে নিতে পারবে। কেন, 3 মাস কেন?? এখানে রয়েছে সুন্দর একটি বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা। প্রথম বিষয়- ১) যদি স্ত্রী পুরাতন স্বামীর দ্বারা গর্ভবতী হন, তাহলে তা সুস্পষ্ট হবে। তবে, এটা বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা নয়।

এবার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা- ২) সাধারণ ভাবে স্বামীর বীর্য ও শুক্রাণু DNA কিছু দিন থেকে সপ্তাহ, কয়েক সপ্তাহ নারীর যৌন অঙ্গের বিভিন্ন পথে থেকে যেতে পারে। সেগুলো পুরোপুরিভাবে পরিষ্কার হয় নারীর পিরিয়ডের মাধ্যমে। এ জন্য‌ এই 3 মাস নারীদেরকে অন্য পুরুষ‌কে বিবাহ ক‍রতে কুরআনে 2:228 এ নিষেধ করা হয়েছে। তবে, পুরাতন স্বামীর কাছে ফিরে যেতে শার‌ঈ বা বৈজ্ঞানিক ভাবে কোনও নিষেধাজ্ঞা নেই।

কিছু প্রশ্ন ও উত্তর।

ধরুন, 2 মাসে 2 ত্বালাকের পর স্বামীর সঙ্গে মনোমালিন্য মিটে গেছে। তখন এই 2 ত্বালাকের কি হবে?? কিছুই হবে না। ভবিষ্যতে যদি কখনও মনোমালিন্য আবারও শুরু হয়, তাহলে গত 2 ত্বালাক বাদ দিয়ে সমস্ত (10 টি) শর্ত সহ 3 ত্বালাক থেকে প্রক্রিয়া শুরু হবে। মানে, 1 টি ত্বালাক হলেই ডিভোর্স হয়ে যাবে।

এবার ধরুন, 3 টি ত্বালাক হ‌ওয়ার পর ডিভোর্স হ‌য়ে গেল। ডিভোর্সের 3 মাসের মধ্যে বা 6-8 মাস থেকে 2-4 বছর প‍র নতুন করে বিবাহ ও মোহর ধার্য্য করে স্ত্রী স্বামীর কাছে ফিরে এল। আবার যদি মনোমালিন্য শুরু হয়, তখন কি হবে?? আবার নতুন করে উক্ত 10 টি শর্ত সহ 3 মাসে 3 টি ত্বালাকের প্রক্রিয়া হবে। মনে করুন, আবারও 3 মাসে 3 টি ত্বালাক হ‌ওয়ার পর ডিভোর্স হয়ে গেল। স্বামী ও স্ত্রী আলাদা হয়ে গেল, তারপর?? প্রথমবার বিচ্ছেদ হ‌ওয়ার পর পরিস্থিতি যেমন ছিল, এখনও তেমন। 3 মাসের মধ্যে ফিরলে ভাল, 3 মাস পর ফিরলে নতুন করে বিবাহ করে, নতুন মোহর ধার্য্য করে ফিরতে হবে।

তৃতীয়বার বিচ্ছেদ হ‌ওয়ার পর।

ধরুন, 3 মাসের মধ্যে বা 6-8 মাস থেকে 2-4 বছর প‍র নতুন করে বিবাহ ও মোহর ধার্য্য করে আবার‌ও স্বামী স্ত্রী নতুন করে সংসার করতে শুরু করল, আবার অশান্তি শুরু হল, তখন কি হবে?? কিছুই হবে না। আবার নতুন করে 10 টি শর্ত সহ 3 মাসে 3 টি ত্বালাক হবে। বুঝলাম, ঠিক আছে। 3 মাসে 3 টি ত্বালাক হ‌ওয়ার পর আবার‌ও বিচ্ছেদ হয়ে গেল, এরপর??

আর সাধারণ পরিস্থিতি‌তে ফিরে আসার কোনও অপশন নেই। স্বামী আর স্ত্রীকে কোনও ভাবে ফিরিয়ে আনতে পারবে না (কুরআন, 2:230)। ইসলাম তাকে ‛যথেষ্ট সুযোগ’ দিয়েছে। আর ঐ স্বামী ও স্ত্রী সেই সুযোগের অপব্যবহার করেছে, ছেলেখেলা করেছে। তাই সাধারণ পরিস্থিতি‌তে ফিরে আসার কোনও অপশন নেই। মাত্র 2 টো অপশন আছে। সেটা কি?? যদিও সেটা ‛বাইচান্স’ ঘটতে পারে।

তৃতীয়‌বার বিচ্ছেদের পর স্বামী ও স্ত্রীর মিলন।

সেই 2 টো অপশন কি?? ১) যদি ঐ বিচ্ছেদ ঘটা স্ত্রী অন্য কাউকে বিবাহ করে এবং ঐ স্বামী যদি মারা যায়, তাহলে নতুন স্বামীর মৃত্যুর 4 মাস 10 দিন পুরাতন স্বামী‌র কাছে ফিরতে পারবে (কুরআন, 2:234-235)। ২) নতুন স্বামীর সঙ্গে কোনও কারণে অশান্তি সৃষ্টি হয় এবং তারা উভয়ে বিচ্ছেদ চায়। সেক্ষেত্রে ত্বালাকের 10 টি শর্ত মেনে 3 মাসে 3 টি ত্বালাক হয়, সেক্ষেত্রে ঐ নারী তার পুরাতন স্বামীর কাছে ফিরতে পারবে (কুরআন, 2:230)। মানে, নতুন স্বামীর সঙ্গে বিচ্ছেদ ঘটার 3 মাস পর।

