৯৬ নং সূরাহ | সূরাহ আলাক | Surah no 96 | Surah Alaq |

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম। 

অর্থ- আল্লাহর নাম নিয়ে পড়া শুরু করছি, যিনি সীমাহীন দয়ালু এবং সীমাহীন করুণাময়।

নাযিল : মাক্কাহ, আয়াত : 19 টি।

পড়াশোনা/ জ্ঞান অর্জন বাধ্যতামূলক।

96:1 নং আয়াহ : পড়ুন আপনার প্রভুর নামে, যিনি সমস্ত কিছু সৃষ্টি করেছেন।

# একটি হাদীশ- “প্রত‍্যেক মুসলিমের উপর জ্ঞান অর্জন ফরজ করা হয়েছে”(ইবনে মাজাহ, হাদীশ 224)। নাবী (সা) ইতিহাসে‌র প্রথম শাসক, যিনি মুসলিম নাগরিকদের উপর পড়াশোনা বাধ‍্যতামূলক ঘোষণা করেছিলেন।

   প্রশ্ন হবে- অমুসলিম‌দের উপর নয় কেন?? এজন্য যে, যদি তা তাদের ধর্মে হস্তক্ষেপ বলে গণ্য করে নেওয়া হয়! এজন্য যে, “পড়াশোনা বাধ‍্যতামূলক ঘোষণা” বলপ্রয়োগ বলে গণ্য করে নেওয়া হয়! অন্য ধর্মের অনুসারীদের উপর যে কোনও ধরণের বলপ্রয়োগ ইসলামে হারাম (88:22, 2:256)। তবে যদি অন্য ধর্মাবলম্বী‌রা চাইতেন, তাহলে বিষয়টি ভিন্ন হোত।

# একটা ছোট ঘটনা বলি। তাহলে পড়াশোনা‌র গুরুত্ব বুঝতে পারবেন। বদর যুদ্ধে মুসলিম পক্ষ বিজয়ী হয়। মুসলিম‌দের হাতে মাক্কাহর 70 জন মানুষ যুদ্ধবন্দী হয়ে মাদীনাহ‌তে আসেন। যারা যুদ্ধবন্দী হয়ে আসেন, তারা সবাই শিক্ষিত ছিলেন।

   নাবী (সা) ঘোষণা করেন- “যদি তোমরা মুক্তি পেতে চাও, তাহলে তোমাদের প্রত‍্যেক জন মাদীনাহ‌র 10 জনকে পড়াশোনা শিখিয়ে শিক্ষিত করে তুলবে। এর বিনিময়ে তোমরা মুক্তি পাবে”। পৃথিবী এমন মুক্তিপণ এর আগে কখনও দেখে নি।

মানব ভ্রুণের বর্ণনা।

96:2 নং আয়াহ : তিনি মানুষ‌কে সৃষ্টি করেছেন আলাক থেকে।

# আলাকের কয়েকটি অর্থ হয়। যেমন- জোঁকের মতো পদার্থ, চিবানো চর্বিযুক্ত মাংসের মতো পদার্থ, ঝুলে থাকা পদার্থ। আধুনিক ভ্রুণ বিদ‍্যা বলে যে, এক্ষেত্রে 3 টি অর্থ‌ই প্রযোজ্য।

   কেননা, আমরা জানি- ভ্রুণ মায়ের জরায়ু‌তে ঝুলন্ত অবস্থায় থাকে। আর তা দেখলে মনে হবে- জোঁকের মতো পদার্থ বা চিবানো চর্বিযুক্ত মাংসের মতো পদার্থ, ঝুলে থাকা পদার্থ। গুগলে গিয়ে 4 সপ্তাহের ভ্রুণের ছবি দেখে নিন। পবিত্র কুরআনের সত‍্যতা উপলদ্ধি করতে পারবেন (41:53)।

আল্লাহ মহা সম্মানিত, পড়লে তবেই বোঝা যাবে।

96:3 নং আয়াহ : পড়ুন যে, আপনার প্রভু মহা সম্মানিত।

# প্রশ্ন হবে- পড়ার মাধ্যমে কিভাবে জানব যে, আল্লাহ মহা সম্মানিত?? উত্তর রয়েছে পরের আয়াহতে। তবে, এজন্য বলা হয়- “অল্প জ্ঞানী নাস্তিকতা অবলম্বন করে, গভীর জ্ঞানী আস্তিকতা অবলম্বন করে” (34:6, 17:107)।

