বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম।
অর্থ- আল্লাহর নাম নিয়ে পড়া শুরু করছি, যিনি সীমাহীন দয়ালু এবং সীমাহীন করুণাময়।
নাযিল : মাদীনাহ, আয়াত : 73 টি।
নাবী (সা) এর উপর দরুদ ও সালাম পাঠ করার নির্দেশ।
33:56 নং আয়াহ : নিশ্চয়ই আল্লাহ ও তার ফেরেস্তারা নাবীর জন্য স্বালাত/ কল্যাণ কামনা [33:43] করেন (১)। সুতরাং হে সত্য স্বীকার করা সম্মানিত মানুষজন, তোমরা তার উপর স্বালাত/ দরুদ পড় এবং সালাম প্রেরণ করতে থাক।
১) আমরা আল্লাহর থেকে চাই, আল্লাহ কার থেকে চান?? একটু ভুল বুঝেছেন। চাওয়া এবং কামনা- দুটি ভিন্ন শব্দ, এদের অর্থও ভিন্ন। চাওয়া মানে- প্রার্থনা। কামনা মানে- ইচ্ছা। যেমন, এখন নাস্তিক ভাবেন- “আমি ধনী হব এবং একটা সুন্দরী নারীকে বিবাহ করব”। এটা কামনা, এটা তার ইচ্ছা। তিনি তা কারোর/ আল্লাহর থেকে চাইছেন না, তিনি কামনা করেন। মানে, এটা তার ইচ্ছা। আল্লাহ ও ফেরেস্তারা কামনা করেন। তারমানে, এই নয় যে, কারোর থেকে চাইছেন।
# দুটি প্রশ্ন- A) দরুদ তো আমরা জানি কিন্তু সালাম প্রেরণ বলতে আসলে কি?? “আসসলামু আলাইকা ইয়া আইয়ুহান নাবী”- এটাই সালাম প্রেরণ। বুঝতে পারছেন না?? এটা আত্তাহিয়াতুর অংশ, মনে পড়েছে?? B) নাবী (সা) কি আত্তাহিয়াতু ও দরুদ পড়েছেন?? হ্যাঁ, পড়েছেন। কোথায় পাব?? মুসলিম, হাদীশ 580/2 ও ইবনে মাজাহ, হাদীশ 1191 এ।
আল্লাহ ও তার রাসূলের প্রতি অপবাদের শাস্তি।
33:57 নং আয়াহ : নিশ্চয়ই যারা কষ্ট দেয় (১) আল্লাহ ও তার রাসূলকে [58:5], তাদের জন্য তিনি লানত/ শাস্তি ঘোষণা দিয়েছেন, (তারা তা পাবে) ইহজীবনে ও পরবর্তী জীবনে [4:14, 8:13]। আর তিনি তাদের জন্য প্রস্তুত করে রাখবেন অপমাজনক আযাব/ শাস্তি।
১) আল্লাহকে কষ্ট দেওয়া যায়! আসলে এটা আরবি বাক রীতি, প্রবাদ জাতীয় কথা। যার অর্থ- অপবাদ দেওয়া। প্রমাণের জন্য দেখুন 33:69 আয়াহ। মানে, নিশ্চয়ই যারা আল্লাহ তার রাসূলের উপর অপবাদ দেয়…। দেখুন 48:6 আয়াহ।
মূমীন নারী ও পুরুষের উপর অপবাদের শাস্তি।
33:58 নং আয়াহ : আর যারা কষ্ট দেয় মূমীন/ সত্য স্বীকারকারী পুরুষ ও মূমীন/ সত্য স্বীকারকারী নারীদেরকে কোনও অর্জন/ অপরাধ ছাড়াই [24:11-13], তাহলে অবশ্যই তারা বহন করবে অপবাদের ও সুস্পষ্ট পাপের বোঝা।
ছাতির উপর ‛বাড়তি কাপড়/ ওড়না’ দেওয়া।