যদিও উক্ত আয়াহটির প্রসঙ্গ না জেনে, উক্ত আয়াহ‌টিকে হালালা’র দলিল হিসাবে নিয়ে আসেন। এমনকি বহু আলেম‌ও উক্ত আয়াহকে হালালা’র দলিল হিসাবে নিয়ে আসেন, তাদের বলব যে, আপনাদের সম্পর্কে কুরআনে বলা হয়েছে- “ লা ইয়াকিলুন”। অর্থাৎ “আপনাদের মস্তিষ্ক নেই” (কুরআন, 29:63)। সঙ্গে দেখুন কুরআনের 8:22 ও 10:100 আয়াত।

মনে রাখুন- এখানে কোনও ধরণের প্ল‍্যানিং করা যাবে না যে, ঐ স্ত্রী অন্য কাউকে বিবাহ করে, নতুন স্বামীকে হত্যা করে তার পুরাতন স্বামীর কাছে ফিরে আসবে। অথবা ঐ স্ত্রী অন্য কাউকে বিবাহ করে, তার থেকে ত্বালাকের 10 টি শর্ত মেনে 3 মাসে 3 টি ত্বালাক নিয়ে পুরাতন স্বামীর কাছে ফিরে আসবে। কোনও প্ল‍্যানিং নয়, উক্ত ঘটনা 2 টো শুধুমাত্র বাইচান্স‌ই ঘটতে পারে।

উক্ত 2:230 নং আয়াহটির তাফসীরে ইমাম কুরতুবী (রহ) খলিফা উমার (রা) দ্বারা ঘোষিত শাস্তির হাদীশটি এনেছেন। ওটা সেই হাদীশ, যা আমরা শুরুতেই এনেছিলাম। কি শাস্তি?? হালালা’র শাস্তি, আর তা হল- রজম করা/ প্রকাশ‍্যে পাথর মেরে হত্যা করা। আমিও আমার তাফসীরে উক্ত হাদীশটি রেখেছি। তবে আল্লাহ জানতেন- “কিছু ‛হারামী স্বামী’ স্ত্রীকে ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য অন্য পুরুষ‌কে দিয়ে হালালা করাবে”। তাই আল্লাহ সাবধান করে বলেছেন- “তোমরা আল্লাহর আয়াতকে নিয়ে ছেলেখেলা করবে না”। ভিন্ন অনুবাদ‌ও হয়- “তোমরা আল্লাহর আয়াতকে হাসি মজার বস্তুতে পরিণত করবে না” (কুরআন, 2:231)। প্রশ্ন হবে- প্ল‍্যানিং বিবাহ নিষিদ্ধ, তা কোথায় পাব?? পরের অংশে নজর রাখুন।

হালালা’র দলিল খণ্ডন।

মজার ব্যাপার হল- অনেকেই আবার হালালা‌’র সমর্থনে হাদীশ খুঁজে পান। তাও আবার বুখারী থেকে। ওটা কোন হাদীশ?? চলুন দেখি-“ আইশাহ (রা) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন : রিফা কুরাযীর স্ত্রী নাবী (সা) এর নিকট এসে বলল যে, আমি রিফা’র স্ত্রী ছিলাম। কিন্তু সে আমাকে তালাক দেয়। পরে আমি আবদুর রহমান ইবনু যুবাইর’কে বিয়ে করলাম। কিন্তু তার সঙ্গে রয়েছে কাপড়ের আঁচলের মতো নরম কিছু (অর্থাৎ তার সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক হয় নি)। তখন নাবী (সা) বললেন : তবে কি তুমি রিফা‘র নিকট ফিরে যেতে চাইছ?? না, তা হয় না। যতক্ষণ না তুমি তার মধুর স্বাদ গ্রহণ করবে, সে তোমার” (বুখারী, হাদীশ 2639)।

আইশাহ (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন : রাসূল (সা) কে এক মহিলা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হয়, যাকে একজন বিবাহ করে, অতঃপর সে তাকে ত্বলাক দেয়। এরপর সেই মহিলা আরেকজনকে বিয়ে করে। কিন্তু সে তার সাথে সঙ্গমের আগেই ত্বালাক দেয়। এমতাবস্থায় উক্ত মহিলা প্রথম স্বামীর জন্য হালাল/ বৈধ হবে কি? তিনি বললেন : না, যে পর্যন্ত না সে (নতুন স্বামী) ঐ স্ত্রীর স্বাদ গ্রহণ করে (মুসলিম, হাদীশ 1433 এর 4)।

বুঝতে পারেন নি?? দাঁড়ান দাঁড়ান, বুঝিয়ে বলছি- উক্ত 2 টি ঘটনায় পুরাতন স্বামীর কাছে ফিরে যাওয়ার জন্য হালালা প্ল‍্যানিং করা হচ্ছিল (নাসাঈ 3413)। নাবী (সা) তা নিষিদ্ধ করেন। এই বলে যে, “পুরাতন স্বামীর কাছে ফিরে যাওয়ার জন্য এভাবে বিবাহের নাটক করা যায় না। নতুন বিবাহ হবে, আগ্ৰহের বিবাহ, পছন্দের বিবাহ, নাটক বিবাহ নয়”। কিছু হাদীশ আনি, দেখুন-