মানব হাতের বৈশিষ্ট্য।

96:4 নং আয়াহ : যিনি কলম ধরার বিদ‍্যা শিখিয়েছেন।

# একথা বলার প্রয়োজন‌ কেন হল?? মানুষ কলম দ্বারা লিখতে পারে, এটা সাধারণ বিষয়। এটা আল্লাহ কুরআনে আনলেন কেন?? বিবর্তন সম্পর্কে একটু পড়াশোনা করলে বিষয়টি বুঝতে পারবেন। দেখুন 87:2 আয়াহ। আসলে বিবর্তনের ইতিহাস পড়লে জানা যায়- আমাদের পূর্বে পৃথিবীতে বিবর্তনের মাধ্যমে কিছু জীব সৃষ্টি হয়েছিল। যা দেখতে অনেকটা আমাদের মতোই ছিল। যাদেরকে আমরা ভিন্ন ভিন্ন নামে চিনি। এদের মধ্যে আমাদের সবচেয়ে কাছাকাছি যে প্রজাতি টি ছিল, তাদের নাম ছিল- হোমো নিয়ান্ডারথাল।

   অনেক বিজ্ঞানী মনে করেন- নিয়ান্ডারথাল‌ই বিবর্তিত হয়ে আধুনিক মানুষে পরিণত হয়েছে। তবে, পবিত্র কুরআন তা বলে না। পবিত্র কুরআন বলে- “তারা নিজেদের মধ্যে অশান্তি, গোষ্ঠী দ্বন্দ্ব, মারামারি, কাটাকাটি, হানাহানি করতে করতে বিলুপ্ত হয়ে গেছে” (2:30 দ্র)।

   কিন্তু আমাদের মধ্যে ও তাদের মধ্যে একটা পার্থক্য ছিল, আর তা হল- তাদের হাতের গঠন। তারা লাঠি ধরতে পারত, পাথর ধরতে পারত, কিন্তু তারা কলম ধরে লিখতে পারত না। তাই এখানে (96:4 এ) সেই পার্থক্য‌টা তুলে ধরার জন্য আল্লাহ “কলম ধরার” বিষয়টি উল্লেখ করেছেন। এখন যদি আপনি বিবর্তন সম্পর্কে না পড়েন, তাহলে নিয়ান্ডারথাল‌ সম্পর্কে জানবেন কিভাবে?? আর না জানলে, তাদের সঙ্গে আমাদের পার্থক্যটা বুঝবেন কিভাবে?? না বুঝলে, পবিত্র কুরআনের সত‍্যাতা জানবেন কিভাবে?? না জানলে, আল্লাহ যে মহা সম্মানিত- সেটা উপলদ্ধি করবেন কিভাবে?? তাই বলা হচ্ছে- “পড়ুন যে, আপনার প্রভু মহা সম্মানিত”(96:3)। বাস্তবিকই তিনি মহা সম্মানিত। নয়ত মানুষ‌কে এমন জ্ঞান (কুরআন) প্রদান করতেন না, যা  (মানুষ) ইতিপূর্বে জানতো না (96:5)।

কুরআনের মতো জ্ঞান ইতিপূর্বে আসে নি।

96:5 নং আয়াহ : মানুষ‌কে এমন জ্ঞান (কুরআন) প্রদান করলে‌ন, যা (মানুষ) ইতিপূর্বে [45:20] জানতো না।

মানুষ আইন ভঙ্গকারী বা উগ্ৰ।

96:6 নং আয়াহ : কখনও না, নিশ্চয়ই মানুষ আইন ভঙ্গকারী/ উগ্ৰ [19:72, 28:83]।

যে কারণে মানুষ আইন ভঙ্গ করে/ উগ্ৰতা দেখায়।

96:7 নং আয়াহ : এ কারণে যে, সে নিজেকে সমস্ত কিছুর ঊর্ধ্বে [41:15] ভেবে নেয়।

মানুষ‌কে আল্লাহর দিকে ফিরে যেতেই হবে।

96:8 নং আয়াহ : অথচ নিশ্চয়ই তাকে আপনার প্রভুর দিকে ফিরে [69:16] যেতে হবে [84:1-5]।

আবূ জাহিল নামাজ আদায়ে বাধা দিত।

96:9 নং আয়াহ : আপনি কি দেখেছেন তাকে, যে বাধা সৃষ্টি করে??

# “যে বাধা সৃষ্টি করে”। কিন্তু এখানে কার কথা বলা হয়েছে?? আবূ জাহিলের কথা। প্রসঙ্গ জানতে হাদীশটা দেখুন- “ইবনু আব্বাস (রা) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন- নাবী (সা) নামায আদায় করছিলেন। আবূ জাহিল তখন এসে বলল- আমি কি তোমাকে এ কাজ করতে নিষেধ করিনি, আমি তোমাকে এ কাজ করতে কি নিষেধ করিনি, আমি তোমাকে এ কাজ করতে কি নিষেধ করিনি”(তিরমিযী, হাদীশ 3349)?? সেই পেক্ষিতেই নাযিল হয় এই সূরাহ‌র প্রথম 5 টা আয়াত বাদ দিয়ে বাকিটা।

নাবী (সা) কে নামাজ আদায়ে বাধা দিত।

96:10 নং আয়াহ : এক বান্দাকে, যখন তিনি স্বালাত/ নামাজ আদায় করেন??