33:59 নং আয়াহ : হে সম্মানিত নাবী, আপনার স্ত্রীদের, কন্যাদের ও মূমীন/ সত্য স্বীকারকারী নারীদেরকে বলুন- “তারা যেন তাদের (ছাতির) উপর তাদের জিলবাব/ ওড়নার কিছু অংশ (১) টেনে নেয়”। ওটা তাদের পরিচয় পাওয়ার (২) অধিক নিকটবর্তী। ফলে তাদেরকে কষ্ট দেওয়া হবে না (৩)। আর আল্লাহ গাফূর/ ক্ষমাশীল ও রাহীম/ করুণাময়।
১) অর্থাৎ মাথা ঢাকার জিলবাব/ ওড়নার কিছু অংশ তাদের ছাতির উপর টেনে নেয়। মাথা ঢাকা কি জরুরি?? না। তবে সেই যুগে মাথা ঢাকা হোত, নয়ত চুলের ভিতরে বালি ঢুকে যেত। তাই তারা মাথা ঢাকতেন, মাথা ঢাকার কাপড়ের কিছু অংশ ছাতির উপর টেনে নিতে বলা হয়েছে। মানে, এখানে নির্দেশ শুধু ‛ছাতির উপর বাড়তি’ ওড়না দেওয়া।
২) মুখমণ্ডল ঢাকা যাবে না। ঢাকলে তাদেরকে আর চেনা যাবে না, যা সরাসরি 49:13 বিরোধী। যেখানে পরিষ্কার ভাবে আল্লাহ বলেছেন- “যেন তোমরা একে অপরকে চিনতে পার”।
৩) ‛কষ্ট দেওয়া হবে না’ বলতে কি?? সেই যুগে অসতী ও যৌন পেশাদার নারীরা ছাতির উপর ওড়না ব্যবহার করত না। তাই এখানে মূমীন নারীদের ছাতির উপর ওড়না দিতে বলা হচ্ছে। যাতে তাদেরকে সহজে চেনা যায় যে, এরা অসতী ও যৌন পেশাদার নারী নয়। আর যেন মূমীন নারীদেরকে কেউ যৌন পেশাদার ভেবে কেউ বিরক্ত না করে।
তবে তারমানে, এই নয় যে, বোরখা, হিজাব ও নিকাব। এক সময়ে ও এখনও ’খৃষ্টান নান’রা বোরখা পরত/ এখনও পরে। সুতরাং বোরখা হিজাব ও নিকাব ইসলামী পোষাক নয়। এগুলো খৃষ্টান ধর্মীয় পোষাক। চাইলে গুগলে গিয়ে ‛খৃষ্টান নান’ লিখে সার্চ দিয়ে দেখে নিন।
যে অপরাধ গুলোর শাস্তি বিতাড়িত/ হত্যা।
33:60 নং আয়াহ : মুনাফিক (১), যাদের মস্তিষ্কে সমূহে রোগ আছে (২) ও মাদীনাহর প্রোপাগান্ডাকারী (৩) যদি বিরত না হয়, (যদি তারা এভাবেই রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে গুজব রটাতে থাকে) তাহলে আমরা আপনাকে (নাবীকে) তাদের বিরুদ্ধে ক্ষমতা প্রদান করব। তারপর তারা আপনার প্রতিবেশী হয়ে তাতে (মদীনায়) অল্প কিছু সময়ই থাকতে পারবে,
১) এরা মুসলিম কিন্তু ইসলামের কিছু স্বীকার, কিছু অস্বীকার করে। যেমন, তারা যাকাত/ ট্যাক্স দিতে অস্বীকার করত (33:1)।
২) এরা গোপনে ইসলাম অস্বীকারকারী। মুসলিমদের যুদ্ধে যেত লাভ দেখতে পেলে, লাভ না দেখলে ফিরে আসত। মাঝে মধ্যে মুসলিমদের সঙ্গে মুসলিমদের মতো। অমুসলিমদের সঙ্গে তাদের মতো। এমনকি ইসলাম বিরোধী কাজেও যুক্ত থাকত (2:10, 33:12)। আধুনিক পরিভাষায় বললে হবে ‛দেশদ্রোহী সৈনিক’।