একজন তার স্ত্রীর সঙ্গে তৃতীয় বিচ্ছেদ ঘটিয়েছে, এখন সে অনুতপ্ত এবং স্ত্রীকে ফিরিয়ে নিতে চায়। এই উদেশ্য নিয়ে তার ভাই ঐ নারীকে বিবাহ করেছে, যেন তার দাদার জন্য ঐ নারী (ত্বালাকের পর) হালাল/ বৈধ হয়ে যায়। বিষয়টি আসে ইবনু উমার (রা) এর কাছে। তিনি বলেন- “না, ঐ স্ত্রী পূর্ব স্বামীর জন্য হালাল হবে না। তবে যদি তা আগ্ৰহের বিবাহ, পছন্দের বিবাহ, স্থায়ী সংসার করার উদেশ্যে বিবাহ হোত, তারপর যদি বাইচান্স ত্বালাক হোত, তাহলে বিষয়টি ভিন্ন হোত। আমরা নাবী (সা) এর যুগে এই ধরণের প্ল‍্যানিং করা বিবাহকে সিফাহ/ পরিকল্পিত ধর্ষণ মনে করতাম” (বাইহাকী কুবরা, হাদীশ 14189। এ ছাড়াও এর‌ কাছাকাছি বক্তব্য রয়েছে ত্বাবারানী আওসাত্ব এর 6246 এ।

পরবর্তী হাদীশ বাইহাকী কুবরা এর 14192, বলা হয়েছে- খলিফা উসমান (রা) এর কাছে একজন আসে, সে তার প্রতিবেশী, একজন নারীকে বিবাহ করতে চাইছেন। কারণ তার স্বামী তার সঙ্গে তৃতীয় বার বিচ্ছেদ ঘটিয়েছে। কিন্তু এখন স্ত্রীকে ফিরে পেতে চাইছে। ঐ প্রতিবেশী ঐ নারীকে বিবাহ করে তার স্বামীর জন্য হালাল/ বৈধ করতে চাইছে। তখন উসমান নির্দেশ জারি করে বললেন- “না, তুমি এমন কাজ কর না। স্থায়ী ভাবে সংসার করার উদেশ্য ছাড়া (ইসলামে) বিবাহ নেই” (বাইহাকী কুবরা, হাদীশ 14192)।

এবার শেষ হাদীশ, মুসান্নাফ ইবনু আবু শাইবাহ 17971, বলা হয়েছে যে, নাবী (সা) বলেছেন- “প্ল‍্যানিং হালাল/ বৈধ নয়, যতক্ষণ না দ্বিতীয় স্বামী আগ্ৰহ এবং কামনা করে বিবাহ করে”। আমার মনে হয়- এখানে আর আমাকে কিছু বলতে হবে না। আপনারা বুঝে নিয়েছেন। কেননা, আপনারা বুদ্ধিমত্তা সম্পন্ন মানুষ ও বুদ্ধিজীবী।

পরিস্থিতি খারাপ হল উমার (রা) এর যুগ থেকে।

পূর্বে দেখিয়েছি যে, স্ত্রীকে 10 টি শর্ত সহ ত্বালাক দেওয়া খুবই কঠিন এবং ত্বালাকের প্রক্রিয়া ধীরগতির হ‌ওয়াতে এবং তাতে মানসিক চাপ গুলো থাকায় সাধারণ‌ত ত্বালাক হোত না। এছাড়াও রাগের বসে কেউ 3 ত্বালাক বললেও ত্বালাক হোত না, তা 1 টি ত্বালাক বলে গণ‍্য করা হোত। এগুলোর দলিল আমি পূর্বে‌ই দিয়ে গেছি। তাই এখন আর দলিল দিচ্ছি না। সমস্যা শুরু হয় খলিফা উমার (রা) এর  শাসনের 2 বছর পর থেকে। কি হয়েছিল??

তিনি একত্রে 3 ত্বালাক‌ বললেই তাকে 3 ত্বালাক বলে গণ‍্য করে বিচ্ছেদ ঘটিয়ে দিতেন। তখন থেকেই শুরু হয় গণহারে ত্বালাক দেওয়া। যাইহোক, এটা পাব কোথায়?? এটা রয়েছে মুসলিম এর 1472 এর 1-3 এ। কি বলা আছে ওখানে?? চিন্তা করতে হবে না, যা আছে আপনার জন্য তা নিচে দিলাম, দেখুন-

“রাসূল (সা) এর যুগে, আবুবকর (রা) এর যুগে ও উমার (রা) এর খিলাফতের প্রথম 2 বছর পর্যন্ত 3 ত্বালাকের ঘটনা ঘটলে তা 1 ত্বালাক গণ‍্য করা হত। পরে উমার (রা) বললেন : লোকেরা একটি বিষয়ে অতি ব্যস্ততা দেখিয়েছে, যাতে তাদের জন্য ধৈর্য্য ও সুযোগ গ্রহণের অবকাশ ছিল। এখন যদি বিষয়টি তাদের জন্য কার্যকর সাব্যস্ত করে দেই, তবে তা-ই কল্যাণকর হবে। পরে তিনি তা তাদের জন্য বাস্তবায়িত ও কার্যকর সাব্যস্ত করলেন”।