কাউকে বাধা দেওয়ার আগে যা ভাবতে হবে।

96:11 নং আয়াহ : তোমরা কি ভেবে দেখেছ- (যাকে বাধা দেওয়া হচ্ছে), তিনি যদি সঠিক [46:10, 41:52] পথে থাকেন!

# হাদীশ- “কেউ কোন‌ও খারাপ কাজ হতে দেখলে, সে তা হাতের সাহায্যে দমন করতে সক্ষম হলে, তা যেন হাত দ্বারা প্রতিরোধ করে। যদি হাতের দ্বারা প্রতিরোধ করতে সক্ষম না হয়, তবে জিহ্বা দ্বারা, আর যদি জিহ্বা দ্বারা প্রতিরোধ করতে সক্ষম না হয়, তাহলে যেন মস্তিষ্ক দ্বারা প্রতিরোধ করে (ঘৃণা করে)। তবে এটা দুর্বল ঈমানের স্তর”(আবু দাউদ, হাদীশ 4340)।

তাক‌ওয়ার নির্দেশ দেলেও তার কর্মে বাধা কেন??

96:12 নং আয়াহ : অথবা তাক‌ওয়া (অপকর্ম থেকে দূরত্ব) অবলম্বনের নির্দেশ দেন!

সত্য অস্বীকার করলে ও মুখ ফেরালে আল্লাহর ক্ষতি নেই।

96:13 নং আয়াহ : আপনি কি ভেবে দেখেছেন, যদি সে (আবূ জাহেল) সত্য অস্বীকার করে ও মুখ ফিরিয়ে নেয় (তাতে কি আল্লাহর [64:6, 14:8] ক্ষতি হবে)??

আল্লাহ সমস্ত কিছু দেখছেন।

96:14 নং আয়াহ : নাকি সে জানেন না যে, আল্লাহ সমস্ত কিছু দেখছেন [3:15, 84:15]??

অগ্ৰ/ সম্মুখ মস্তিষ্কের গুরুত্ব।

96:15 নং আয়াহ : কখনও নয়, যদি সে বিরত না হয়, তাহলে আমরা অবশ্যই তার সম্মুখ/ অগ্ৰ মস্তিষ্ক অকেজো করে দেব।

96:16 নং আয়াহ : মিথ্যাচারী ও পাপাচারী‌র সম্মুখ/ অগ্ৰ মস্তিষ্ক অকেজো করে দেব।

# এখানে সম্মুখ/ অগ্ৰ মস্তিষ্ক নষ্ট করার ধমকি দেওয়া হচ্ছে কেন?? উত্তর খুব সহজ- মানুষের সম্মুখ/ অগ্ৰ মস্তিষ্ক ইচ্ছাশক্তি, চিন্তা, বুদ্ধি, সৃজনশীলতা‌ ও স্মৃতি‌র জন্য দায়ী। সুতরাং তার সম্মুখ/ অগ্ৰ মস্তিষ্ক নষ্ট করে দিলেই সে জীবন্ত লাসে পরিণত হবে। তার আর কোনও কার্যকারিতা থাকবে না। অথচ সে সম্মুখ/ অগ্ৰ মস্তিষ্কের ব‍্যবহার করেই ক্ষমতার অধিকারী হয়েছে।

বিচার দিবসে সমর্থক ডাকার চ‍্যালেঞ্জ।

96:17 নং আয়াহ : এত‌এব সে যেন (বিচার দিবসে) ডাকে তার সমর্থক‌/ শুভাকাঙ্ক্ষীদেরকে।

বিচার দিবসে আল্লাহ ফেরেস্তাদের ডাকবেন।

96:18 নং আয়াহ : আমরা শীঘ্রই ডাকবো [54:48, 69:39-32] জাহান্নামের প্রহরীদের‌কে [66:6, 74:30]।

সিজদা হল- আল্লাহর নৈকট্য লাভের উপায়।

96:19 নং আয়াহ : কখনও না, (তার বাধা সৃষ্টি) মেনে নেওয়ার প্রয়োজন নেই। সিজদা করুন/ করতে থাকুন এবং (আপনার প্রভুর) নৈকট্য লাভ করুন।

❤️ সিজদাহ‌র আয়াহ ❤️

5/5 - (1 vote)
শেয়ার করুন:

মন্তব্য করুন