বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম।
অর্থ- আল্লাহর নাম নিয়ে পড়া শুরু করছি, যিনি সীমাহীন দয়ালু এবং সীমাহীন করুণাময়।
নাযিল : মাদীনাহ, আয়াত : 22 টি।
জিহার প্রসঙ্গে এক নারী নাবী (সা) এর সঙ্গে তর্কবিতর্ক করছিল।
58:1 নং আয়াহ : অবশ্যই আল্লাহ (সেই নারীর) কথা শুনেছেন, যে তার স্বামীকে নিয়ে আপনার সঙ্গে তর্কাতর্কি/ বাদানুবাদ করছিল এবং আল্লাহর কাছে অভিযোগ করছিল। আল্লাহ আপনাদের দুজনের কথাই শুনেছেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ শোনেন ও দেখেন।
# প্রশ্ন হবে- “সেই নারী কে ছিলেন”?? সেই নারী ছিলেন খাওলা বিনতু মালিক (রা)। সংক্ষেপ খাওলা (রা)। এই সম্পর্কে নাষাইয়ের 3460 এ আইশাহ (রা) হতে একটি হাদীশ বর্ণিত রয়েছে। চাইলে গিয়ে একবার দেখে আসতে পারেন।
জিহার প্রথা অযৌক্তিক/ অসঙ্গত ও মিথ্যা/ ভিত্তিহীন।
58:2 নং আয়াহ : যারা তোমাদের মধ্যে স্ত্রীদের সঙ্গে জিহার করে (তাদের জেনে রাখা উচিৎ), তারা তাদের মা হয়ে যায় না। যারা জন্ম দিয়েছে, তারাই তাদের মা। (যারা স্ত্রীকে মা বলে) নিশ্চয়ই তারা মুনকার/ অসঙ্গত কথাই বলে, যা শুধুই ভিত্তিহীন/ মিথ্যা। আর নিশ্চয়ই আল্লাহ পাপ মোচনকারী ও ক্ষমাশীল।
# জিহার অর্থ- স্ত্রী মা বলে ঘোষনা করা। এটি একটি নোংরা প্রথা ছিল। জিহার করাকে ত্বালাক বলে গণ্য করা হোত। তবে পবিত্র কুরআন তা বাতিল/ রদ করে দিয়েছে। বউকে হাজার বার ‛মা’ বললেও বউ ‛মা’ হয়ে যাবে না।
জিহার করার কাফফারা/ শাস্তি/ জরিমানা।
58:3 নং আয়াহ : সুতরাং যারা স্ত্রীদের সঙ্গে জিহার করে, পরে যা বলেছিল, তা হতে ফিরে আসে, (তার শাস্তি হল) একে অপরকে স্পর্শ করার পূর্বে একটি দাস/ দাসী [90:13] মুক্ত করতে হবে। তা (কুরআন) দ্বারা উপদেশ দেওয়া হচ্ছে। আর আল্লাহ সেই সমস্ত বিষয়ে জ্ঞান রাখেন, যে সমস্ত আমল/ কর্ম তোমরা করছো।
এখন দাস দাসী নেই, এখন কি করণীয়??
58:4 নং আয়াহ : অতঃপর যে কোনও দাস দাসী পাবে না, সে একে অপরকে স্পর্শ করার পূর্বে এক টানা দু-মাস রোজা রাখবে। আর যার সামর্থ্য হবে না, সে ষাট জন নিরুপায় গরীবকে খাওয়াবে। ওটা এজন্য যে, যেন তোমরা স্বীকার করতে পারো আল্লাহ ও তার রাসূলকে। ঐ গুলোই আল্লাহর নির্ধারিত সীমা/ বিধান সমূহ। আর সত্য অস্বীকার কারীদের জন্য থাকবে কষ্টদায়ক শাস্তি।
আল্লাহ ও রাসূলের বিরোধিতার পরিণতি।
58:5 নং আয়াহ : নিশ্চয়ই যারা আল্লাহ ও তার রাসূলের বিরোধিতা করবে, তাদেরকে তেমন ভাবে লাঞ্চিত করা হবে, যেমন লাঞ্চিত করা হয়েছিল তাদের পূর্ববর্তীদের [58:20]। আর অবশ্যই আমরা নাযিল করেছি প্রমাণিত আয়াত সমূহ। সত্য অস্বীকারকারীদের জন্য রয়েছে অপমান জনক শাস্তি।
মানুষ তার আমল ভুলে গেলেও আল্লাহ ভোলেন না।