এরপর থেকে মুসলিম সমাজে অহরহ 3 ত্বালাকের ঘটনা ঘটতে থাকল। যেহেতু 3 ত্বালাক‌ বলাকে 3 ত্বালাক গণ‍্য করা শুরু হল, সেহেতু মানুষের কাছে সুযোগ কমে গেল। নয়ত এর আগে 3 টি ত্বালাক ঘটতে 3 মাস লাগত ও পরিস্থিতি এমন হোত যে, 3 টি ত্বালাকে যেত না এবং তার আগেই বিষয়টি থেমে যেত, মনোমালিন্য মিটে যেত। কিন্তু উমার (রা) যুগ 3 ত্বালাক বললেই বিচ্ছেদ ঘটে যেতে লাগল। তারপর‌ও 3 মাসের মধ্যে স্ত্রীকে ফিরিয়ে নেওয়া যেত কুরআনের 2:228 মুতাবিক।

এর পরবর্তীতে কিছু “হারামখোর গোছের” আলেমদের উদ্ভব ঘটে, যারা 3 মাসের মধ্যে ফিরিয়ে নেওয়াকে বন্ধ করে দেয়। আর এই মহান কাজটা করা হয় কুরআনের 2:230 এর অপব‍্যাখ‍্যা করার মাধ্যমে। যেখানে বলা হয়েছে- “অতঃপর সে (স্বামী) যদি তাকে (স্ত্রীকে) তৃতীয় বার ত্বালাক দেয়, তাহলে সে (স্ত্রী) তার (স্বামীর) জন্য ততক্ষণ হালাল/ বৈধ হবে না, যতক্ষণ না সে (স্ত্রী) অন্য পুরুষ‌কে বিবাহ করে”।

আয়াহটি দেখিয়ে তারা বলে- “যেহেতু 3 টি ত্বালাক হয়ে গেছে, সেহেতু স্বামী‌র জন্য স্ত্রী আর হালাল/ বৈধ নয়। তাই এখন অন্য পুরুষের সঙ্গে কমপক্ষে 1 রাতের জন্য বিবাহ দিতেই হবে, তারপর ঐ 1 রাতের স্বামী সকালে ত্বালাক, ত্বালাক, ত্বালাক বলে স্ত্রীকে ত্বালাক দেবে, তারপর ঐ স্ত্রী তার পুরাতন স্বামীর কাছে ফিরে যেতে পারবে”। অথচ এটা 2:230 এর প্রসঙ্গ‌ই নয়, পুরোপুরি অপব‍্যাখ‍্যা। ঐ আয়াহ কি বলছে, তা আমি বহু আগে দেখিয়েছি।

এখানেই শেষ নয়, আরও আছে। শুনুন, ঐ “হারামখোর গোছের” আলেমগণ পরবর্তীতে 1 রাতের জন্য নিজেরাই 3 ত্বালাক প্রাপ্তা স্ত্রীকে বিবাহ করতে শুরু করে। সুতরাং ঐ ধরণের আলেমদের‌কে ‛হারামখোর’ বলায় আমার মনে আমার বুদ্ধিমত্তা সম্পন্ন ও বুদ্ধিজীবী পাঠকগণ রাগ করবেন না। ইচ্ছা করছে আরও গালাগালি ও খিস্তি করি, কিন্তু যেহেতু এটা ব‌ই, সেহেতু ‛অতদূর’ গেলাম না।

ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য উমার (রা) এর গুনাহ হয়েছে??

না, হয় নি। খলিফা শুধু শাসক নয়, এর সঙ্গে সঙ্গে তিনি বিচারক‌‌ও। তিনি হয়ত কোনও পরিস্থিতি বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। বলা হয়েছে- “কোন‌ও বিচারক ইজতিহাদে সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছলে, তার জন্য আছে 2 টি পুরষ্কার। আর বিচারক ইজতিহাদে ভুল করে, তার জন্য রয়েছে 1 টি পুরষ্কার” (বুখারী, হাদীশ 7352)। তাই উমার (রা) এর গুনাহ হয় নি।

এছাড়াও উমার (রা) যে সিদ্ধান্ত দিয়েছিলেন, প্রশাসনিক সুবিধার্থে গ্ৰহণ করা সিদ্ধান্ত, তা ধর্মীয় নীতিমালা বদলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নয়। তা ছাড়াও তার শেষ জীবনে এই সিদ্ধান্তের জন্য তিনি অনুতপ্ত হয়ে বলেছিলেন- “আমার দ্বারা খুব বড় ভুল হয়েছে” (ইগাসাতুল লাহফান, খণ্ড 1, পৃষ্ঠা 276, ইবনু কাইয়ুম জাওজিয়া)।

উমার (রা), নকি (নাবী), আমরা কাকে মানব??

