
হোসেন কুরানী’র উস্তাদ গোলাম আহমদ মোর্তজা (রহ)।
1938-2021 পর্যন্ত জীবন কাল। কিন্তু ইতিহাসে তিনি জীবিত রয়েছেন/ থাকবেন। একদিকে তিনি যেমন আলেম (আল্লামা) ছিলেন, তেমনই ছিলেন বক্তা। মানুষ তাকে ‛বক্তা সম্রাট’ হিসাবে চেনেন। আবার তিনি একজন ঐতিহাসিক।
তার লেখা ইতিহাস সম্পর্কিত বই গুলো ইতিহাসের গভীর সমুদ্র হতে তুলে আনা মুক্তার মতো। বিকৃত ইতিহাসের যুগে তার লেখা বই গুলো আয়নার ভূমিকা পালন করে। ভারতের তাবড় তাবড় ঐতিহাসিকগণ তার গবেষণার সামনে ছাত্রের মতো। তার ইতিহাস পরিবেশনের পদ্ধতি এতটা সুন্দর যে, তা পড়তে পড়তে শরীরের লোম দাঁড়িয়ে যাবে। পড়ার পর অবাক হতে হবে এটা ভেবে যে, আমরা স্কুলে যে ইতিহাস পড়ি, তা 1-2 শতাংশও সত্য নয় (বিশেষত ভারতের ইতিহাস)।
ভারত উপমহাদেশের ঐতিহাসিকগণ তার ছাত্রের মতো বলে কাউকে ছোট করছি না। আসলে সাধারণ ও পরিচিত ঐতিহাসিকগণ শুধুমাত্র ইংরেজিতেই ইতিহাসের মূল উপাদান গুলো পড়তে পারেন। কিন্তু গোলাম আহমদ মোর্তজা (রহ) ইংরেজিত জানতেনই, সঙ্গে আরবি, ফারসি ও উর্দুও জানতেন। আর ভারতীয় লিখিত ইতিহাসের মূল ভাষা ছিল আরবি, ফারসি ও উর্দু। কিন্তু আজকের তাবড় তাবড় ঐতিহাসিকগণ আরবি ও ফারসি জানেন না। এমনকি উর্দুও জানেন না।
সুতরাং আজকের তাবড় তাবড় ঐতিহাসিকরা গোলাম আহমদ মোর্তজা (রহ) এর হওয়ার যোগ্যতাও রাখে না। তবে বলব- গোলাম আহমদ মোর্তজা (রহ) এর সঙ্গে Quranic Universe এর পাঠকদের পরিচয় করিয়ে দেওয়া আমাদের উদ্দেশ্য নয়। তার নামটাই যথেষ্ট, তার পরিচয় দেওয়ার প্রয়োজন নেই। প্রতিটা শিক্ষিত মানুষ তাকে চেনে। তিনি পরিচয়ের মুখাপেক্ষী নন।
গোলাম আহমদ মোর্তজা (রহ) এর দীনি খিদমত।
ভারতের বিকৃত ইতিহাসের গভীর থেকে ভারতীয় মুসলিম দের সঠিক ইতিহাস ও ভারত সহ পৃথিবীতে মুসলিমদের অবদান গুলো তুলে এনেছেন। জাতির জন্য ছেড়ে গেছেন বই আকারে তার আজীবনের গবেষণা কর্ম। এর তুলনা হয় না। তিনি বলেন- “যদি আমাকে পুরষ্কার স্বরূপ গোটা পৃথিবীর ধনসম্পদ দিয়ে দেওয়া হয়, তাও সেটা কম হবে। আর যদি শাস্তি স্বরূপ হাজার বার ফাঁসি দেওয়া হয়, তাও সেটা অনেক কম হবে”।
প্রত্যাক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে বহু মাদ্রাসা সহ বহ ইসলামিক মডেল স্কুল সহ “মামূন ইন্টারন্যাশনাল স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছেন। তার স্বপ্ন ছিল- “উইমেন মেডিকেল কলেজ” প্রতিষ্ঠা করা। জমিও সংগ্রহ করেছিলেন, কিন্তু কাজটা তিনি শেষ করতে পারেন নি।
এজন্য হোসেন কুরানী মাঝে মধ্যেই বলেন- “আমার উস্তাদের অসম্পূর্ণ কাজটা (যদি সময় পাই) আমি সম্পূর্ণ করব। আর ঐ মেডিকেল কলেজের নাম দেব- “মোর্তজা (রহ) মেডিকেল কলেজ”। আল্লাহ যেন হোসেন কুরানী’র স্বপ্নটা পূরণ করেন।
হোসেন কুরানী গোলাম আহমদ মোর্তজা (রহ) দ্বারা অনুপ্রাণিত।
সালটা ছিল 1999 অথবা 2000, হোসেন কুরানী তার বড় মামা ও তার পিতার সঙ্গে হাওড়া জেলার জগৎ বল্লভ পুরের শোভা রানী মেমোরিয়াল কলেজে গোলাম আহমদ মোর্তজা (রহ) এর বক্তব্য শুনতে গিয়েছিলেন। সেই সময় হোসেন কুরানী’র বয়স ছিল মাত্রা 8-9 বছর।
সেই বক্তব্য শুনে সেই সময়েই হোসেন কুরানী’র মনে হয়েছিল- “আমিও এরকম হবো”। হোসেন কুরানী মাঝে মধ্যে সেই বক্তব্যের কথা বলেন। এখানে অবাক করা তথ্য হল- সেই গোটা বক্তব্যটা আজও হোসেন কুরানী’র অক্ষরে অক্ষরে মনে আছে!
