বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম।
অর্থ- আল্লাহর নাম নিয়ে পড়া শুরু করছি, যিনি সীমাহীন দয়ালু এবং সীমাহীন করুণাময়।
নাযিল : মাক্কাহ, আয়াত : 53 টি।
বিচ্ছিন্ন অক্ষর গুলো আসলে কি??
42:1 নং আয়াহ : হা মীম।
42:2 নং আয়াহ : আইন সীন কাফ।
ওহী আসা/ ওহী পাওয়া নতুন বিষয় নয়।
42:3 নং আয়াহ : এভাবেই আপনার প্রতি ওহী পাঠানো হয়েছে, (যেমন) পাঠিয়েছিলেন আপনার পূর্বে [41:43, 42:13]। আল্লাহ মহা শক্তিশালী ও মহা বিজ্ঞানী।
মহাবিশ্বে যা কিছু আছে, সমস্ত কিছুই আল্লাহর।
42:4 নং আয়াহ : যা কিছু আছে মহাবিশ্বে এবং যা কিছু আছে পৃথিবীতে, সবই তার। আর তিনিই সুউচ্চ ও সুমহান।
শিরক কত বড় অপরাধ??
42:5 নং আয়াহ : (শিরক এত বড় অপরাধ [31:13] যে) গ্ৰহানু সমূহ একত্রিত ভাবে তাদের উপর কক্ষচ্যুত হয়ে পতনের উপক্রম হয়, তখন ফেরেস্তা তার (আল্লাহর) প্রশংসা সহ পবিত্রতা ঘোষণা/ বর্ণনা করেন এবং তাদের জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা করেন [40:7-9], যারা পৃথিবীর/ গ্ৰহের/ কোনও পৃণ্ডের বাসিন্দা। জেনে রেখ, আল্লাহ সীমাহীন ক্ষমাশীল ও সীমাহীন করুণাময়।
আল্লাহকে অভিভাবক হিসাবে বাদ দেওয়ার পরিণতি।
42:6 নং আয়াহ : এবং যারা তাকে বাদ দিয়ে অন্যদেরকে আউলিয়া/ অভিভাবক/ ঈশ্বর [41:31] হিসাবে গ্ৰহণ করেছে, তাদের দায়িত্ব আল্লাহর। আপনি তাদের জন্য ওয়াকীল/ উকীল (দায়ি) নন [10:99, 16:82, 3:119]।
নাবী (সা) কে সৌদি আরবে কেন পাঠানো হয়েছিল??
42:7 নং আয়াহ : আর এভাবেই আমরা ওহী হিসাবে কুরআনকে আরবিতে নাযিল করেছি, যেন আপনি উম্মুল কুরআ/ কেন্দ্রীয় ভূমি এবং তার আশেপাশের মানুষ জনদের সতর্ক করতে পারেন [14:4, 41:44] একত্রিত হওয়ার দিন [69:16-17] সম্পর্কে, যাতে কোনও সন্দেহ নেই। সেদিন একদল যাবে জান্নাতে, আর অন্য দল যাবে জলন্ত আগুনে।
# আপনি বাড়িতে থাকা পৃথিবীর মানচিত্র/ গ্লোবটা হাতে নিন। তারপর দেখুন- এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপের কেন্দ্রে বর্তমান সৌদি আরব অবস্থিত (তখন অন্যান্য চারটি মহাদেশ আবিষ্কার হয় নি)। এজন্য নাবী (সা) কে বর্তমানের সৌদি আরবে পাঠানো হয়েছিল, যাতে ইসলাম খুব দ্রুত চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে। আর সেটাই হয়েছিল।
# প্রশ্ন হবে- “তাহলে কি পবিত্র কুরআন শুধু আরব ভূখণ্ড ও তার আশেপাশের জন্য” ?? উত্তর সহজ- যেহেতু কেন্দ্রীয় ভূখণ্ডের ভাষা আরবি, তাই নাবী (সা) পবিত্র কুরআন দেওয়া হয়েছিল আরবি ভাষায়। তিনি তাদেরকে আরবিতে সতর্ক করতেন। এখানে আরবি ভাষায় পবিত্র কুরআন দেওয়ার অন্যতম একটা কারণ বলা হয়েছে। পবিত্র কুরআন মানবজাতির জন্য (2:185)।
# প্রশ্ন হবে- আমাদের ভাষায় পবিত্র কুরআন নাযিল হল না কেন?? এই একই প্রশ্নটা যদি আমেরিকার মানুষ করে যে, আমাদের ভাষায় পবিত্র কুরআন নাযিল হল না কেন?? যদি চিনের মানুষ করে যে, আমাদের ভাষায় পবিত্র কুরআন নাযিল হল না কেন?? এখন আল্লাহ কি প্রত্যেক ভাষায় কুরআন নাযিল করবেন?? তারচেয়ে ভালো তিনি আরবিতে নাযিল করবেন, মানুষরা নিজের ভাষায় অনুবাদ করে নেব। প্রশ্ন হবে- “আরবিতেই কেন নাযিল করলেন”?? প্রথমত, আরব ছিল/ হল কেন্দ্রীয় ভূমি। দ্বিতীয় কারণটা আল্লাহ নিজে উল্লেখ করেছেন 41:3 তে।
# প্রশ্ন হবে- “আল্লাহ কি অন্যান্য মহাদেশ গুলো সম্পর্কে জানতেন না”?? যে আল্লাহ এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপের কেন্দ্র সম্পর্কে জানতে পারলেন, যখন ম্যাপ ছিল না। তিনি কি আমেরিকা সহ অন্যান্য মহাদেশে গুলো সম্পর্কে জানবেন না?? আমেরিকা সম্পর্কে জানতে 67:15 তে যান, ঘুরে আসুন।
মানুষকে ‛মুসলিম না হওয়ার’ স্বাধীনতা।
42:8 নং আয়াহ : আর যদি আল্লাহ চাইতেন, তাহলে (জোর করে) সবাইকে একই জাতিভুক্ত [26:3-4] করতে পারতেন। কিন্তু তিনি যাকে চান, তাকে তার রহমতের মধ্যে প্রবেশ করান [42:13, 13:27]। আর অত্যাচারীদের জন্য কোনও ওলী/ অভিভাবক থাকবে না, আর না থাকবে কোনও সাহায্যকারী।
# অনেকেই বলেন- “ইসলাম সত্য হলে পৃথিবীর সবাই মুসলিম নন কেন”?? এই আয়াহ তাদের জন্য যথাযোগ্য উত্তর।
আল্লাহ ছাড়া কোনও ওলী নেই।
42:9 নং আয়াহ : তারা কি তাকে বাদ দিয়ে অন্যদেরকে আউলিয়া/ অভিভাবক/ ঈশ্বর [41:31] বানিয়েছে?? অথচ আল্লাহই একমাত্র ওলী। আর তিনি জড় পদার্থে জীবন [3:28] দেন। আর তিনিই সমস্ত কিছুর উপর ক্ষমতাবান।
সত্য গ্ৰহণ করতে চাইলে, তাকে যা বলতে হবে।