উমার (রা) নিজেই বলেছেন- “আমার দ্বারা খুব বড় ভুল হয়ে গেছে”। সুতরাং এখানে তার ভুল সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়ার কোনও প্রশ্ন‌ই নেই। এখানে কুরআনের 4:59 প্রয়োগ করে নাবী (সা) এল অনুসরণ করতে হবে, বলা হয়েছে- “যদি তোমাদের মধ্যে কোনও বিষয় নিয়ে মতভেদ তৈরি হয়, তাহলে ফিরে আসবে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের দিকে”।

খুল‌আ ত্বালাক ও তার পদ্ধতি।

আরবি ভাষায় ‛খুল‌আ’ শব্দের অর্থ হল- খুলে ফেলা। এর মানে, বাংলা ‛খোলা’ শব্দটি আরবি শব্দ। আসল বিষয়টি হল যে, কুরআনে স্বামী ও স্ত্রীকে একে অপরের পোষাক বলা হয়েছে। বলা হয়েছে- “তোমরা (স্বামীরা) স্ত্রীদের পোষাক, তারা (স্ত্রীরা) তোমাদের পোষাক” (কুরআন 2:187)। তাই এখানে ‛খুল‌আ’ বলতে, পোষাক খুলে ফেলা বোঝান হয়েছে। কুরআনের 20:12 তে ভিন্ন প্রসঙ্গে খুল‌আ শব্দের ব‍্যবহার হয়েছে। চাইলে তা গিয়ে একবার দেখে আসুন।

কুরআনে বলা হয়েছে- “যদি তারা দুজনে (স্বামী ও স্ত্রী) ভয় করে যে, তারা বিবাহের ক্ষেত্রে আল্লাহর নির্ধারিত সীমারেখা রক্ষা করতে পারবে না, তাহলে এর (মোহরের) বিনিময়ে সে (স্ত্রী তৎক্ষণাৎ) নিষ্কৃতি চাইলে তাতে কোনও পাপ নেই” (2:229)। মানে কি?? মানে- স্ত্রী স্বামীর থেকে বিবাহের থেকে সময় যে মোহর পেয়েছিল, তা পুরোটা বা আংশিক স্বামীকে ফিরত দেওয়ার মাধ্যমে স্বামীর থেকে ‛খুল‌আ’ লাভ করতে পারবে।

পদ্ধতি কেমন?? সব বলব, প্রথমে হাদীশ দিই, পরিষ্কার হবে- “ইবনু আব্বাস (রা) হতে বর্ণিত। সাবিত ইবনু কায়স এর স্ত্রী নাবী (সা) এর কাছে এসে বলল : হে আল্লাহর রাসূল, চরিত্রগত বা দ্বীনী বিষয়ে সাবিত ইবনু কায়সের উপর আমি দোষারোপ করছি না। তবে আমি ইসলামের ভিতরে থেকে ইসলাম বহির্ভূত আচরণ করা পছন্দ করছি না। রাসূল (সা) বললেন : তুমি কি মোহর হিসাবে পাওয়া তার বাগানটি ফিরিয়ে দেবে?? সে বলল : হ্যাঁ। রাসূল (সা) বললেন : সাবিত, তুমি তোমার বাগানটি গ্রহণ কর, মহিলাকে এক তালাক দিয়ে দাও (বুখারী, হাদীশ 5273)।

এছাড়াও ইবনু মাজাহ এর 2056 তে বাড়তি রয়েছে যে, সাবিত ইবনু কায়স (রা) দেখতে কুৎসিত ছিলেন (যেমন, আমি দেখতে কুৎসিত)। একারণে তার স্ত্রী তার থেকে খুল‌আ ত্বালাক দাবি করেন। বাড়তি এও রয়েছে যে, “নাবী (সা) সাবিত ইবনু কায়স (রা) শুধু মোহর হিসাবে যে বাগানটা দিয়েছ, সেটাই ফেরত নেবে। অন‍্যান‍্য যত গিফ্ট দিয়েছ, সেই সব ফেরত চেও না”।

প্রক্রিয়া কেমন?? স্বামী স্ত্রীকে বলবে- “আমি তোমাকে খুল‌আ ত্বালাক দিলাম”। ব‍্যাস বিচ্ছেদ। আর এর ইদ্দত সাধারণ ত্বালাকের মতো 3 মাস নয়, মাত্র 1 মাস (ইবনু মাজাহ, হাদীশ 2058)। মানে, মাত্র 1 মাস পর‌ই স্ত্রী অন্য কাউকে বিবাহ করতে পারবে। এতে লাভ কি?? অনেক লাভ- ১) সাধারণ ত্বালাক ঘটাতে 10 টি শর্ত, ২) প্রক্রিয়া অনেক ধীরগতির, ৩) 3 মাস সময় লাগে, ৪) স্ত্রীর অন্য কাউকে বিবাহ করতে 3 মাস অপেক্ষা করতে হবে না।

ক্ষতি আছে?? আছে। কি?? হয়ত গোটা মোহর ফেরত দিতে হবে, নয়ত মোহরের কিছু অংশ (যদি স্বামী মোহর ছাড়তে চায়)। হ‍্যাঁ, স্বামী যদি স্ত্রীকে সাধারণ গিফ্ট দিয়ে থাকে, সেগুলো নিতে নিষেধ করা হয়েছে। একটা প্রশ্ন হবে- এখানে অভিভাবক, সাক্ষী লাগবে না?? অবশ্যই 1 জন অভিভাবক, 2 জন সাক্ষী লাগবে (কুরআন, 65:2)। প্রশ্ন কুরআনের 65:2 তো সাক্ষী‌র দলিল, অভিভাবকের দলিল কোথায়?? ইবনু মাজাহ এর 2057 দেখুন। হ‍্যাঁ, কিছু মুহাদ্দিস হাদীশটিকে দ্বাইফ বলেছেন। যেমন আলবানী ও আলী যাঈ (রহি)। কিন্তু আরনাউত (রহি) হাসান লিগাইরিহী বলেছেন। তবে বুখারী এর 5273 যথেষ্ট, যেখানে নাবী (সা) উক্ত খুল‌আ ত্বালাকের অভিভাবকত্ব করেছেন।

