সুলাইমান (আ) এর মৃত্যু, জিনরা গায়েব সম্পর্কে বেখবর।
34:14 নং আয়াহ : অতঃপর যখন আমরা সুলাইমানের মৃত্যুর সিদ্ধান্ত নিলাম। তাদের (জিনদের) কে কেউ জানাল না তার মৃত্যু সম্পর্কে। তবে জানিয়ে দিল মাটিতে থাকা জীব (১), যা তার লাঠিতে কামড় (২) দিয়েছিল। অতঃপর তিনি পড়ে গেলেন, তখন জিনরা পরিষ্কার ভাবে জানতে পারল যে, যদি তারা জানত গায়েব/ অদৃশ্যের [72:26-27] খবর, তাহলে তারা অপমান জনক শাস্তি ভোগ করত না।
১) এখানে আরবি শব্দ “দাব্বাতুল আরদ্ব”। যার সহজ অর্থ- মাটিতে থাকা জীব। যেহেতু আল্লাহ নাম বলেন নি যে, ঐ জীবের নাম কী ছিল। তাই শুধু অনুমান করে লাভ নেই। কেউ কেউ বলেন- “ তা উইপোকা ছিল”। এও বলেন যে, সুলাইমান (আ) এভাবে লাঠির উপর ভর দিয়ে 1 বছর দাঁড়িয়ে ছিলেন। এসব শুধু হাস্যকর ও অযৌক্তিক দাবি। কেননা, তিনি ছিলেন শাসক। শাসক এভাবে 1 বছর থাকবে, আর কেউ তার কাছে এল না! তা কি হতে পারে! ভাবাও হাস্যকর।
২) সুলাইমান (আ) এর মৃত্যু হয়েছিল লাঠিতে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় তার। আসলে জিনরা বিল্ডিং নির্মাণ করছিল, সুলাইমান (আ) লাঠিতে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে তা দেখছিল। এই অবস্থায় তার মৃত্যু হয়ে যায়। কিন্তু জিনরা তা জানতে পারে নি। কেননা, তাদের গায়েবের জ্ঞান ছিল না। থাকলে তারা তা জেনে যেত। এটা বোঝাতেই উক্ত ঘটনা আল্লাহ বর্ণনা করেছেন।
সাবা’র রানীর সম্রাজ্য যেভাবে ধ্বংস হয়েছিল।
34:15 নং আয়াহ : অবশ্যই ছিল সাবা (১) জাতির জন্য তাদের মধ্যেই ছিল একটি নিদর্শন, দুই পাশের বাগান- (সম্ভবত Gulf of Suez এর) ডানে ও বাঁমে। (বলা হয়েছিল) “তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের দেওয়া রিযিক হিসাবে তা হতে খাও এবং তার কৃতজ্ঞ হও। এই শহর তাইয়িবা (পবিত্র/ উত্তম)। আর (তোমাদের) রব (প্রভু/ প্রতিপালক) গাফূর/ ক্ষমাশীল”।
১) সাবা কি?? এই সম্পর্কে হাদীশ রয়েছে, চাইলে গিয়ে দেখে আসতে পারেন তিরমিযীর 3222 নং হাদীশ। তবে সাবার রানী ও সাবা জাতি সম্পর্কে জানতে 27:16-44 আয়াত সমূহ দেখুন। সাবা’র রানী সম্পর্কে বাইবলেও উল্লেখ রয়েছে 1 Kings এর 10:1-13 ও 2 Chronicles 9:2-12 তে।
34:16 নং আয়াহ : কিন্তু তারা (আল্লাহর নির্দেশনা হতে) মুখ ফিরিয়ে নিল। তাই তাদের উপর পাঠালাম বাঁধ গুলো ভেঙে যাওয়া বন্যা (১)। আমরা তাদের বাগান দুটিকে বদল করে দিলাম এমন বাগানে, যাতে জন্মাল কাঁটাযুক্ত, ঝাউগাছ ও কিছু কুলগাছ।