42:10 নং আয়াহ : এবং (বলুন) তোমরা যে সমস্ত বিষয়ে মতভেদ কর, সেই সমস্ত বিষয়ে মিমাংসা হবে আল্লাহর কাছে। উনিই আল্লাহ, যিনি আমার প্রভু [41:30]। আমি তার উপরই নির্ভর [65:3] করি, তারই অভিমুখী [31:15]।
আল্লাহর মতো কোনও কিছুই নেই।
42:11 নং আয়াহ : এতএব তিনিই মহাবিশ্ব ও পৃথিবীকে উপযোগী করেছেন। তিনিই তোমাদের জন্য তোমাদের নিজেদের মধ্য হতে সঙ্গী/ সঙ্গীনি সৃষ্টি করেছেন। গৃহপালিত পশুদের সৃষ্টি করেছেন নারী পুরুষ হিসাবে। আর এভাবেই তোমাদের বংশের বিস্তার হয়। তার মতো কোনও কিছুই নেই। আর তিনি সমস্ত কিছুই শোনেন ও সমস্ত কিছুই দেখেন।
মহাবিশ্বে রয়েছে গোপন পথ সমূহ।
42:12 নং আয়াহ : তারই নিয়ন্ত্রণে মহাবিশ্বের গোপন পথ সমূহ [51:7, 15:14-15]। তিনি যাকে চান, তার রিযিককে প্রশস্ত করে দিতে পারেন। (আবার কারো ক্ষেত্রে রিযিক) সংকীর্ণ করে দিতেও পারেন [29:62, 42:27]। নিশ্চয়ই তিনি প্রত্যেকটা বিষয়ে জ্ঞান রাখেন।
ইসলাম নতুন কোনও ধর্ম নয়।
42:13 নং আয়াহ : তিনি তোমাদের জন্য শরিয়তের সেই বিধান সমূহ জারি করেছেন, যার নির্দেশ দিয়েছিলেন নূহের প্রতি। এবং আমরা সেই (বিধান গুলোই) ওহী করেছি আপনার প্রতিও [41:43]। যেমন আমরা ইবরাহীম, মূসা ও ঈশার কাছে এই মর্মেই নির্দেশ দিয়েছিলাম যে, আপনারা দীন প্রতিষ্ঠা করুন এবং দীনকে বিভক্ত করবেন না। আপনি মুশরিকদেরকে যার (তাওহীদের) দিকে ডাকছেন, তা তাদের জন্য খুবই কষ্টকর। আল্লাহ যাকে চান, তাকে বেছে নেন। এবং পথ দেখান তাকে [13:27], যে তার অভিমুখী/ তার দিকে মুখ ফেরায় [39:18]।
‛খৃষ্টান ধর্ম’ কিভাবে তৈরি হল??
42:14 নং আয়াহ : আর তাদের কাছে জ্ঞান আসার পরও তাদের মধ্যে বিদ্বেষের কারণে (১) তারা বিভক্ত [2:213] হয়েছিল। যদি না আপনার প্রতিপালকের অবকাশ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নির্ধারিত থাকত, তাহলে তাদের মধ্যে তখনই মিমাংসা করে দেওয়া হোত। আর তাদের পরে যারা কিতাবের ওয়ারিশ হয়েছিল (অর্থাৎ খৃষ্টানরা), তারা ছিল বিভ্রান্তিকর সন্দেহের মধ্যে [4:157]।
১ এর প্রমাণ হল- খৃষ্টান ধর্ম। যিশু/ ঈশা (আ) বারবার বললেন- “আমি ইহুদীদের জন্য এসেছি” (Matthew, 15:24)। কিন্তু ইহুদীরা তাকে গ্ৰহণ করলেন না, উপরন্তু বিভিন্ন অপবাদ দিলেন (4:156)। যারা তাকে গ্ৰহণ স্বীকার করলেন, তারা পরবর্তীতে ‛খৃষ্টান’ নামে পরিচিত হলেন (Acts, 11:26)। তৈরি হল- নতুন ধর্ম। অথচ যিশু খৃষ্টান ধর্ম প্রচারই করেন নি। তিনি জানতেনও না- ‛খৃষ্টান ধর্ম’ নামে কোনও ধর্ম আছে।
বিভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে সহাবস্থানের নির্দেশনা।
42:15 নং আয়াহ : এতএব সেই কারণে মানুষকে ডাকুন এবং নিজে (দীনের উপর) প্রতিষ্ঠিত থাকুন, যেমনটা আপনাকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে [30:30]। আর অনুসরণ করবেন না তাদের খেয়ালখুশির [45:18]। এবং বলুন- “আমি স্বীকার করেছি তা, আল্লাহ যে কিতাবই নাযিল করেছেন [5:48]। আর আমাকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে তোমাদের মাঝে ন্যায়বিচার করার [5:8]। আল্লাহ আমাদের প্রভু, তোমাদেরও প্রভু [3:51]। সুতরাং আমাদের ধর্মকর্ম সমূহ আমাদের জন্য থাক, তোমাদের ধর্মকর্ম সমূহ তোমাদের জন্য থাক [39:39]। এতএব আমাদের ও তোমাদের মধ্যে কোনও সমস্যা/ অশান্তি/ দাঙ্গা/ যুদ্ধ হওয়া উচিৎ নয়। আল্লাহ আমাদেরকে একত্রিত করবেন [42:29]। তার দিকেই ফিরে [69:16-17] যেতে হবে”।
ইসলাম গ্ৰহণের পূর্বে আল্লাহর অস্তিত্ব সম্পর্কে নিশ্চিত হতে হবে।
42:16 নং আয়াহ : আর যারা ডাকে সাড়া দেওয়ার পরও আল্লাহর অস্তিত্ব সম্পর্কে তর্কবিতর্ক করে, তাদের প্রভুর কাছে তাদের তর্কবিতর্ক অর্থহীন (১)। তাদের উপর ক্রোধ বর্ষিত হবে, তাদের জন্য থাকবে কঠিন শাস্তি।
১ তবে তার অর্থ এই নয় যে, আল্লাহর অস্তিত্ব সম্পর্কে প্রশ্ন তোলা যাবে না। আল্লাহ যা বলতে চাইছেন, তা হল- এগুলো ইসলাম গ্ৰহণের আগে চিন্তা ভাবনা করা উচিৎ। ইসলাম গ্ৰহণের পর এই চিন্তা ভাবনা অর্থহীন। আর আল্লাহর অস্তিত্ব সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা সহ নিশ্চিত হতে 16:20-21 আয়াত দেখুন।
কুরআন ও হাদীস উভয়ই আল্লাহর পক্ষ থেকে নাযিলকৃত।
42:17 নং আয়াহ : আল্লাহ (তিনি), যিনি বিজ্ঞান ভিত্তিক পদ্বতিতে [2:97] কিতাব (কুরআন) এবং মীযান (হাদীশ) নাযিল করেছেন [4:113, 40:70] আপনি কিভাবে জানবেন [79:44], হয়ত কিয়ামত নিকটে!