ধরুন, স্ত্রী স্বামী‌র থেকে খুল‌আ ত্বালাক নেওয়ার স্বামীর কাছে ফিরে আসতে পারবে?? পারবে। খুল‌আ ত্বালাকের ইদ্দত 1 মাস, মানে এই 1 মাসের মধ্যে ফিরে এলে পুরাতন বিবাহ বহাল থাকবে। কিন্তু 1 মাসের বেশি হলে কি হবে?? নতুন করে বিবাহ ও মোহর ধার্য্য করতে হবে। যাইহোক, সুন্দর একটি প্রশ্ন- সাধারণ ত্বালাক স্বামী দিতে পারে, খুল‌আ ত্বালাক স্ত্রী নিতে পারে, স্ত্রী কি ত্বালাক দিতে পারে না?? নাকি ত্বালাক দেওয়ার অধিকার স্ত্রীর নেই?? আছে, পরের অংশে নজর দিন।

নারীর ত্বালাক দেওয়ার অধিকার।

এই অধিকার নারীর আছে?? আছে। কোনও দিন শুনিনি তো! কারণ, আপনি আলেমদের থেকে শুনে ও পড়ে ‛নকল ইসলাম’ শিখেছেন, এজন্য শোনেন নি। তবে আজ শুনবেন, পড়বেন। হাদীশ দেবেন?? শুধু হাদীশ কেন, এর সমর্থনে আয়াত‌ও দেখাব। মনোযোগ দিন, পূর্ব‌ধারণা বাদ দিন। দলিল দেখে চুপ থাকবেন, আলেমদের‌কে গিয়ে জিজ্ঞাসা করবেন- “এগুলো এতদিন গোপন রেখেছিলেন কেন”??

এমন হাদীশ আছে?? আছে। যদি আপনি আমার স্মার্ট তাফসীর পড়তেন, এগুলো আগেই জেনে যেতেন। আছে, সত্যিই আপনার তাফসীরে আছে?? আছে। কোথায়?? মানে, কোন সূরাহ, আয়াত নং কত?? কুরআনের 33:28 এ। সুতরাং এখন আর লিখছি না, আমার তাফসীর থেকে কপি করে এখানে পেষ্ট করে দিই। তবে প্রথমে আয়াহটি দেখুন- “হে সম্মানিত নাবী, আপনার স্ত্রীদের বলুন- “যদি তোমরা চাও : ইহজীবন ও সেই মুতাবিক চাকচিক্য‌তা, তাহলে আমি তোমাদের‌কে রাখার জন্য অপারগ, সৌজন্য‌তা রেখে/ মর্যাদা‌পূর্ণ ভাবে তোমাদের‌কে ছেড়ে দিতে বাধ্য”।

 এখানে ‛বাধ্য’ মানে কি?? বাধ্য মানে, বাধ্য। বুঝিয়ে বলি, যদি কোনও বিবাহিত মুসলিম নারী যদি এতটুকু বলে- “আমি তোমার সঙ্গে থাকব না/ সংসার করব না”। তাহলেই ডিভোর্স। অর্থাৎ পুরুষ যদি ত্বালাক দিতে চায়, তার প্রসেস খুবই কঠিন ও লম্বা। কিন্তু নারী যদি স্বামী‌র সঙ্গে থাকতে/ সংসার করতে না চায়, তাহলেই ডিভোর্স। আর পুরুষ কী ভাবে ত্বালাক দেবে, তা রয়েছে 65:1 এ।

দলিল! দেব, এবার একটা ঘটনা শোনাই- নাবী (সা) এর যুগে বারীরাহ (রা) নামের একজন নারী ছিল। তার স্বামী ছিল- মুগীশ (রা)। তারা দুজনেই দাস ছিলেন, তারা দাসদাসী থাকা অবস্থাতেই তাদের বিবাহ হয় (কুরআন, 24:32)। কিন্তু আইশাহ (রা) বারীরাহ (রা) কে তার মালিকের থেকে কিনে মুক্ত করে দেন। মুক্ত হ‌ওয়ার সঙ্গে‌ই বারীরাহ (রা) তার স্বামীর সঙ্গে থাকা বা না থাকার স্বাধীনতা পান (দাসী অবস্থায় এই স্বাধীনতা থাকে না)। স্বাধীনতা পেয়েই বারীরাহ (রা) তার স্বামী মুগীশ (রা) এর সঙ্গে থাকতে অপছন্দ করলেন। এতেই ডিভোর্স/ বিচ্ছেদ হয়ে গেল (বুখারী, হাদীশ 5281-5283)।