১) সম্ভবত তারা লোহিত সাগরের Gulf of Suez এ বহু বাঁধ তৈরি করে প্রয়োজন মুতাবিক এর পানিকে ব্যবহার যোগ্য করে চাষাবাদ করত। কিন্তু বিরাট বন্যায় বাঁধা গুলো ভেঙে যায়। ফলস্বরূপ পানি না পাওয়ার জন্য তা ধীরে ধীরে মরুভূমি স্বরূপ হয়ে যায়। এবং মরুভূমিতে যে ধরণের গাছপালা হয়, সেই ধরণের গাছপালা সৃষ্টি হতে লাগল।
34:17 নং আয়াহ : ওটাই ছিল তাদের জাযা/ প্রতিদান। একারণে যে, তারা সত্যকে অস্বীকার করেছিল। আর আমরা এমন জাযা/ প্রতিফল দিই তাদেরকে, যারা কাফির/ অকৃতজ্ঞ।
বাইতুল মুকাদ্দাস/ মাসজিদে আকস্বা’য় হজ হোত।
34:18 নং আয়াহ : আর তাদের এবং আমরা বরকত/ কল্যাণ দিয়েছিলাম যে সম্রাজ্যে (সিরিয়া, যার রাজধানী ছিল ফিলিস্তিন), তার মধ্যে বহু দৃশ্যমান সভ্যতা/ জনপদ স্থাপন করেছিলাম এবং তাতে নির্ধারিত ভ্রমণ দূরত্ব বজায় রেখেছিলাম। (বলেছিলাম) নিরাপদে যাত্রা কর (১) রাত গুলোতে বা দিন গুলোয়।
১) যাত্রা বলতে! কোথায় যাত্রা, কোন যাত্রা! ফিলিস্তিনের বাইতুল মুকাদ্দাসের কথা বলা হচ্ছে। যা ছিল বহু জনপদের কিবলা ও তীর্থস্থান। যেমন, এখন মাসজিদে হারাম কিবলা ও তীর্থস্থান। এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে 2:143-144 আয়াতে।
মাক্কাহতে ‛হজ’ করতে যাওয়ার অনুরোধ।
34:19 নং আয়াহ : পরবর্তীতে তারা বলল- “হে আমাদের রব/ প্রভু, আমাদের তীর্থযাত্রার দূরত্ব বাড়িয়ে দিন” (১)। এভাবে তারা নিজেদের উপর জুলুম/ অত্যাচার (২) করল, অতঃপর আমরা তাদের বিষয়কে স্থান দিলাম হাদীশ সমূহে। আর আমরা তাদেরকে ছিন্নভিন্ন করলাম, সবাইকে মারাত্মক ছিন্নভিন্ন করলাম। নিশ্চয়ই ঐ বর্ণনার মধ্যে রয়েছে নিদর্শন সমূহ, প্রত্যেক সাব্বির/ অতি ধৈয্যশীল ও সাকূর/ কৃতজ্ঞের জন্য।
১) মানে, তাদেরকে মাক্কাহতে আসতে না হয়, আল্লাহ সেই ব্যবস্থা করেছিলেন। কিন্তু তারা চাইছিল- “মাক্কাহতে হজ করতে যাব”। এভাবে আল্লাহর সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে গিয়েছিল।
২) এটা আরবি বাক রীতি, প্রবাদ। যার অর্থ- তারা এমন কাজ করল, যাতে তাদের উপর শাস্তি অনিবার্য হয়ে যায়।
মাঝে মধ্যে ইবলীশ ‛নিজ ধারণাকে’ সত্য মনে করে।
34:20 নং আয়াহ : আর অবশ্যই তাদের উপর ইবলীশ তার ধারণাকে সত্য হিসাবে পেল [17:62, 38:82-83]। অতঃপর মূমীনদের একটা ফিরকা/ দল ছাড়া তারা তার অনুসরণ করল।
মূমীনদের উপর ইবলীশের কোনও প্রভাব থাকে না।
