১১১ নং সূরাহ | সূরাহ লাহাব | Surah no 111 | Surah Lahab |

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম। 

অর্থ- আল্লাহর নাম নিয়ে পড়া শুরু করছি, যিনি সীমাহীন দয়ালু এবং সীমাহীন করুণাময়।

নাযিল : মাক্কাহ, আয়াত সংখ্যা 5 টি।

আবূ লাহাব সম্পর্কিত ভবিষ্যৎ বাণী।

111:1 নং আয়াহ : ধ্বংস হবে আবূ লাহাবের দু-হাত ১ এবং সে নিজেও।

১ দু-হাত বলতে কি?? আরবে দু-হাত বলতে ‛ক্ষমতা’ বোঝান হয়ে থাকে।

# আবূ লাহাবের আসল নাম- উযযা। উযযা নাবী (সা) আপন চাচা। তার গায়ের রঙ ছিল লাল ফর্সা। যা খানিকটা আগুনের রঙের মতো। আগুনের রঙকে আরবিতে ‛লাহাব‘ বলা হয়। তাই তাকে আবূ লাহাব বলা হতো। অর্থাৎ আগুনের রঙের পিতা। এই 111:3 আয়াহটির শেষ শব্দ হল- লাহাব। যার অর্থ- “আগুনের লেলিহান শিখা”।

আবূ লাহাবের অর্জন সম্পর্কে ভবিষ্যৎ বাণী।

111:2 নং আয়াহ : না কাজে আসবে তার ধন-সম্পদ। আর না কাজে আসবে তার অর্জন ১।

১ অর্জন বলতে কি?? তার সামাজিক প্রতিষ্ঠা ও তার সন্তান সন্ততি তথা পরিবার পরিজন।

# 111:1 ও 111:2 আয়াত ছিল আবূ লাহাবের করুণ পরিণতি সম্পর্কিত ভবিষ্যৎ বাণী। 3 নং আয়াহতে তার পরবর্তী জীবনের পরিণতি সম্পর্কে কথা বলা হচ্ছে। যাইহোক, আবূ লাহাব ইসলামের ঘোর বিরোধী ছিল। আবার সে নাবী (সা) এর প্রতিবেশী‌ও ছিল। সে নাবী (সা) কে শারীরিক ও মানসিক ভাবে কষ্ট দিত। নাবী (সা) যখন যেখানেই দীন প্রচারের জন্য বের হতেন, তখন সেও পিছনে পিছনে যেত। নাবী (সা) যখনই কাউকে বোঝাতেন, তখনই সে বলে উঠত- “মুহাম্মাদ মিথ‍্যাবাদী”। অথচ সে নিজেও জানতো যে, নাবী (সা) কে তৎকালীন আরবের মানুষজনরা ‘আল আমীন বা আস্ব স্বাদীক’ (অর্থাৎ সত‍্যবাদী) বলে ডাকত এবং নাবী (সা) জীবনে কখনও মিথ্যা বলেন নি।

   এ ছাড়াও নাবী (সা) যখন স্বালাত আদায় করতেন এবং সিজদা’তে যেতেন, তখন বিভিন্ন পশুর নাড়িভুঁড়ি নাবী (সা) এর উপরে ফেলে দিত। এভাবেই সে নাবী (সা) কে অতিষ্ঠ করে তুলেছিল। তখন‌ই নাযিল হয় সূরাহ নাহাব। হিজরতের প্রায় 3 বছর আগে। এর‌ই মাঝে নাবী (সা) মক্কাতে প্রায় 13 বছর ‛নাবী জীবন’ অতিবাহিত করে মদীনাহতে হিজরত করে‌ন। মাদীনাহতে গিয়ে মাদীনাহ রাষ্ট্র গঠন করার কিছু দিনের মধ্যে ‛বাদর’ যুদ্ধ সংগঠিত হয়। মক্কার সমস্ত মুশরিক নেতা-নেত্রীরা যুদ্ধে অংশ গ্ৰহণ করে কিন্তু আবূ লাহাব ‛সবচেয়ে বড় ইসলাম বিদ্বেষী ও বিরোধী’ হ‌ওয়া সত্ত্বেও যুদ্ধে অংশ গ্ৰহণ করে নি। কেননা, সে জানত যে- ‛সূরাহ লাহাব’ এ তার করুণ পরিণতি‌র কথা বলা হয়েছে। যা পূর্ণ হবেই। কেননা,  মুহাম্মাদ কখনও মিথ্যা বলে না। নিশ্চয়ই এই ‛সূরাহ লাহাব’ আল্লাহ’র পক্ষ থেকে।