58:6 নং আয়াহ : সেদিন আল্লাহ সবাইকেই (একত্রিত মহাবিশ্ব হতে) পুনরুত্থিত [70:43, 84:1-5] করবেন। অতঃপর তাদেরকে জানিয়ে দেবেন, তারা যে সমস্ত আমল/ কর্ম করেছিল। তারা ভুলে গেছে, কিন্তু আল্লাহ গননা করে রেখেছেন [20:52]। আর আল্লাহ সমস্ত বিষয়ের সাক্ষী।
আল্লাহ সর্বত্র বিরাজমান।
58:7 নং আয়াহ : আপনি কি লক্ষ্য করেন নি যে, আল্লাহ জানেন- যা কিছু আছে মহাবিশ্বে এবং আর যা কিছু আছে পৃথিবীতে [49:18]। তিন জনের এমন কোনও গোপন পরামর্শ হয় না, যেখানে তিনি চতুর্থ হন না। আর পাঁচ জনের (এমন কোনও গোপন পরামর্শ হয় না) যেখানে তিনি ষষ্ঠ হন না। কম হোক বা বেশি, তিনি তাদের সঙ্গেই [57:4] আছেন, তারা যেখানেই থাকুক [2:115]। পরে তিনি কিয়ামত দিবসে তাদেরকে জানিয়ে দেবেন, তা যে সমস্ত আমল/ কর্ম করেছিল। নিশ্চয়ই প্রতিটা বিষয়ই আল্লাহর জ্ঞানের আওতায় রয়েছে।
■ গোপন পরামর্শ নিষিদ্ধ। ■ সালাম দেওয়ার সঠিক পদ্ধতি।
58:8 নং আয়াহ : আপনি কি তাদেরকে দেখেন নি, যাদের কে নিষেধ করা হয়েছিল গোপন পরামর্শ করতে?? অথচ তারা তবুও তা করে চলেছে, যা নিষেধ করা হয়েছিল [4:114]। তারা পাপ, উগ্ৰতা/ সীমালঙ্ঘন ও রাসূলের বিরোধিতার জন্য গোপন পরামর্শ করে ১। আর যখন তারা আপনার কাছে আসে, তখন এমনভাবে অভিভাদন করে, যেমন ভাবে আল্লাহ অভিভাদন করেন নি ২। তারা নিজেদের মধ্যে বলাবলি করে- “আমরা যা বলি, তার জন্য আল্লাহ আমাদেরকে শাস্তি দেন কেন”?? তাদের জন্য জাহান্নাম যথেষ্ট, তাতে তারা প্রবেশ করবে। আর খুবই নিকৃষ্ট আশ্রয়স্থল।
১ সাধারণত ইসলামে গোপন পরামর্শ নিষিদ্ধ। তবে মানব কল্যাণ/ জন কল্যাণ, নিজেকে সংশোধনের বিষয়ে গোপন পরামর্শ করা যেতে পারে। যা এর পরের আয়াহতে বলা হয়েছে।
২ আজকের পেক্ষিতে বললে হবে- “তারা এখন ‛সালামুন আলাইকুম’ বলে অভিবাদন করে”। অবিভাদনের পদ্ধতি হল- আসসালামু আলাইকুম। এই সম্পর্কে আমরা 56:26 ও 6:54 তে বিস্তারিত কথা বলেছি।
কল্যাণকর বিষয়ে গোপন পরামর্শ বৈধ।
58:9 নং আয়াহ : হে সত্য স্বীকার করা সম্মানিত মানুষজন, যদি গোপনে পরামর্শ করতেই হয়, তাহলে পাপ, উগ্ৰতা/ সীমালংঘন ও রাসূলের বিরোধিতার জন্য গোপন পরামর্শ করো না। গোপন পরামর্শে কল্যাণকর বিষয় ও তাকওয়া (অপকর্ম থেকে দূরত্ব বজায় রাখা) সম্পর্কে আলোচনা কর। আর আল্লাহর জন্য তাকওয়া (অপকর্ম থেকে দূরত্ব) অবলম্বন কর। তার দিকেই তোমাদেরকে একত্রিত [69:16-17] করা হবে।
তখন গোপন পরামর্শ হতো মূমীনদের ক্ষতির জন্য।
58:10 নং আয়াহ : মূলত গোপন পরামর্শ শাইত্বানের পক্ষ থেকেই হয়ে থাকে। আর তা শুধুমাত্র যারা সত্য স্বীকার করেছে, তাদেরকে দুঃখ দেওয়ার জন্য। আর কেউই তাদের কোনও ক্ষতিই করতে পারবে না আল্লাহর অজান্তে [57:22]। আল্লাহর উপর নির্ভর করাই মূমীনদের কর্তব্য।