মানুষ তার প্রেমিক/ প্রেমিকার প্রতিটা বিষয় নিঁখুত ভাবে মনে রাখে। হোসেন কুরানী গোলাম আহমদ মোর্তর্জা (রহ) এর সেই বক্তব্যেটা নিঁখুত ভাবে স্মৃতিতে ধরে রেখেছেন। এ থেকে প্রমাণ হয় যে, হোসেন কুরানী গোলাম আহমদ মোর্তর্জা (রহ) কে কতটা ভালোবাসেন!
তারপর থেকে হোসেন কুরানী গোলাম আহমদ মোর্তর্জা (রহ) এর প্রতিটা বক্তব্য শোনার চেষ্টা করতেন এবং দূর দূরন্তে ছুটে যেতাম বক্তব্য শুনতে। তার প্রতিটা বই হোসেন কুরানী সেই শিশু বয়স থেকে সংগ্রহে রেখেছেন। এটাও প্রমাণ করে যে, হোসেন কুরানী গোলাম আহমদ মোর্তর্জা (রহ) কে কতটা ভালোবাসেন!
হোসেন কুরানী ও গোলাম আহমদ মোর্তজা (রহ) এর সাক্ষাৎ।
অবাক করা ব্যাপার হল- হোসেন কুরানী’র সঙ্গে গোলাম আহমদ মোর্তর্জা (রহ) এর সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়েছে মাত্র একবার, 2010 সালে। তখন হোসেন কুরানী’র বয়স মাত্র 18-19 বছর। যদিও হোসেন কুরানী তখন নিজেও একজন লেখক। হোসেন কুরানী তার লেখা বইটা গোলাম আহমদ মোর্তর্জা (রহ) কে উপহার দেন।
তিনি দেখে খুব খুশি হন। বইটা হোসেন কুরানী’র সামনেই খানিকটা তিনি পড়েন। বিশেষ করে “বেদ পুরাণে নাবী মুহাম্মাদ (সা)” অংশটা। দেখে তিনি অবাক হন। বলেন- “এই বয়সে এত প্রতিভা! কতটা পড়াশোনা করলে তবে তা লেখা যায়, তা আমি জানি”।
হোসেন কুরানী’র প্রতিভায় গোলাম আহমদ মোর্তজা (রহ) হতবাক।
গোলাম আহমদ মোর্তর্জা (রহ) বলেন- “তুমি কুরআন জানো”?? হোসেন কুরানী বলেন- “আপনি আপনার পছন্দ মতো আয়াত তিলাওয়াত করুন, আমি আয়াত নং গুলো বলে দিতে পারবো”। এও বলেন-“আমি 8-9 বছর বয়স থেকে আপনার বক্তব্য শুনছি, আপনার লেখা বই গুলো পড়েছি, এমনকি মুখস্থ করে ফেলেছি”।
গোলাম আহমদ মোর্তর্জা (রহ) পবিত্র কুরআন থেকে তিলাওয়াত করেন- “আল্লাহু ল্লাযি খালাকাস সামাওয়াতি ওয়া মিনাল আরদ্বি মিশলাহুন্না…”। হোসেন কুরানী বলেন- “আসলে এগুলোই তো আমার পছন্দের বিষয়, এটা 65:12 আয়াহ”।
এটা শুনে গোলাম আহমদ মোর্তর্জা (রহ) হতবাক হয়ে যান। দ্বিতীয় আয়াহ তিলাওয়াত করেন- “ওয়া আকিমিস্ব স্বালাওয়াতা তারাফিন নাহার ওয়া যুলফা মিনাল লাঈল। ইন্না হাসানাতি…”। হোসেন কুরানী বলেন- “এটা 11:114 আয়াহ”। গোলাম আহমদ মোর্তর্জা (রহ) বলেন- “এটা অসাধারণ প্রতিভা। এবার তোমার কথটা আমার বিশ্বাস হয়েছে যে, সত্যিই তুমি আমার বই গুলো মুখস্থ করে ফেলেছো। আমি ভাবছিলাম যে, তুমি হয়ত বাড়িয়ে বাড়িয়ে বলছো”।
হোসেন কুরানী’কে গোলাম আহমদ মোর্তজা (রহ) এর প্রশ্ন।
তারপর বলেন- “বলতে পারবে কি যে, প্রাণী জগতের উৎপত্তি কিভাবে হয়েছে?? এ বিষয়ে কুরআন কি বলে”?? হোসেন কুরানী বলেন- “ওয়া জায়ালনা মিনাল মা, কুল্লা শাইয়ীন হাইয়ী অর্থাৎ তিনি প্রাণবন্ত সমস্ত কিছু সৃষ্টি করেছেন পানি থেকে(21:30)। এছাড়াও একথা 24:45 এও রয়েছে”।