কিয়ামত সম্পূর্ণ বৈজ্ঞানিক বিষয়।
42:18 নং আয়াহ : তারাই তা (কিয়ামত) সম্পর্কে তাড়াহুড়ো করে, যারা সত্য স্বীকার করে নি। কিন্তু যারা সত্য স্বীকার করেছে, তারা জানে যে, তা (কিয়ামত) সত্য [69:16-17]। জেনে রেখ, যারা কিয়ামত সম্পর্কে কুতর্ক করে, তা গোঁড়ামির গভীরে রয়েছে [84:1-5]।
আল্লাহ তার বান্দাদের প্রতি অত্যাধিক দয়াবান/ কোমল।
42:19 নং আয়াহ : আল্লাহ তার বান্দাদের প্রতি অত্যাধিক দয়াবান/ কোমল [1:2, 2:143]। তিনি যাকে চান, তাকে (অঢেল) রিযিক দান করেন [17:30, 53:39]। আর তিনি মহা শক্তিধর ও মহা শক্তিশালী।
ইহজীবন ও পরবর্তী জীবনের সাফল্য কামনা করা উচিৎ।
42:20 নং আয়াহ : যে পরবর্তী জীবনে ফল/ ফসল পেতে চায়, আমরা তাকে জন্য পরবর্তী জীবনে ফল/ ফসল বৃদ্ধি করে দিই। আর যে ইহজীবনের ফল/ ফসল কামনা করে, তাকে তা হতে কিছু দিই। তবে তার জন্য পরবর্তী জীবনে কোনও অংশ থাকে না [17:18, 2:200-201]।
শুধু আল্লাহর-ই শরিয়ত/ বিধান জারি করার অধিকার আছে।
42:21 নং আয়াহ : নাকি তাদের এমন কোনও শরিক/ ঈশ্বর আছে, যারা তাদের জন্য দীনের শরিয়ত/ বিধান জারি করেছে, যার অনুমোদন [18:26] আল্লাহ দেন নি?? যদি না মিমাংসার বিষয়টি নির্ধারিত থাকত, তাহলে তাদের মাঝে (তখনই) মিমাংসা করে দেওয়া হোত। আর নিশ্চয়ই আইনভঙ্গকারীদের জন্য থাকবে কষ্টদায়ক শাস্তি।
আইনভঙ্গকারীদের পরিণতি।
42:22 নং আয়াহ : আপনি দেখবেন- আইন ভঙ্গকারীরা তাদের অর্জনের জন্য ভীতসন্ত্রস্ত অবস্থায় থাকবে। তা (তাদের কর্মের শাস্তি) তাদের উপর পাতিত হবে। তবে যারা সত্য স্বীকার করে ও সৎকর্ম করে, তারা থাকবে জান্নাতের বাগান সমূহে। তারা যা চাইবে, তাদের প্রভুর কাছে তা-ই রয়েছে [41:31, 50:35]। ওটাই বিরাট বড় অনুগ্রহ/ দয়া।
নাবী (সা) তার আত্মীয়দের থেকে কি চাইতেন??
42:23 নং আয়াহ : ওটাই তা, যার সুসংবাদ আল্লাহ দিচ্ছেন তার বান্দাদেরকে, যারা সত্য স্বীকার করে সৎকর্ম করে। বলুন- “আমি তোমাদের থেকে কোনও পারিশ্রমিক/ প্রতিদান চাই না [38:86, 42:40]। তবে আত্মীয় হিসাবে ভালোবাসা চাই”। আর যে উত্তম কর্ম/ সৎকর্ম করে, আমরা তার প্রতিদান বাড়িয়ে দিই [6:160, 4:40, 2:261]। নিশ্চয়ই আল্লাহ ক্ষমাশীল ও (সৎকর্ম) স্বীকারকারী।
যদি নাবী (সা) নিজে কুরআন রচনা করতেন, তাহলে যা হোত।
42:24 নং আয়াহ : নাকি তারা বলে- “তিনি (মুহাম্মাদ) আল্লাহর উপর মিথ্যা রচনা [2:23-24] করে”?? যদি (আপনি মিথ্যা রচনার করতেন) তাহলে আল্লাহ চাইলেই আপনার মস্তিষ্কের কার্যকারিতা শেষ যেত [69:44-47]। আল্লাহ তার বাণী দ্বারা মিথ্যাকে ধ্বংস করে সত্য [21:18] প্রতিষ্ঠা করেন [17:81]। নিশ্চয়ই তিনি জানেন মস্তিষ্ক সমূহের অবস্থা।
আল্লাহ তাওবা কবুলকারী, পাপ সমূহ মোচনকারী।
42:25 নং আয়াহ : তিনিই (আল্লাহ), যিনি তার বান্দাদের তাওবা কবুল করেন, পাপ সমূহ মোচন করেন [39:53, 25:70]। আর তিনি জানেন- তোমরা যা কিছু করছো।
আল্লাহ মূমীন ও মুসলিমদের ডাকে সাড়া দেন।
42:26 নং আয়াহ : এবং তিনি তাদের ডাকে সাড়া দেন, যারা সত্য স্বীকার করে ও সৎকর্ম করে। আর তিনি তাদের প্রতি তার অনুগ্রহ বাড়িয়ে দেন। এবং সত্য অস্বীকার কারীদের জন্য থাকবে কঠিন শাস্তি।
# “তাহলে কি আল্লাহ ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের ডাকে সাড়া দেন না”?? দেন, দেখুন 40:60 ও 2:186 আয়াত।
আল্লাহ কেন সবাইকে সমান ধনী করে দেন না??