জ্ঞানীকে আল্লাহ সম্মান/ মর্যাদা দান করেন।
58:11 নং আয়াহ : হে সত্য স্বীকার করা সম্মানিত মানুষজন, যখন তোমাদেরকে বলা হয় বৈঠকের মধ্যে জায়গা প্রশস্ত করে দাও, তখন প্রশস্ত করে দেবে। আল্লাহ তোমাদেরকে (জান্নাতে) জায়গা প্রশস্ত করে দেবেন। আর যখন বলা হয় উঠে যাও, তখন উঠে যাবে। তোমাদের মধ্যে যারা সত্য স্বীকার করেছে ও যাদেরকে জ্ঞান দান করা হয়েছে, তাদেরকে সম্মান/ মর্যাদা দান করবেন। আল্লাহ সেই সমস্ত বিষয়ে জ্ঞান রাখেন, যে সমস্ত আমল/ কর্ম তোমরা করছো।
রাসূলের সঙ্গে একান্তে/ গোপনে কথা বলার নিয়ম/ বিধান।
58:12 নং আয়াহ : হে সত্য স্বীকার করা সম্মানিত মানুষজন, তোমরা যখন রাসূলের সঙ্গে একান্তে/ গোপনে কথা বলতে চাইবে, তখন একান্তে/ গোপনে কথা বলার পূর্বে (নিরুপায় গরিবকে) সাদকা/ দান করবে। ওটাই তোমাদের জন্য উত্তম ও পবিত্র। আর যদি কিছুই না পাও, তবে নিশ্চয়ই আল্লাহ ক্ষমাশীল ও সীমাহীন করুণাময়।
আল্লাহর ও রাসূলের দেওয়া বিধানের অনুসরণ।
58:13 নং আয়াহ : তোমরা কি ভয় পেয়ে গেলে যে, একান্তে/ গোপনে কথা বলার পূর্বে সাদকা করতে হবে?? যদি তা না করতে না পার, সে বিষয়ে আল্লাহ তোমাদেরকে ক্ষমা করে দিয়েছেন। তবে তোমরা স্বালাত/ আল্লাহর বিধান প্রতিষ্ঠা কর ও যাকাত (ট্যাক্স) প্রদান কর। অনুসরণ কর আল্লাহর (দেওয়া বিধানের) ও তার রাসূলের (দেওয়া বিধানের)। আর আল্লাহ সেই সমস্ত বিষয়ে জ্ঞান রাখেন, যে সমস্ত আমল/ কর্ম তোমরা করছো।
# আসলে সবাই একান্তে/ গোপনে কথা বলতে চাইত, কথা বলার জন্য লাইন লেগে যেত। এমনটা নয় যে, গুরুত্বপূর্ণ কোনও কথা বলত। সাধারণ কথাও একান্তে/ গোপনে বলতে চাইত। আর নাবী (সা) ‛না’ বলতে পারতেন না। আল্লাহ এ থেকেই নাবী (সা) রেহাই দিতেই এই ব্যবস্থা করেছেন। যাতে একেবারে প্রয়োজন না হলে কেউ একান্তে কথা বলতে না চায়। তবে সাদকা করা বাধ্যতামূলক করা হয় নি। কিন্তু সামান্য মানসিক চাপ সৃষ্টি করা হয়েছিল মাত্র। যাকে আমরা ‛মুস্তাহাব’ বলে থাকি।
মুনাফিকরা নাবী (সা) কে মাদীনাহ থেকে বহিষ্কারের চক্রান্ত করত।
58:14 নং আয়াহ : আপনি কি তাদেরকে দেখেন নি, যারা এমন সম্প্রদায়ের সঙ্গে বন্ধুত্ব করেছে, যাদের উপর আল্লাহর শাস্তি বর্ষিত হয়েছে [59:11, 63:7-8]। না তারা (মুনাফিকরা) তোমাদের অন্তর্ভুক্ত, আর না তোমরা তাদের (ইয়াহূদীদের) অন্তর্ভুক্ত। তারা জেনে শুনে মিথ্যা শপথ করে।
# এখানে তাদের কথা বলা হচ্ছে, যারা নামধারী মুসলীম হয়েও ইহুদীদের সঙ্গে গোপনে আঁতাত রাখত। অথচ ইহুদীরা নাবী (সা) সহ মুসলীমদের মদীনা থেকে বহিষ্কার করতে চাইত। এই সম্পর্কে 9:13 তেও কথা বলা হয়েছে।
মুনাফিকদের পরবর্তী জীবন কেমন হবে??