গোলাম আহমদ মোর্তর্জা (রহ) শুধুই অবাক ও হতবাক হতে থাকেন। হোসেন কুরানী বলেন- “The Origin of Species বইয়ে ডারউইন একথাই বলেছেন এবং আধুনিক বিবর্তন তথ্য তা মেনেও নিয়েছে। তবে বিবর্তন সম্পর্কে পৃথিবীতে প্রথম বই লেখেন বিজ্ঞানী ‛আজ জাহিয’ আজ থেকে প্রায় 1200 বছর আগে”।
গোলাম আহমদ মোর্তর্জা (রহ) বলেন- “ইতিহাসেও তো তোমার ভালো দখল”। হোসেন কুরানী বলেন- “আপনার দ্বারা অনুপ্রাণিত, আর ইতিহাসে দখল থাকবে না, তা কি হয় নাকি হতে পারে”?? গোলাম আহমদ মোর্তর্জা (রহ) বলেন- শোনো বাবা, নামাজের সময় হয়ে যাচ্ছে। এবার আমাকে উঠতে হবে”।
হোসেন কুরানী’কে গোলাম আহমদ মোর্তজা (রহ) এর নসিহত।
হোসেন কুরানী বলেন- “ঠিক আছে, দুয়া করবেন। আজ আসছি”। হোসেন কুরানী চলে আসছেন। গোলাম আহমদ মোর্তর্জা (রহ) দূর থেকে ডাকলেন- “শোনো কুরানী, এই প্রতিভা যেন নষ্ট না হয়, স্মৃতি শক্তির ব্যবহার করো দীনের কাজের জন্য”। হোসেন কুরানী শুধু মাথা নেড়ে বললেন- “আপনি দুয়া করুন”।
সম্ভবত হোসেন কুরানী’র নাম ‛না’ জানার জন্য/ পবিত্র কুরআন সম্পর্কে হোসেন কুরানী’র প্রতিভায় অবাক হয়ে ইচ্ছাকৃতভাবেই তিনি এভাবে ডাকলেন। এই ছিল হোসেন কুরানী’র সঙ্গে গোলাম আহমদ মোর্তর্জা (রহ) এর শেষ সাক্ষাৎ। এরপর আর কখনও তাদের সামনাসামনি দেখা হয় নি।
গোলাম আহমদ মোর্তর্জা (রহ) এর মৃত্যুতে হোসেন কুরানী’র কান্না।
আজ গোলাম আহমদ মোর্তর্জা (রহ) মৃত। তবে যদি বেঁচে থাকতেন, হোসেন কুরানী’র ড্রিম প্রোজেক্ট ও স্মার্ট তাফসীরের কথা শুনে খুশি হতেন। কিন্তু 2021 সালে তিনি আল্লাহর আশ্রয়ে চলে গিয়েছেন। তার মৃত্যুর খবর শুনে হোসেন কুরানী শিশুদের কেঁদে ছিলেন, যেমন কেঁদেছিলেন তার মায়ের মৃত্যুতে।
হোসেন কুরানী’কে ‛কুরানী’ নাম দিয়েছিলেন তিনিই।
আসলে গোলাম আহমদ মোর্তর্জা (রহ) হোসেন কুরানী’কে একবার হোসেন কুরানী’র নাম না জানার জন্য/ কুরআন সম্পর্কে হোসেন কুরানী’র জ্ঞানে মুগ্ধ হয়ে হোসেন কুরানী’কে “শোনো কুরানী” বলে ডেকে ছিলেন। ঐ নামটা হোসেন কুরানী’র খুব পছন্দ হয়, সেই থেকে হোসেন কুরানী তার নামের সঙ্গে ‛কুরানী’ শব্দটা ব্যবহার করছেন।
অবশ্য আজ হোসেন কুরানী’র পরিচিতি শুধু পশ্চিমবঙ্গে সীমাবদ্ধ নয়। আর সবাই তাকে ‛হোসেন কুরানী’ নামেই চেনে। এখন তার আসল নাম তার এলাকার মানুষরাও ভুলে গেছেন। এখন সবার কাছে তিনি ‛হোসেন কুরানী’। আজ তিনি কুরআনের এমন জ্ঞান অর্জন করেছেন, যা একদিন গোটা বিশ্বে তাকে বিখ্যাত করে তুলবে। গোলাম আহমদ মোর্তর্জা (রহ) কি নাম দিয়ে গেলেন!