৩) এরা কারা?? মুসলিমই ছিল, খানিকটা মুনাফিক গোছের। এরা প্রমাণ ছাড়া ‛প্রোপাগান্ডা’ চালিয়ে সত্যকে মিথ্যা, মিথ্যাকে সত্য প্রমাণ করতে চাইত। যেমন, তারা আইশাহ (রা) এর নামে প্রোপাগান্ডা (24:11-13) চালিয়ে ছিল। মানে, 2014 পর থেকে ভারতীয় মিডিয়া (সবাই নয়) যা করে চলেছে।
33:61 নং আয়াহ : অভিশপ্ত হয়ে। তাদেরকে যেখানেই পাওয়া যাবে, ধরা হবে এবং তাদেরকে হত্যা করা হবে।
আল্লাহর সুন্নাত/ রীতি অপরিবর্তনীয়।
33:62 নং আয়াহ : এটাই আল্লাহর সুন্নাত/ রীতি, যারা অতীত হয়েছে, তাদের ক্ষেত্রেও ছিল (এই রীতি)। আর আপনি আল্লাহর সুন্নাত/ রীতিতে কোনও পরিবর্তন পাবেন না।
কিয়ামত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করায় নাবী (সা) এর জবাব।
33:63 নং আয়াহ : মানুষরা কি আপনাকে কিয়ামত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করছে?? বলুন- “এই সম্পর্কিত জ্ঞান আল্লাহর কাছেই রয়েছে” [20:15, 7:187-188]। আপনি (নাবী) কিভাবে জানবেন, হয়ত কিয়ামত [43:61, 43:85] নিকটে!
‛মাদীনাহ সনদ’ অস্বীকারকারীদের পরকালীন শাস্তি।
33:64 নং আয়াহ : নিশ্চয়ই আল্লাহ কাফির (মাদীনাহ সনদ [33:1] অস্বীকারকারীদের) লনত/ শাস্তি ঘোষনা করেন। আর (তা এই) তাদের জন্য প্রস্তুত করে রাখবেন জলন্ত আগুন।
33:65 নং আয়াহ : তারা তাতে থাকবে অনন্তকাল। তারা না পাবে ওলী/ অভিভাবক [41:31], আর না পাবে সাহায্যকারী [4:45]।
আল্লাহ ও রাসূলের অনুসরণ না করার আফসোস।
33:66 নং আয়াহ : যেদিন তাদের মুখমণ্ডলকে আগুনে ওলটপালট করা হবে, তারা বলবে- “হায়! যদি আমরা অনুসরণ করতাম আল্লাহর, অনুসরণ [4:59, 47:33] করতাম রাসূলের” [25:27, 67:10]।
সাধারণ মানুষকে ‛দুই ধরনের মানুষ’ পথভ্রষ্ট করে।
33:67 নং আয়াহ : আর আরও বলবে- “হে আমাদের রব/ প্রভু, নিশ্চয়ই আমরা অনুসরণ করেছি আমাদের নেতাদের ও প্রধান/ বিশিষ্ট ব্যক্তিদের [40:47, 37:28]। সুতরাং তারা আমাদেরকে পথভ্রষ্ট [34:31, 37:28] করেছিল [34:33]।
সাধারণ পথভ্রষ্টরা ‛নেতা ও বিশিষ্টদের’ জন্য শাস্তি চাইবে।
33:68 নং আয়াহ : হে আমাদের প্রভু, তাদেরকে দ্বিগুণ শাস্তি দিন। আর তাদেরকে বড় লানত/ শাস্তি দ্বারা লানত/ শাস্তি (১) দিন [7:38]।
১) তবে সাধারণ মানুষরা আল্লাহর কাছে আরও একটি বিশেষ আবেদন করবে, তা এখানে নেই। তা রয়েছে 41:29 এ। যান, দেখে আসুন।