42:27 নং আয়াহ : আর যদি তিনি তার বান্দাদেরকে সমান ভাবে রিযিক দিতেন, তাহলে তারা ভূপৃণ্ডে বিপর্যয় সৃষ্টি করতো [16:71]। তিনি যাকে চান, তাকে প্রদান করেন, তবে নিয়ন্ত্রিত ভাবে। নিশ্চয়ই তিনি তার বান্দাদের সম্পর্কে সমস্ত কিছুই জানেন, সমস্ত কিছুই দেখেন।
# এর কাছাকাছি একটা প্রশ্ন- “সরকারের কাছে তো টাকা ছাপানোর মেশিন আছে, টাকা ছাপিয়ে গরিবদের দিয়ে দিচ্ছে না কেন”?? উভয় প্রশ্নের উত্তর আল্লাহ এই আয়াহতে দিয়ে রেখেছেন, তাও আজ থেকে 1500 বছর আগে।
উত্তরটা কি হবে?? উত্তর অনেক বড় হবে। তবে ছোট করে বলা সম্ভব, কিন্তু বুঝে নেওয়া কঠিন হবে। তবুও চেষ্টা করা যেতে পারে। ধরুন, ভারতে 2024 সালে মোট গম উৎপাদন হয়েছে 20 কেজি, যার দাম ₹ 20 টাকা, দেশের জনসংখ্যা 20 জন। এখন সরকার ₹ 200 টাকার নোট ছাপিয়ে একেক জনকে ₹ 10 টাকা করে দিয়ে দিল। এতে কি সবাই ধনী হয়ে যাবে?? না, কেউই ধনী হবেন না। কারণ, টাকা তো আপনি খেতে পারবেন না। অন্যদিকে গম তো মাত্র 20 কেজিই আছে।
এখন ধরুন, আপনি আপনার পাওনা সরকারের পক্ষ থেকে ₹ 10 টাকা হাতে পেলেন। মানুষের প্রাকৃতিক স্বভাব হল- বাড়তি টাকা পেলেই বেশি কেনাকাটা করবে। সুতরাং টাকা পাওয়ার পরই গম কিনতে গেলেন। গিয়ে দেখলেন আপনার মতো আরও 19 জন ₹ 10 টাকা করে নিয়ে গম কেনার জন্য লাইন দিয়ে আছে। গম মাত্র ₹ 1 টাকা কেজি ছিল। এখন সবাই গম কেনার জন্য পাগল প্রায় হয়ে যাচ্ছে। এদিকে গম বিক্রেতাও সরকারের থেকে ₹ 10 টাকা পেয়েছেন। তাই তিনি গম বিক্রি করতে চাইছেন না।
কিন্তু ক্রেতারা মরিয়া হয়ে উঠেছে। বেশি দাম দিয়েও গম কিনতে চাইছে। এই পরিস্থিতি দেখে গম বিক্রেতা গমের দাম বাড়িয়ে ₹ 10 টাকা কেজি করে দিলেন। তখন আপনার কাছে দুটি উপায়- A) প্রথমে গম বিক্রেতাকে হত্যা করে তার থেকে গম লুট করা। তারপর অন্যান্য খদ্দেরকে হত্যা করে গম বাড়িতে নিয়ে আসা। B) ₹ 10 টাকা কেজি গম কিনে বাড়িতে নিয়ে আসা। আর এটাকেই ভদ্র ভাষায় বলে মুদ্রাস্ফীতি (Inflation)। সুতরাং টাকা ছাপিয়ে কোনও লাভ নেই।
এবার জানতে হবে- টাকা কেন ছাপানো হয়! মানব সভ্যতায় এমন সময় ছিল, যখন বস্তু দ্বারা বস্তু বিনিময় করা হোত। কিন্তু তাতে সমস্যা অনেক। যেমন, আপনার কাছে ছাগল আছে, আর আমার কাছে গরু। এখন বিনিময় হবে কিভাবে?? অনেক সময় অতিক্রমের পর এর সমাধান আসে। তা হল মুদ্রার ধারণা, মুদ্রা। তারপর আধুনিক টাকা।
এই উদেশ্যে এই যে, বস্তু নিয়ে ঘোরা কষ্টকর, অসম্ভব ও বস্তু ভাঙানো কঠিন কাজ। কিন্তু বস্তুর বিনিময়ে টাকা দিয়ে লেনদেন করা খুবই সহজ। শুধু বস্তুর দাম/ মান নির্ধারণ করে নিলেই হবে। তারমানে, বস্তুর বিনিময়ে টাকা ছাপাতে হয়, বস্তু ছাড়া টাকা ছাপানোর কোনও মূল্য নেই।
সুতরাং দেশের জনগণকে/ সবাইকে ধনী করতে চাইলে কি করতে হবে?? গমের উৎপাদন বাড়াতে হবে। গমের উৎপাদন অনুযায়ি টাকা ছাপাতে হবে। ধরুন, 2025 সালে যদি ভারতে গমের উৎপাদন হয় 30 কেজি। তখন বাড়তি 10 কেজি গমের জন্য সরকার আরও ₹ 10 টাকা ছাপাতে পারবে (বর্তমানে GDP Growth এর উপর ভিত্তি করে টাকা ছাপানো হয়)। তারপর ঐ ছাপানো টাকা বাজারে আসবে। তারপর শ্রম, জ্ঞান বুদ্ধি, আবিষ্কার, উৎপাদন ও বিনিয়োগ দ্বারা মানুষ ঐ টাকা উপার্জন করবে। তারপর যারা দ্রুত ধনী হতে শুরু করবে, সরকার তদের উপর Tax বাসাবে। ধনীদের উপর সরকার Tax বসিয়ে গরিবদের জন্য সম্মানজনক জীবন যাপন ও জীবন যাপন সহজ করার জন্য কাজ করবে।
একটা প্রশ্নের উত্তর দেওয়া হল যে, সরকার টাকা ছাপিয়ে গরিবদের দিয়ে দিচ্ছে না কেন?? এবার “আল্লাহ কেন সবাইকে ধনী/ সমান ধনী করে দিচ্ছেন না”?? এই প্রশ্নের উত্তর যা হবে, সাম্যবাদী অর্থনীতি চলতে পারে না কেন, সেই প্রশ্নের উত্তরও হবে তা। অর্থাৎ এই দুই প্রশ্নের উত্তর একই হবে।