58:15 নং আয়াহ : আল্লাহ তাদের জন্য কঠিন শাস্তি প্রস্তুত করে [4:145] রাখবেন। নিশ্চয়ই তারা খুবই নিকৃষ্ট কর্ম করে চলেছে [63:2]।
শপথকে ঢাল হিসাবে ব্যবহার করা হারাম।
58:16 নং আয়াহ : তারা তাদের শপথ গুলোকে ঢাল হিসাবে ব্যবহার [58:18, 63:2] করে। অতঃপর তারা মানুষকে আল্লাহর পথে (আসতে/ চলতে) বাধা সৃষ্টি করে [63:2]। তাদের জন্য থাকবে অপমান জনক শাস্তি [4:145]।
পরবর্তী জীবনে মুনাফিকদের পরিণতি।
58:17 নং আয়াহ : আল্লাহর কাছে তাদের ধনসম্পদ ও সন্তান সমূহ তাদের সামান্য টুকুও কোনও কাজে আসবে না [26:88। তারাই হবে আগুনের বাসিন্দা, তারা সেখানে অনন্তকাল থাকবে।
মিথ্যা শপথকারী বিচার দিবসেও মিথ্যা শপথ করবে।
58:18 নং আয়াহ : যেদিন আল্লাহ সবাইকে পুনরুত্থিত [70:43, 84:1-5] করবেন, তারা তখনও শপথ তার কাছে শপথ করবে, যেমন তোমাদের কাছে করে। তারা ভাবে যে, তারা (বিশেষ কোনও ভিত্তির) উপর প্রতিষ্ঠিত [18:104]। জেনে রেখ, নিশ্চয়ই তারা মিথ্যাবাদী।
শাইত্বানের দল কারা??
58:19 নং আয়াহ : শাইত্বান তাদের উপর প্রভাব বিস্তার করে ফেলেছে। তাদেরকে ভুলিয়ে দিয়েছে আল্লাহর বিধান/ কুরআন। তারাই হিজবুশ শাইত্বান (শাইত্বানের দল)। জেনে রেখ, নিশ্চয়ই শাইত্বানের দলই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
আল্লাহ ও রাসূলের বিরোধিতার পরিণতি।
58:20 নং আয়াহ : নিশ্চয়ই যারা আল্লাহ ও তার রাসূলের বিরোধিতা করে, তারাই হবে চরম লাঞ্ছিতদের অন্তর্ভুক্ত [58:5]।
ইসলামের বিজয় হবেই, সঙ্গে থাকলে আপনিও বিজয়ী হবেন।
58:21 নং আয়াহ : আল্লাহ লিখে রেখেছেন যে, আমি এবং আমার রাসুলরা বিজয়ী হব [37:171-173, 40:51]। নিশ্চয়ই আল্লাহ শক্তিধর ও শক্তিশালী।
■ আল্লাহর দল। ■ মুনাফিক বাদে সমস্ত সাহাবা (রা) রা জান্নাতী।
58:22 নং আয়াহ : আপনি (পরিপূর্ণ মূমীনদের মধ্যে) এমন কোনও কাওম/ গোষ্ঠি/ দল পাবেন না, যারা আল্লাহ ও পরবর্তী জীবন স্বীকার করে, আবার তারা তাদের সঙ্গে সহযোগিতাও করে, যারা আল্লাহ ও তার রাসূলের বিরোধিতা করে [9:13]। যদিও তারা হয় তাদের পিতা, পুত্র, ভাই বা তার গোত্র [9:24]। (আল্লাহ) তাদের মস্তিষ্কে সত্য স্বীকারকে সুদৃঢ় করে দিয়েছেন এবং তাদেরকে তার পক্ষ থেকে রূহ (জিবরীল) দ্বারা শক্তিশালী করেছেন। তাদেরকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন, যেখানে তাদের নিয়ন্ত্রণে প্রবাহিত হবে নদনদী। তারা সেখানে অনন্তকাল থাকবে। রাদ্বিয়াআল্লাহু আনহুম (আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন)। তারাও আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছে। তারাই হিজবুল্লাহ (আল্লাহর দল)। আর জেনে রেখ, আল্লাহর দলই সফলতা পাবে।