   এজন্য সে সর্বদা সতর্ক থাকত। যাইহোক, যুদ্ধে অংশ গ্ৰহণ না করলেও সে তার একজন প্রতিনিধি পাঠিয়েছিল। যার নাম ছিল- আস ইবনে হিশাম। বাদর যুদ্ধে মক্কার মুশরিক‌রা মারাত্মক ভাবে পরাজিত হয়। এই খবর শুনেই আবূ লাহাব ভেঙে পড়ে, অসুস্থ হয়ে পড়ে। এর‌ই মাঝে তার কন্যা ‛দাররা’ এবং দুই পুত্র ‛উতবা ও মুআত্তাব’ মাদীনাহতে গিয়ে ইসলাম গ্ৰহণ করে। অসুস্থতার পর তার শরীরে এক ধরণের ফুসকুড়ি বের হতে শুরু হয় এবং দেখতে দেখতে তার সমগ্র শরীর ফুসকুড়িতে ভরে যায়। শরীর থেকে জীবিত অবস্থাতেই দুর্গন্ধ বের হতে শুরু হয়। তার সন্তান সন্ততি ও পরিবার পরিজন সংক্রমণের ভয়ে তাকে মৃত্যুর অপেক্ষায় ফেলে রেখে পালিয়ে যায়। মৃত্যুর তিন দিন পর‌ও কেউ তাকে কাবর দেয় নি। পচে বিশ্রী দুর্গন্ধ বের হতে থাকে। এমতাবস্থায় এলাকার কিছু মানুষ কয়েকজন হাবশী দাসকে নিয়োগ করে তাকে মাটি খুঁড়ে পুঁতে দেওয়া হয়। যদিও মৃতকে সম্মান সহ কাবর দেওয়ার রীতি তখনও ছিল। এভাবেই তার সম্পর্কে যে ভবিষ্যৎ বাণী করা হয়েছিল, তা পূর্ণ হয়।

# অনেক ইসলাম বিদ্বেষী‌ই প্রশ্ন করে থাকেন- “কুরআন তো জীবন বিধান, এখানে এখানে সূরাহ লাহাবের কাজ কি?? উত্তর সহজ- ১) আবু লাহাবের ভবিষ্যৎ বাণী এবং তার পূর্ণতার মাধ্যমে পবিত্র কুরআনের সত্য‌তাও প্রমাণিত হয়েছিল। ২) সত‍্যতা প্রমাণের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের মনে এই ধারণ‌ও সৃষ্টি হল- কুরআনের অন‍্যান‍্য ভবিষ্যৎ বাণী‌ও সত্য। ৩) সত‍্যতা প্রমাণের সঙ্গে সঙ্গে নাবী মুহাম্মাদ (সা) মিথ্যা নাবী নয় এবং কুরআন তার নিজের রচিত নয়, তাও প্রমাণিত হল।

আবূ লাহাব জাহান্নামী হ‌ওয়ার ভবিষ্যৎ বাণী।

111:3 নং আয়াহ : খুব শীঘ্রই সে জ্বলবে আগুনের লেলিহান শিখার মধ্যে।

আবূ লাহাবের স্ত্রীও জাহান্নামী।

111:4 নং আয়াহ : তার স্ত্রীও, যে কাঠ বহনকারী‌নি।

# এই সূরাহ নাযিল হ‌ওয়ার বেশ কয়েক (5-7) বছর পর্যন্ত আবূ লাহাব ও তার স্ত্রী জীবিত ছিল। কিন্তু তারা কেউই ইসলাম গ্ৰহণ করে নি। যদি তাদের মধ্যে কেউ ইসলাম গ্ৰহণ করে ফেলত, তাহলে এই 111:3-4 আয়াহ ভুল প্রমাণিত হয়ে যেত। তার সঙ্গে সঙ্গে পবিত্র কুরআন‌ও ভুল প্রমাণিত হত।

জাহান্নামে আবূ লাহাবের স্ত্রীর কি ধরণের শাস্তি হবে??

111:5 নং আয়াহ : তার গলায় পাকানো থাকবে শিকল [69:32, 104:9]।

# আব লাহাবের স্ত্রীর নাম- আরদায, ডাক নাম ছিল- উম্মু জামীল। সেও নাবী (সা) এর দরজায় ‛কাঁটা যুক্ত গাছ’ বিছিয়ে রাখতো, যাতে নাবী (সা) এর সন্তানদের ক্ষতি হয়। তাই এখানে তার সম্পর্কে বলা হচ্ছে- “তার স্ত্রীও, যে কাঠ বহনকারী‌নি”।

3.7/5 - (3 votes)
শেয়ার করুন:

মন্তব্য করুন