# এখানে নেতা ও বিশিষ্টরা জবাবে কী বলবে, তা এখানে উল্লেখ নেই। তবে, 37:29-32 ও 34:32 এ উল্লেখ রয়েছে। যান, দেখে আসুন। বেশ মজা লাগবে।
মূসা (আ) এর উপর ‛শারীরিক ত্রুটির’ অপবাদ।
33:69 নং আয়াহ : হে সম্মানিত আমানূ/ সত্য গ্ৰহণ করা মানুষজন, তোমরা হইও না তাদের মতো, যারা কষ্ট [33:57] দিয়েছিল মূসাকে। অতঃপর আল্লাহ তাকে নির্দোষ প্রমাণ করলেন (১)। যা তারা বলেছিল, সেই সম্পর্কে। আর তিনি (মূসা) ছিলেন আল্লাহর কাছে দোষহীন।
১) ঘটনাটা কি?? ঘটনাটা রয়েছে বুখারীর 278 ও 3404 নং হাদীশে। গিয়ে দেখে নিন।
‛তাকওয়া ও ন্যায্য কথা’র প্রতিদান ও সাফল্য।
33:70 নং আয়াহ : হে ইমান/ সত্য গ্ৰহণ করা সম্মানিত মানুষজন, আল্লাহর জন্য তাকওয়া (অপকর্ম থেকে দূরত্ব) অবলম্বন কর [39:33] এবং উচিৎ/ ন্যায্য কথা বল।
33:71 নং আয়াহ : তিনি সংশোধন করবেন তোমাদের আমল/ কর্ম সমূহকে [25:70], ক্ষমা করবেন তোমাদের যুনূব/ পাপ সমূহকে। আর যে অনুসরণ করল আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের [62:2], সে অবশ্যই সফল [91:9, 87:14] হল। যদিও ওটাই মহা সাফল্য।
মানুষ অকল্পনীয় মর্যাদার যোগ্য।
33:72 নং আয়াহ : নিশ্চয়ই আমরা আর্জ (পেশ/ প্রস্তাব) করেছিলাম সামাওয়াত/ মহাবিশ্ব সমূহ, আরদ্ব/ গ্ৰহ উপগ্রহ সমূহ ও জিবাল/ পর্বতমালা গুলোর কাছে যে, এই আমানত (আল্লাহর প্রতিনিধিত্ব) বহন করে। কিন্তু তারা ভয় পেল, অপারগতা প্রকাশ করল। তবে মানুষ তা [2:30, 35:39] বহন করার যোগ্য [6:165, 27:62]। তবে নিশ্চিতরূপে সে জালিম/ অবিচারী ও জাহিল/ মূর্খ (১)।
১) অর্থাৎ মানুষ আল্লাহর প্রতিনিধিত্ব না করে সৃষ্টির প্রতি অন্যায় ও অবিচার করে বেড়াচ্ছে, কেননা মানুষ মূর্খ। অথচ তার মর্যাদা সমস্ত মহাবিশ্ব গুলোর চেয়েও অনেক বেশি।
মূমীনরা ক্ষমা পাবেন, কিন্তু কেন??
33:73 নং আয়াহ : (এ দায়িত্ব না পালনের) জন্য আল্লাহ আযাব/ শাস্তি দেবেন মুনাফিক পুরুষদেরকে ও মুনাফিক নারীদেরকছ, মুশরিক পুরুষদেরকে ও মুশরিক নারীদেরকে [84:6]। আর (দায়িত্ব পালনের জন্য) ক্ষমা করবেন মূমীন পুরুষদের ও মূমীন নারীদের (১)। আল্লাহ হলেন গাফূর/ ক্ষমাশীল, রাহীম/ করুণাময়।
১) বর্তমানের মূমীন পুরুষ ও নারীরা এ পালন তো দূরের কথা, এই দায়িত্ব সম্পর্কে জানেও না, তারা কি ক্ষমা পাবে?? সহজ উত্তর- না।