প্রথমে জানুন- সাম্যবাদী অর্থনীতি কি?? খুব সহজে বললে হবে- দেশে কেউ ধনী ও গরীব থাকবে না। থাকবে না কেউ মালিক ও শ্রমিক। থাকবে না কোনও খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ। দেশের সমস্ত সম্পদের মালিক হবে সরকার। সরকার দেশের সমস্ত সম্পদ সাধারণ মানুষের মধ্যে বন্টন করে দেবেন। দেশ থেকে গরীবি শেষ।
কিন্তু কাহিনী এখানে শেষ নয়। তারপর কি হবে?? সবাই কাজ করবে, সবাই সমান উপার্জন করবে। কিন্তু সবাই সমান কাজ করতে পারবে?? না। তাহলে যার মধ্যে বেশি কাজ করার ক্ষমতা আছে, সে কেন বেশি কাজ করবে?? আর কাজ কম করলেও তো উপার্জন একই থাকবে, তাহলে সমান/ বেশি কাজ করবে কেন?? এছাড়াও মানুষ কাজ করার উৎসাহ পাবে কিভাবে?? উৎসাহ না পেলে মানব সভ্যতার উন্নতি কিভাবে হবে?? এই সবের কোনও সমাধান নেই।
এ কারণে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন 1991 এ ভেঙে যায়, হয়ে যায় 15 টুকরো (হোসেন কুরানীর জন্ম 1991 এ)। তারমধ্যে সবচেয়ে বড় টুকরোটি রাশিয়া নামে টিকে আছে। কিন্তু সেখানে আজ সাম্যবাদী অর্থনীতি নেই। রাশিয়া বর্তমানে 50% পুঁজিবাদী অর্থনীতি গ্ৰহণ করেছে। এখন ঐ অর্থনীতিকে বলা হয় মিশ্র অর্থনীতি বা সমাজবাদী অর্থনীতি। অর্থাৎ ভারতের মতো।
বলে রাখা দরকার যে, পুঁজিবাদী অর্থনীতি হল- হুবহু সাম্যবাদী অর্থনীতির বিপরীত ব্যবস্থা। অর্থাৎ যেই দেশে সমস্ত কিছু হবে বেসরকারি। জনগণ যেভাবে ইচ্ছা বাজার পরিচালনা করবে, সরকারের কোনও নিয়ন্ত্রণ থাকবে না। একটা সময়ে আমেরিকা ছিল পুঁজিবাদী অর্থনীতির কেন্দ্র। কিন্তু আজ আমেরিকাও 50% সাম্যবাদী অর্থনীতি গ্ৰহণ করে নিয়েছে। অর্থাৎ মিশ্র অর্থনীতি। বা সমাজবাদী অর্থনীতি। ভারতের মতো। মানে, পুঁজিবাদী অর্থনীতি তবুও চলতে পারে, কিন্তু সাম্যবাদী অর্থনীতি চলতে পারে না।
আসলে সাম্যবাদী অর্থনীতি প্রাথমিক ভাবে ফলদায়ক হলেও, লম্বা সময় পর্যন্ত চলতে পারে না। এখন মূল প্রশ্নে আসি- আল্লাহ কেন সবাইকে ধনী/ সমান ধনী করে দেন না?? ধরুন, 2025 এ 10 গ্ৰাম সোনার দাম ₹ 1 লক্ষ টাকা। মানে এক কেজি সোনা ₹ 1 কোটি টাকা। এখন ছোট একটা প্রশ্ন- সোনার দাম এত কেন?? লোহার দাম এত নয় কেন?? উত্তর হল- পৃথিবীতে লোহা রয়েছে প্রচুর মাত্রায়, কিন্তু সোনা সীমিত। ধরুন, আল্লাহ সবাইকে ধনী করার জন্য সবাইকে এক কেজি করে সোনা দিয়ে দিলেন। এতে কি সবাই ধনী হয়ে যাবেন?? না, তখন সোনার মাত্রা বেড়ে যাওয়ার জন্য সোনা ₹ 500 টাকা কেজিতে পরিণত হবে। তাই নয় কি??
তখনও যারা ধনী ছিল, তারাই ধনী থাকবেন। তারপর ধনীরা ধীরে ধীরে সবার থেকে সোনা কিনে নেবেন। তারপর আবারও সোনার দাম বেড়ে যাবে। গরীব গরীব-ই থেকে যাবেন। যদি আমি সোনা বিক্রি না করি?? পরে ঘুরবেন ঐ কমদামী ধাতুটা! যার মূল্য রূপার চেয়েও কম
আরেকটা উদাহরণ দিই?? ধরুন, আমি হোসেন কুরানী পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ধনী (তবে একদিন হবো, ইনশাআল্লাহ)। শ্রম, বুদ্ধির ব্যবহার, নিত্য নতুন আবিষ্কার ও বিনিয়োগ করে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ধনী হয়েছি। আমার বংলো বাড়িও রয়েছে। সেখানে অনেক কাজের লোকও রয়েছে। সব মিলিয়ে সুখে দিন কাটাচ্ছি।
আল্লাহ চাইলেন যে, সবাইকে ধনী করে দেবেন। সেই মুতাবিক পৃথিবীর সবাইকে 100 কেজি করে সোনা দিয়ে দিলেন। যদিও আগেই এর পরিণতি দেখেছি। তা কখনও সম্ভব নয়। কিন্তু তবুও ধরে নিন। এরপর আমার সমস্ত কাজের লোক ধনী হয়ে গেল। আমি, আমার স্ত্রী হানী এবং দুই বাচ্ছা, পুত্র মাহীন ও কন্যা মাহী। আমরা একা হয়ে গেলাম।
নিজেদের সব কাজ নিজেদেরকে করতে হচ্ছে, অন্য উপায়ও নেই। এ পর্যন্ত সব ঠিক আছে। এরপর আসল সমস্যা শুরু হবে। আমার কাজের লোক গুলো আমার মতো বড় বাংলো বাড়ি বানাতে চাইছে কিন্তু রাজমিস্ত্রি পাচ্ছে না। রাজমিস্ত্রিরাও সবাই ধনী হয়ে গেছে। এখনও সব ঠিক আছে। এরপর খাবার। খাবো কি?? ধান চাষ কেউ করছে না। চাষীরাও ধনী হয়ে গেছে। 2-3 বছর ধরে কোনও রকমে পৃথিবীর সবার খাওয়া দাওয়া করল। শস্যের মজুত শেষ। আর শস্য নেই। এবার কি হবে!