34:21 নং আয়াহ : কেননা, তাদের (মূমীনদের) উপর তার কোনও সুলত্বান (প্রভাব/ ক্ষমতা) ছিল না [15:42, 17:65]। যেন আমরা জানি- তাদের মধ্যে কে আখিরাত/ পরবর্তী জীবন স্বীকার করে, আর সেই সম্পর্কে শাক্ক/ সন্দেহের মধ্যে রয়েছে। আর আপনার রব/ প্রভু সমস্ত কিছুর হাফিজ্ব/ ধারণকারী
মিথ্যা ঈশ্বর সম্পর্কে অনুসারীদের দাবি ও দাবি খণ্ডন।
34:22 নং আয়াহ : বলুন- “তোমরা তাদেরকে [35:14] ডাক, আল্লাহকে বাদ দিয়ে যাদেরকে তোমরা ‛ঈশ্বর হিসাবে কল্পনা’ করে নিয়েছ [7:194, 46:5]। তারা মহাবিশ্ব ও পৃথিবীর একটি যাররাহ (প্রোটন/ নিউট্রন সাইজের) কণারও মালিক [7:191-192] নয়। আর না উভয়ে (মহাবিশ্ব ও পৃথিবীতে) যা কিছু আছে, তাতে তাদের কোনও অংশ আছে [35:40, 46:4]। আর না তারা তাঁর সাহায্যকারী [18:51]।
অবশ্যই বিচার দিবসে শাফায়াত গ্ৰহণ করা হবে।
34:23 নং আয়াহ : তাঁর কাছে কোনও শাফায়াত কাজে আসবে না [10:18, 30:13]। তবে, যার জন্য তিনি অনুমতি দেবেন, তার ব্যাপারটা ভিন্ন” [20:109, 21:28]। এমনকি যখন তাদের মস্তিষ্ক থেকে ভয় দূর হয়ে যাবে, তখন তারা (শাফায়াতকারীদের) বলবে- “কি বললেন তোমাদের প্রতিপালক”। তারা বলবে- “যা সত্য। আর তিনি হলেন সর্বোচ্চ ও অতুলনীয় শ্রেষ্ঠ”।
# অনেকে বলেন- নাবী (সা) শাফায়াত করতে পারবেন না (2:48, 2:123)। মনে রাখা দরকার যে, 2:48 ও 2:123 এর বক্তব্য অসম্পূর্ণ। 34:23 আয়াহ টা তার সঙ্গে জুড়লে তবে বক্তব্যটা সম্পূর্ণ হয়। জেনে রাখুন- শুধু নাবী (সা) নয়, সাধারণ মূমীনও সুপারিশ করবে (43:86)। এছাড়াও দেখুন 19:87 আয়াহ।
এরোপ্লেনে চাকরির ভবিষ্যৎ বাণী।
34:24 নং আয়াহ : বলুন- “কে তোমাদেরকে রিযিক দেয় সামাওয়াত/ বায়ুমণ্ডলের স্তর (১) গুলো ও আরদ্ব/ পৃথিবী থেকে”?? বলুন- “আল্লাহ”। (এরপর বলুন) “এখন নিশ্চিতই আমরা সঠিক পথে আছি বা তোমরা। কিংবা হতে পারে উভয়ই সুস্পষ্ট বিভ্রান্ততে”।
১) এর কাছাকাছি কিছু বক্তব্য রয়েছে, যেখানে ‛সামায়া’ শব্দের ব্যবহার হয়েছে। যেমন 10:31 ও 27:64 আয়াত সমূহে। তার অর্থ পুরোপুরি ভিন্ন।
# কিন্তু প্রশ্ন হবে- বায়ুমণ্ডলের স্তর গুলো থেকে রিযিক আসে, কিন্তু কিভাবে?? এরোপ্লেনে মানুষ চাকরি করে না?? করে তো। আর এরোপ্লেন বায়ুমণ্ডলের স্তর গুলোতেই ওড়ে, এর বাইরে নয়। এছাড়াও একবার 51:22 দেখে আসুন।
কাউকে অন্যের কর্ম সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে না।
34:25 নং আয়াহ : বলুন- “ না তোমাদেরকে জিজ্ঞাসা করা হবে সেই অপরাধ সম্পর্কে, যা আমরা করেছি। আর আমাদেরকে জিজ্ঞাসা [2:119] করা হবে সেই সম্পর্কে, যে আমল/ কর্ম [74:38, 52:21] তোমরা করেছ/ করছ” [10:41, 53:38]।