দলিল হিসাবে এতটুকু যথেষ্ট। তবে আর খানিকটা উল্লেখ করি। বারীরাহ (রা) মুগীশ (রা) কে ডিভোর্স দেয়। মুগীশ (রা) এর মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে। মুগীশ (রা) বারীরাহ (রা) কে ছাড়তে নারাজ। মাদীনাহ‌র অলিগলি‌তবে মুগীশ (রা) বারীরাহ (রা) এর পিছনে পিছনে ঘুরছে ও কাঁদছে। তাঁর ছোখের পানিতে তাঁর দাড়ি ভিজে গেছে। দাড়ি বেয়ে বেয়ে পানি পড়ছে। ঘটনাটা দেখে নাবী (সা) এর খুব মায়া হল। তখন নাবী বারীরাহ (রা) কে ডেকে বললেন- “তুমি মুগীস (রা) এর সঙ্গে সংসার করতে পারতে তো”?? তখন বারীরাহ (রা) বললেন- “এটা কি আপনার আদেশ?? তা হলে তা মানতে আমি বাধ্য”। নাবী (সা) বললেন- “না, তা শুধু সুপারিশ”। বারীরাহ (রা) বললেন- “আমার কাছে মুগীশ (রা) অপ্রয়োজনীয়”।

এখানে শিক্ষনীয় বিষয়- একজন মুসলিম নারীর থেকে ডিভোর্স দেওয়ার অধিকার কোনও ভাবে কেড়ে নেওয়া যাবে না। নাবী (সা) নিজেও মুসলিম নারীর ডিভোর্স দেওয়ার অধিকারের মাঝখানে আসেন নি। কিন্তু আমরা এই অধিকার নারীর থেকে কেড়ে নিয়েছি…। অথচ নাবী (সা) বলেছেন- “হে আল্লাহ, আপনি সাক্ষী থাকুন : আমি আমার উম্মাহকে সতর্ক করেছি, কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছি যে, তারা ইয়াতীম/ অসহায় ও নারীদের অধিকার রক্ষায় সচেষ্ট ও সচেতন থাকবে” (নাসাঈ কুবরা, হাদীশ 9105)। হাদীশটি আরও রয়েছে ইবনু মাজাহ এর 3678 এ, মুসনাদ আহমাদ এর 9666 তে, ইবনু হিব্বান এর 5565 তে, সহীহ জামে এর 2447 এও।

দাঁড়ান, আরও কিছু প্রমাণ হাজির করি। উমাইমাহ বিনতু শারহীল (রা) নামক নারীর সঙ্গে নাবী (সা) এর বিবাহ হয়েছিল। কিন্তু বাসরে নাবী (সা) কে উমাইমাহ (রা) বলেন : আপনার থেকে আমি আল্লাহর আশ্রয় চাই। শুধু এতটুকু কথাই ডিভোর্স বলে গণ‍্য করা হয়। এর উত্তরে নাবী (সা) বলেন : ঠিক আছে, তুমি তোমার পরিবারের কাছে চলে যাও (বুখারী, হাদীশ 5254)। অবশ্য নাবী (সা) তাকে কিছু উপহার‌ দিয়ে পাঠিয়েছিলেন (বুখারী, হাদীশ 5256-5257)। যদিও পরে ঐ নারী নিজের সিদ্ধান্তের জন্য আফসোস করেছিলেন এভাবে : “হায়, আমি নাবী (সা) এর স্ত্রী হ‌ওয়ার মর্যাদা থেকে আমি চিরদিনের জন্য বঞ্চিতা হলাম” (বুখারী, হাদীশ 5637)।

এছাড়াও নাবী (সা) এর বাড়িতে থাকা স্ত্রীগণ‌ও নাবী (সা) এর সঙ্গে থাকা না থাকার বিষয়ে স্বাধীন ছিলেন। সুস্পষ্ট ভাবে আইশাহ (রা) থেকে বর্ণিত হয়েছে- “আমাদের‌কে স্বাধীনতা প্রদান করা হয়েছিল যে, আমরা নাবী (সা) এর সঙ্গে থাকব, নাকি থাকব না। আমরা নাবী (সা) কে বেছে নিয়েছি” (তিরমিযী, হাদীশ 1179)। মানে, কোনও স্ত্রী যদি এটা বলে- “আমি তোমার সঙ্গে থাকব না”। তাহলেই তা ডিভোর্স বলে গণ‍্য হবে। এখানে কেউ এসে বলতে পারেন- “কুরআনের 33:28 এর এমন ব‍্যাখ‍্যা আপনার আগে কেউ দেয় নি”। দিয়েছে, আপনি পড়েন নি। বুখারীর 5262 দেখে আসুন।

হিন্দু ধর্মে নারীর বিবাহ বিচ্ছেদের অধিকার সম্পর্কে বলা হয়েছে- “নারীকে অবিবাহিতা অবস্থায় পিতা রক্ষা করবে, বিবাহ পরবর্তী সময়ে স্বামী, বৃদ্ধাবস্থায় পুত্র। নারী কখনও স্বাধীন হতে পারে না” (মনু সংহিতা, 9:3)। বক্তব্য‌টি রয়েছে মনু সংহিতা‌র 4:148 এ‌ও। যেখানে বলা হচ্ছে যে, “বাল্যকালে নারী পিতার অধীনে থাকবে, বিবাহিত অবস্থায় স্বামীর অধীনে, আর স্বামীর মৃত্যু হলে পুত্রদের অধীনে। নারী স্বাধীন হ‌ওয়ার যোগ্য নয়”। 

তবে শুধু নারীর নয়, হিন্দু ধর্ম মুতাবিক- পুরুষদের‌ও এই অধিকার নেই। এজন্য তৎকালীন ভারত সরকার‌কে 1955 তে “হিন্দু ম‍্যারেজ অ্যাক্ট” পাশ করতে হয়, যেন 2 জন মানুষ ও 2 টি পরিবার বিবাহ বিচ্ছেদ করতে পারে। তারপর‌ হিন্দু নারী ও পুরুষরা বিবাহ বিচ্ছেদের অধিকার পায়।