কয়েক মাস গাছের পাতা ও ঘাস খেয়ে কাটলো। তাও শেষ। তারপর! পশুপাখি খেয়ে কয়েক বছর কাটলো। এরপর! অন্য উপায় আর নেই। তারপর?? আমরা স্বামী স্ত্রী আমাদের দুই সন্তানকে মেরে খেয়ে ফেললাম। তারপর?? হয় আমার স্ত্রী আমাকে খাবে, নয়ত আমি আমার স্ত্রী মেরে খেয়ে ফেলব। এজন্যই আল্লাহ বলেছেন- “যদি তিনি তার বান্দাদেরকে সমান ভাবে রিযিক দিতেন, তাহলে তারা ভূপৃণ্ডে বিপর্যয় সৃষ্টি করতো”।
এখানে কেউ বলতে পারেন- “চাষী তো চাষ করে খেতে পারবে”। যদি এটা মেনে নিই, তাহলে পৃথিবীতে শুধু চাষীরা বেঁচে থাকবে, আর কেউ নয়। তবে তা সম্ভব নয়। ধরুন, আমি আমার স্ত্রীকে খেয়ে ফেললাম। তারপর! আমার কি খাওয়ার চাহিদা শেষ হয়ে যাবে?? তারপর আমি অন্য মানুষদের খাবো। তাই নয় কি??
এখানে কেউ বলতে পারেন- “চাষীরা চাষ করে বিক্রি করবে, মানুষ কিনে খাবে”। হ্যাঁ, তা হতে পারে। কিন্তু তাহলে সেই আগের ব্যবস্থাই ফিরে এলো তো! সবাই ধনী করে তাহলে লাভটা কি হল??
আল্লাহ গবেষণা কর্মে যেভাবে সাহায্য করেন।
42:28 নং আয়াহ : এবং তিনিই (আল্লাহ), যিনি নামান বিশেষ জ্ঞান [31:34], যখন তারা (তাদের গবেষণা কর্মে) নিরাশ হয়। আর এভাবেই তিনি (আল্লাহ) তার দয়া বিস্তার করেন [92:7]। এবং তিনিই সর্বোচ্চ ওলী/ অভিভাবক ও সর্বোচ্চ প্রশংসিত।
# এটা লক্ষ্যণীয় বিষয় যে, আমাদের গবেষণা কর্ম মাঝে মধ্যে আঁটকে যায়। তখন আর কোনও উপায় খুঁজে পাওয়া যায় না, নিরাশ হয়ে যাই। ঠিক তখনই গুরুত্বপূর্ণ বুদ্ধিটা মাথায় আসে এবং গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার হয়ে যায়। এখানে সেটাই বলা হচ্ছে। বলে রাখি যে, আমার (হোসেন কুরানীর) সঙ্গে মাঝে মধ্যেই এমনটা হয়।
সমগ্র মহাবিশ্বে ‛জীবন’ ছড়িয়ে রয়েছে।
42:29 নং আয়াহ : আর তার নিদর্শনে মধ্যে অন্যতম নিদর্শন হল- তিনি মহাবিশ্ব সৃষ্টি করেছেন ও সৃষ্টি করেছেন পৃথিবী। আর সমগ্র মহাবিশ্বে ও পৃথিবীতে ছড়িয়ে দিয়েছেন জীবজন্তু/ প্রাণীকুল [5:18, 65:12]। আর তিনি যখন চাইবেন, তখন তাদের একত্রিত [21:104, 69:16-17] করতে সক্ষম।
প্রাকৃতিক আসদ বিপদ গুলো আসে মানুষের কর্মের জন্য।
42:30 নং আয়াহ : তোমাদের কাছে যে বিপদ গুলো পৌঁছায়, তা তোমাদের হাত গুলোর অর্জন [30:41]। তিনি (নিজ দয়ায়) তোমাদের বেশির ভাগ ভুল ত্রুটি ক্ষমা করে দেন [35:45, 16:61]।
# ‛হাত গুলোর অর্জন’ বলতে?? ধরুন- প্রতিমাসে 2-4 টি করে গতি সম্পন্ন ঝড় আসছে। আপনি ভাবলেন- “এগুলো আল্লাহ পাঠাচ্ছেন”। কিন্তু তা নয়। ঝড় সৃষ্টি হয় সমুদ্রের তাপমাত্রা বৃদ্ধির জন্য। আর পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বেড়েছে মানুষের লাগামহীন জীবন যাপনের জন্য। যাকে আমরা Global warming বলি (44:10-11)।
আল্লাহকে পৃথিবীতে হারানো সম্ভব নয়।
42:31 নং আয়াহ : আর তোমরা আল্লাহকে পৃথিবীতে হারাতে পারবে না [29:22, 72:12]। আল্লাহ ছাড়া তোমাদের কোনও ওলি/ অভিভাবক/ ঈশ্বর নেই [41:31, 37:35], আর না আছে কোনও সাহায্যকারী।
বায়ু চলাচল, জলযান ও সমুদ্র বিজ্ঞান।
42:32 নং আয়াহ : তার নিদর্শন সমূহের মধ্যে অন্যতম নিদর্শন হল- সমুদ্রে/ মহাসাগরে পাহাড় সদৃশ্য জলযান চলাচল।
42:33 নং আয়াহ : যদি তিনি চান, তাহলে বায়ু চলাচল থামিয়ে দিতে পারেন। ফলে তা (জলযান) নিজ স্থানে আবদ্ধ হয়ে যাবে। নিশ্চয়ই ঐ সমস্ত বর্ণনার মধ্যে রয়েছে নিদর্শন প্রত্যেক মহা ধৈর্য্যশীল ও কৃতজ্ঞের জন্য।
# কেউ বলতে পারেন/ বলেন- “এটা সেই যুগের জন্য প্রযোজ্য ছিল, তখন তো ইঞ্জিন চালিত জলযান ছিল না। এখন তা কিভাবে প্রযোজ্য হবে?? এখন তো ইঞ্জিন চালিত জলযান রয়েছে। বাতাসের প্রয়োজন নেই। সুতরাং কুরআন বৈজ্ঞানিক ভাবে ভুল”
ভুল নয়, মারাত্মক বৈজ্ঞানিক নিদর্শন। শুধুমাত্র আপনি বুঝতে পারেন নি, এই যা। সত্যিই বায়ু চলাচল থেমে গেলে ইঞ্জিন চালিত জলযানও নিজ স্থানে আবদ্ধ হয়ে যাবে। কিভাবে?? বলুন, বাতাস চলাচল করে কেন?? উত্তর সহজ- কোনও স্থানে সূর্য তাপের হ্রাস ও বৃদ্ধির জন্য। তাই না?? বাতাস থামতে পারে কখন?? যখন সূর্যের তাপ পৃথিবীতে আসা বন্ধ হয়ে যাবে। তাই নয় কি?? আর সূর্যের তাপ পৃথিবীতে আসা বন্ধ হয়ে গেলে সমুদ্র গুলো বরফে পরিণত হবে। ফলে জলযান গুলো নিজ স্থানে আবদ্ধ হয়ে যাবে। সুতরাং আল্লাহ ঠিকই বলেছেন যে, বায়ু চলাচল বন্ধ হয়ে গেলে জলযান নিজ স্থানে আবদ্ধ হয়ে যাবে।
সামুদ্রিক ঝড়ও মানুষের কর্মের ফল।
42:34 নং আয়াহ : অথবা তিনি সেগুলো (জলযান) কে ডুবিয়ে দিতে পারেন। এজন্য যে, তা (সামুদ্রিক ঝড়) তাদেরই অর্জন। তবে তিনি (নিজ দয়ায়) তোমাদের বেশির ভাগ ভুল ত্রুটি ক্ষমা করে দেন [42:30]।
আয়াত সমূহ নিয়ে কুকর্ককারীর পরিণতি।
42:35 নং আয়াহ : এবং তখন (বিচার দিবসে) জানতে পারবে তারা, যারা আমাদের আয়াত সমূহ নিয়ে কুতর্ক করতে থাকে [16:125, 29:46], তাদের কোনও আশ্রয়স্থল থাকবে না।
ইহজীবন নয়, জান্নাত উত্তম ও অধিক স্থায়ী।
42:36 নং আয়াহ : অতঃপর তোমাদেরকে যা কিছু দেওয়া হয়েছে, তা ইহজীবনের ভোগ সামগ্রী। আর আল্লাহর কাছে যা আছে, তা উত্তম ও অধিক স্থায়ী। তাদের জন্য, যারা সত্য স্বীকার করেছে এবং তাদের প্রভুর উপর নির্ভর করে [65:3]।
রাগের মূহুর্তে ক্ষমা করতে হবে।
42:37 নং আয়াহ : যারা বেঁচে থাকে বড় পাপ ও অশ্লীল কাজ সমূহ থেকে [4:31, 53:32]। আর যখন তারা রেগে যায়, তখন ক্ষমা করে দেয় [3:134]।
আইন তৈরির পদ্ধতি কেমন হওয়া উচিৎ??
42:38 নং আয়াহ : আর যারা সাড়া দেয় তাদের প্রভুর ডাকে [2:186]। স্বালাত/ আল্লাহর বিধান প্রতিষ্ঠা করে। তারা তাদের তাদের জন্য আইন সমূহ তৈরি করে শূরা/ পার্লামেন্টের মাধ্যমে। আর আমরা তাদেরকে রিযিক হিসাবে যা দিয়েছি, তা হতে দান [2:3, 8:3] করে।
নির্যাতনের প্রতিশোধ নেওয়া বৈধ।
42:39 নং আয়াহ : আর যাদের উপর নির্যাতন হলে প্রতিশোধ নেয় [42:41]।
# 16:126 ও 22:60 এ বলা হয়েছে- “যতটা নির্যাতন হয়েছে, ততটা প্রতিশোধ অনুমোদিত”। তবে এও বলা হয়েছে যে, “ধৈর্য্য ধারণ ও ক্ষমা করাই উত্তম। তা অতি সাহসের কাজ” (42:43)। এজন্য নাবী (সা) তার উপর হওয়া নির্যাতনের কখনও প্রতিশোধ নেন নি (বুখারী, হাদীশ 3560)। আল্লাহর নির্দেশ মুতাবিক তিনি তার উপর হওয়া প্রতিটা নির্যাতনকে ক্ষমা করে দিয়েছিলেন (7:199)।
■ খারাপের পরিণতি খারাপ ■ শত্রুকে ক্ষমা ও আপোষ নিষ্পত্তিতে উৎসাহ।
42:40 নং আয়াহ : তবে খারাপের পরিণতি খারাপই হবে [30:10]। এজন্য যে (শত্রুকে) ক্ষমা করে [41:34-35] ও (মতবিরোধ গুলোর) আপোষ নিষ্পত্তি করে, তার জন্য প্রতিদান থাকবে আল্লাহর কাছে। নিশ্চয়ই তিনি অত্যাচারীদের পছন্দ করেন না।
প্রতিশোধ নেওয়া বৈধ।
42:41 নং আয়াহ : এবং যে তার উপর হওয়া নির্যাতনের প্রতিশোধ নেয়, তবে তাদের বিরুদ্ধে (আল্লাহর পক্ষ থেকে) কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হবে না।
# 16:126 এ বলা হয়েছে- “যতটা নির্যাতন হয়েছে, ততটা প্রতিশোধ অনুমোদিত”। তবে এও বলা হয়েছে যে, “ধৈর্য্য ধারণ ও ক্ষমা করাই উত্তম। তা অতি সাহসের কাজ” (42:43)। এজন্য নাবী (সা) তার উপর হওয়া নির্যাতনের কখনও প্রতিশোধ নেন নি (বুখারী, হাদীশ 3560)। আল্লাহর নির্দেশ মুতাবিক তিনি তার উপর হওয়া প্রতিটা নির্যাতনকে ক্ষমা করে দিয়েছিলেন (7:199)।
প্রতিশোধ না নিয়ে ধৈর্য্য ধরা ও শত্রুকে ক্ষমা করা অতি সাহসের কাজ।
42:43 নং আয়াহ : এবং যে ধৈর্য্য ধারণ করে [31:17] ও ক্ষমা করে [41:34-35], (জেনে রেখো) নিশ্চয়ই ঐ গুলো অতি সাহসের কাজ সমূহ।
জাহান্নামীরা ইহজীবনে ফিরে আসতে চাইবে।
42:44 নং আয়াহ : আর আল্লাহ যাকে পথভ্রষ্ট করেন [2:26, 2:99], তার পরে তার জন্য আর কোনও ওলী/ অভিভাবক থাকল না [18:17]। আপনি দেখতে পাবেন যে, যখন অত্যাচারীরা/ সীমালঙ্ঘনকারীরা/ আইনভঙ্গকারীরা শাস্তি দেখবে, তখন বলবে- “(পূর্বের জীবনে) ফিরে যাওয়ার কোনও উপায় আছে কি” [6:27, 23:99-100]??
42:45 নং আয়াহ : আপনি দেখতে পাবেন- যখন তাদের কে তার (আল্লাহর) কাছে আনা হবে, তখন অপমানে (মাথা) থাকবে অবনত [70:44, 80:40]। যারা সত্য স্বীকার করেছে, তারা আড়চোখে তাকিয়ে বলবে- “নিশ্চয়ই ক্ষতিগ্রস্ত তারাই, যারা কিয়ামতের দিন তাদের নিজেদের ও নিজেদের পরিবারের ক্ষতি করেছে”। জেনে রাখুন- “আইন ভঙ্গকারীরা থাকবে প্রতিষ্ঠিত শাস্তির মধ্যে”।
বিচার দিবসে কোনও ঈশ্বর থাকবেন না, আল্লাহ ছাড়া।
42:46 নং আয়াহ : আর তাদেরকে সাহায্য করার জন্য আল্লাহ ছাড়া কোনও আউলিয়া/ ঈশ্বর [41:31] থাকবে না [37:35]। আর আল্লাহ যাকে পথভ্রষ্ট [2:26, 2:99] করেন, তার জন্য আর কোনও সুপথ থাকল না [18:17]।
সৌরজগৎ ধ্বংসের দিনটি কেমন হবে??
42:47 নং আয়াহ : তোমরা তোমাদের প্রভুর ডাকে সাড়া দাও [2:186], আল্লাহর পক্ষ থেকে সেই দিনটি [75:10-12] আসার পূর্বে, যে দিনটিকে প্রতিরোধ করার কেউ নেই। সেই দিন তোমাদের কোনও আশ্রয়স্থল থাকবে না, আর না থাকবে লুকানোর কোনও জায়গা।
অমুসলিমদের স্বাধীন জীবন যাপনের নিশ্চয়তা।
42:48 নং আয়াহ : এতএব তারা যদি মুখ ফিরিয়ে নেয়, তাহলে আমরা আপনাকে তাদের উপর নজরদারি [39:41] করার জন্য প্রেরণ করি নি [4:80, 2:119]। প্রচার করা ছাড়া আপনার অন্য কোনও দায়িত্ব নেই [16:82, 88:21]। নিশ্চয়ই আমরা যখন মানুষকে রহমতের স্বাদ আস্বাদন করাই, তারা উৎফুল্ল হয় [11:10]। আর যদি তাদের কাছে তাদের হাত গুলোর অর্জন হিসাবে কোনও খারাপ পরিণতি পৌঁছায়, নিশ্চয়ই তখন মানুষ অকৃতজ্ঞ হয়ে ওঠে [11:9]।
# দুটি হাদীশ। অমুসলিমদের উপর আর্থিক, সামাজিক, রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করা হারাম (আবু দাউদ, হাদীশ 3052)। অমুসলিমকে হত্যাকারী মুসলিম কোনও দিনও জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না, এমনকি জান্নাতে সুঘ্রাণও পাবে না (বুখারী, হাদীশ 3166)।
মহাবিশ্ব আল্লাহর নিয়ম মুতাবিক সৃষ্টি হয়েছে।
42:49 নং আয়াহ : মহাবিশ্ব ও পৃথিবীর মালিকানা শুধু আল্লাহর [18:51, 46:4]। তিনি যেভাবে চেয়েছেন, সেভাবেই (মহাবিশ্ব) সৃষ্টি করেছেন [25:2]। যাকে চান, তাকে কন্যা সমূহ দেন। আর যাকে চান, তাকে দেন পুত্র সমূহ।
42:50 নং আয়াহ : অথবা যাকে চান, তাকে পুত্র সমূহ এবং কন্যা সমূহ। আর (পুরুষ ও নারীর মধ্যে) যাকে চান, তাকে করে দেন বন্ধ্যা। নিশ্চয়ই তিনি জ্ঞানী ও নিয়ন্ত্রনকারী।
# প্রশ্ন হবে- “আল্লাহ ইচ্ছা করে মানুষকে বন্ধ্যা করে দেন”?? না, তবে কোন কোন কারণে, কি কি করলে মানুষ বন্ধ্যা হয়ে যায়, সেই সিস্টেম টা আল্লাহর তৈরি করা। মানে, পরোক্ষ ভাবে আল্লাহই তাকে বন্ধ্যা করলেন তো। এখানে সেটাই বলা হচ্ছে। উদাহরণ দিই?? ধরুন, আপনি একটি ঘর রক্ষার দায়িত্ব দিলেন, কিন্তু একজন চোর একা এসে ঐ ঘুরে ঢুকে চুরি করলেন। এখানে দায় কার?? আমার। তাই না?? বিষয়টি অনেকটা ঐ রকম।
কেউই আল্লাহকে দেখেন নি, নাবী (সা)-ও দেখেন নি।
42:51 নং আয়াহ : কোনও মানুষ এই মর্যাদার অধিকারী নয় যে, আল্লাহ তার সঙ্গে কথা বলবেন (সামনাসামনি)। তবে কথা বলতে পারেন- ওহী দ্বারা, পর্দার অন্তরাল থেকে, দূত (ফেরেস্তা) প্রেরণ করে, অতঃপর তিনি (ফেরেস্তা) তার (আল্লাহর) অনুমোদনে ওহী করেন, যেমনটা তিনি (আল্লাহ) চান [6:103]। নিশ্চয়ই তিনি সুউচ্চ ও বিজ্ঞানী।
■ হাদীশও পথ। ■ আল্লাহ কুরআন দ্বারা পথ দেখান।
42:52 নং আয়াহ : আর এভাবেই আমরা রূহ (কুরআন কে) আমাদের নির্দেশ হিসাবে আপনার কাছে ওহী করেছি। আপনি তো জানতেন না কিতাব কি, আর না জানতেন ইমান [29:48] কি! কিন্তু আমরা তাকে (কুরআনকে) করেছি নূর [4:174]। তা দ্বারা আমাদের বান্দাদের মধ্যে যাকে চাই [6:88], তাকে পথ দেখাই/ হেদায়েত দিই [13:27, 42:13]। তবে নিশ্চয়ই আপনিও (নাবীও) চূড়ান্ত সফলতার পথ দেখাচ্ছেন/ দেখান [93:11]।
# নাবী (সা) কথা/ হাদীশ দ্বারাও মানুষ চূড়ান্ত সফলতার পথ পাবে, এই আয়াহ তার সুস্পষ্ট দলিল। এছাড়াও এখানে পবিত্র কুরআনকে নূর বা হেদায়েতের মাধ্যম বলা হয়েছে, তেমনি আবার 5:15 তে নাবী (সা) কেও নূর বা হেদায়েতের মাধ্যম বলা হয়েছে।
আল্লাহর দিকে ফিরে যাওয়া ছাড়া উপায় নেই।
42:53 নং আয়াহ : পথ আল্লাহর। যিনি এমন যে, মহাবিশ্বে যা কিছু আছে এবং পৃথিবীতে যা কিছু আছে, সমস্ত কিছুই তার [6:12]। জেনে রেখ, সমস্ত বিষয়ই আল্লাহর দিকে ফিরে যাবে [69:16-17]।