যুক্তি ও বিজ্ঞান ছাড়া কেউ তর্ক করলে, তাকে যা বলতে হবে।
34:26 নং আয়াহ : বলুন- “আমাদের রব/ প্রভু (কোনও একদিন) আমাদেরকে একত্রিত [69:16-17] করবেন, তারপর আমাদের মধ্যে মিমাংসা [42:15, 22:68-69] করে দেবেন ন্যায়পূর্ণ ভাবে। কেননা, তিনি আল ফাত্তাহু/ মহা বিচারক ও আল আলীম/ মহাজ্ঞানী।
যুক্তি ও বিজ্ঞান না মানলে, ধর্মীয় দলিল চাইতে হবে।
34:27 নং আয়াহ : বলুন- “তোমরা যাদেরকে তাঁর সঙ্গে শরিক হিসাবে যুক্ত কর, (তারা যে ঈশ্বর, সেই দলিল) আমাকে দেখাও [6:81, 22:71]। কখনও পারবে না। বরং তিনি আল আযীয/ মহা শক্তিশালী ও আল হাকীম/ মহা বিজ্ঞানী [2:129, 2:209]।
নাবী (সা) কে ‛কদের কাদের’ জন্য পাঠান হয়েছে??
34:28 নং আয়াহ : আর আমরা আপনাকে পাঠিয়েছি মানব প্রজাতির অন্তর্ভুক্ত ‛সমস্ত ধরণ/ প্রকারের মানুষ’ এর জন্য’ [7:158, 21:107] সুসংবাদ দাতা ও সতর্ককারী হিসাবে [2:119, 7:184]। তবে অনেক মানুষই তা জানে না (১)।
১) নাবী (সা) কি প্রত্যেকটা মানুষের কাছে ইসলাম পৌঁছে দিয়েছেন?? উত্তর সহজ- প্রত্যেকটা মানুষের কাছে ইসলাম পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব নাবী (সা) এর উপর ছিল না, মানুষের কাছে ইসলাম পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব ছিল। প্রমাণ! 62:3 এ যান। এ ছাড়াও তিনি বিদায় হজের ভাষণে বলেছেন- “এখানে উপস্থিত ব্যক্তি যেন (ইসলাম) অনুপস্থিতের নিকট পৌঁছিয়ে দেয়। কারণ, অনেক (ইসলাম) প্রচারক এমন লোকের নিকট (ইসলাম) পৌঁছাবে, যারা তার চেয়ে বেশি ইসলামের সংরক্ষণকারী হবে” (বুখারী, হাদীশ 7078)।
আরও একটি সুন্দর হাদীশ-“কোনও কাঁচা ও পাকা বাড়ি এমন ছাড়বেন না, যেখানে আল্লাহ এই দীনকে প্রবেশ না করিয়ে দেবেন” (আহমাদ, হাদীশ 16957)। একটি কঠিন প্রশ্ন- “সব ঠিক আছে, কিন্তু ইসলাম সম্পর্কে না জেনে যারা মারা যাচ্ছে, তাদের কী হবে”?? তারা জান্নাতী, চিন্তা করবেন না। দলিল! 17:15, 28:59, 26:8 আয়াত গুলো দেখে নিন, নাকি আরও দলিল দেব?? এক কাজ করুন, তাহলে 20:134 দেখে নিন।
কিয়ামত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা ও জবাব।
34:29 নং আয়াহ : তারা বলে- “ (বল) এই ওয়াদা কখন পূর্ণ [43:61, 69:16-17] হবে, যদি [10:48, 21:38] হয়ে থাক [26:202-203] সত্যবাদী”??
34:30 নং আয়াহ : বলুন- “তোমাদের জন্য মিয়াদ/ নির্ধারিত সময় রয়েছে [10:19, 42:15]। যাকে তোমরা না সায়াত/ সামান্য ক্ষণ পিছিয়ে [16:61] দিতে পারবে, আর না এগিয়ে আনতে পারবে।