তিন ধরণের ত্বালাকের মধ্যে পার্থক্য।

শেষে ছোট একটি প্রশ্ন- “স্বামীর দেওয়া ত্বালাক, স্বামীর থেকে নেওয়া ত্বালাক, স্ত্রীর দেওয়া ত্বালাকের মধ্যে পার্থক্য কোথায়?? অনেক পার্থক্য। স্বামী ত্বালাক দিলে স্ত্রী মোহর পাবে, স্বামীর দেওয়া অন‍্যান‍্য গিফ্ট‌ও স্ত্রী পাবে (কুরআন, 4:29-21)। স্বামীর থেকে খুল‌আ ত্বালাক নিলে স্ত্রীর পাওয়া মোহর স্বামীকে ফেরত দিতে হবে। তবে স্বামীর দেওয়া অন‍্যান‍্য গিফ্ট (যেমন গহনা) স্ত্রীর‌ই থাকবে। স্ত্রী ত্বালাক দিলে স্বামীর থেকে পাওয়া মোহর ও অন‍্যান‍্য সমস্ত গিফ্ট ফিরত দিতে হবে। যদি স্বামী নিজ হতে কোনও গিফ্ট ছেড়ে দেয়, তা ভিন্ন।

ত্বালাক এ বিদাহ।

উমার (রা) একত্রে বলা 3 টি ত্বালাকে চূড়ান্ত বিচ্ছেদ বলে ঘোষণা ও কার্যকর করেছিলেন। আলেমগণ বলে থাকেন যে, “এই ত্বালাক পদ্ধতি বিদ‌আত”। এটাকে “ত্বালাক এ বিদাহ” বলা হয়। আর এই সম্পর্কে নাবী (সা) যা বলেছেন, তা শুনুন- “সবচেয়ে নিকৃষ্ট বিষয় হল, ধর্মে নতুনভাবে উদ্ভাবিত পন্থাসমূহ” (বুখারী, হাদীশ 7227)। আরও বলেছেন- “ধর্মে নতুন উদ্ভাবন বিদ‌আত, আর প্রতিটা বিদ‌আত ভ্রষ্টতা”(মুসলিম 867 এর 1)। বিদ‌আত কারীদের আমল নষ্ট হয়ে যাবে (কুরআন, 18:103-104)। বিদ‌আত কারীদের ইবাদত কবুল হবে না (বুখারী, হাদীশ 3172)। বিদ‌আত কারী হাউজে কাওসারের পানি পাবে না (বুখারী, হাদীশ 3349)।

অবাক করা বিষয় হল- তবুও বহু সম্মানিত আলেমগণ ‛ত্বালাক এ বিদাহ’ বর্জন করতে পারছেন না, উপরন্তু পালন করছেন, আজও করে যাচ্ছেন। এ বিষয়ে আল্লাহ বলেছেন- “সত‍্যের (আল্লাহ ও রাসূলের) পর যা আছে, তা শুধুই ভ্রষ্টতা” (কুরআন, 10:32)। এবার একটা মজার ঘটনা বলি- কিছুদিন আগে আমার কাছে একটা একত্রে 3 ত্বালাক ঘটার ঘটনা আসে। শুনুন-

তারা বলে- “রাগের মাথায় মোবাইলে 3 বার ত্বালাক বলে ফেলেছে, মন থেকে বলে নি। এজন্য আমাদের ওখানের ইমাম বলেছে হালালা করতে হবে। তারপর একজন আলেমের কাছে যাই, সেও হালালা করতে বলেছে। তখন একজন বলল যে, তোমাদের বাঁচার উপায় হল হোসেন কুরানী। তার কাছে যাও। ঐ জন্য এলাম, একটা উপায় বলুন”।

তাদেরকে আমি কুরআন খুলে, আয়াত ধরে ধরে, হাদীশ খুলে সমস্ত কিছু বুঝিয়ে বললাম। বললাম- “রাগের মাথায় ত্বালাক হয় না, এই দেখুন হাদীশ এবং একত্রে 3 বার ত্বালাক বললেও ত্বালাক হবে, এই দেখুন হাদীশ”। তারপর আমি ঐ স্বামী স্ত্রী‌র মুখে যে খুশির ভাব দেখলাম, তা বলে বোঝাতে পারব না। সব দেখে তারা বলল- “যাক, তাহলে ত্বালাক হয় নি, তাই তো”??

তারপর ঐ স্বামী স্ত্রী বলছে- “আমরা চিন্তায় এই 10 দিন ঘুমাই নি”। এখন বলুন- আমি না থাকলে কি হোত। আমাদের সম্মানিত আলেমরা ঐ স্বামী স্ত্রী‌র কি পরিণতি করত! তবে, খুশির কথা হল- “মুসলিম সমাজ এখন আর আলেমদের ফতোয়া মানতে চাইছে না”। দ্বিতীয় খুশির বিষয় হল- ঐ স্বামী খুশি হয়ে আমাকে 7 হাজার টাকা উপহার দেন। যা পরে আমার ব‌ই কিনতে কাজে লাগে।

5/5 - (21 votes)
শেয়ার করুন:

“বিবাহ, ত্বালাক ও হালালা।”-এ 1-টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন