
হোসেন কুরানী’র জীবনে দ্বিতীয় অলৌকিক ঘটনা।
হোসেন কুরানী’র জীবনে দ্বিতীয় অলৌকিক ঘটনা ঘটে তখন, যখন তার বয়স 20 মাস। দাদুর বাড়ি পুড়ে ছাই হয়ে যাওয়ার পর হোসেন কুরানী মায়ের সঙ্গে নানার বাড়ি চলে যান। বছর খানেক থাকার পর একদিন হোসেন কুরানী বিষপান করে ফেলেন। ঠিকই শুনছেন, হোসেন কুরানী বিষপান করে ফেলেন।
তখন হোসেন কুরানী’র দুই মামা সাধারণ কাজকর্ম করার সঙ্গে সঙ্গে চাষবাসও করতেন। তাই বাড়িতে চাষের বিষও থাকতো। শিশু হোসেন কুরানী বিষের বোতল খুলে মুখে দিয়ে ফেলেন। দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই মুখের ভিতর জ্বলা শুরু হয়ে যায়। হোসেন কুরানী বোতল হাতে নিয়ে কাঁদতে শুরু করেন। কাঁদতে কাঁদতে তার মায়ের কাছে আসেন।
হোসেন কুরানী’র মা বুঝে যান যে, হোসেন কুরানী বিষ মুখে দিয়েছেন। হোসেন কুরানী’র মা ভয়ে কান্না শুরু করে দেন যে, “6-7 বছর পর ছেলে হয়েছে। এতদিন ছেলে হয় নি বলে পাড়া প্রতিবেশীদের কটাক্ষ শুনতে হয়েছে, স্বামীর থেকে মারধোর খেতে হয়েছে, আর হয়ত আমার ছেলে বাঁচবে না”।
হোসেন কুরানী’র মায়ের কান্না শুনে হোসেন কুরানী’র নানী সহ দুই মামিও কান্না শুরু করে দেন। বাড়ির কান্নার রোল শুনে আশেপাশের সবাই ছুটে আসে। ততক্ষণে হোসেন কুরানী হাঁটাচলা করতে অপারগ হয়ে পড়েন এবং কাঁদতে কাঁদতে অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার মতো অবস্থা। সবাই পরামর্শ দেন যে, “যে বিষ (পটাশিয়াম) খেয়েছে, তা খেয়ে কেউ আজ পর্যন্ত বাঁচে নি। তোমাদের বাচ্ছাও বাঁচবে না। হসপিটালে ভর্তি করো না। হসপিটালে মৃত্যু হলে পোষ্টমর্টেম করা হবে। এই তো 2 বছরের বাচ্ছা! মরলে বাড়িতে মরুক লুকিয়ে কবর দিয়ে দেব”।
ততক্ষণে হোসেন কুরানী ছটকানো শুরু করে দিয়েছেন। সঙ্গে আবার শরীর নীল হতে শুরু হয়েছে। হোসেন কুরানী’র মা এত জোরে জোরে কাঁদছিলেন যে, পাশের পাড়ার সবাই ছুটে এসেছে। পাশের গ্ৰামের আত্মীয় স্বজন রাও খবর পেয়ে ছুটে এসেছেন। সবাই একটাই কথা বলছিল তখন- “সাবেরার ভাগ্য খারাপ। প্রথম ছেলে 3 মাস বয়সে মারা গেল, তার 6-7 বছর পর যদি আবার ছেলে হল, সেও মারা যাবে গো”।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে গ্ৰামের সবাই শুধু কাঁদছে এবং আফসোস করছে। এদিকে তখন হোসেন কুরানী’র কান্নাও বন্ধ হয়ে গেছে। সবাই ভাবছে- “এবার হয়ত বাচ্ছাটা মারা যাবে”। ততক্ষণে হোসেন কুরানী’র মা অজ্ঞান হয়ে গেছেন। তখন সবাই বলাবলি করছে- “এই বাচ্ছার জন্য বেচারী স্বামীর থেকে কত মারধোর খেয়েছে, আল্লাহ তুমি সাবেরাকে ধৈর্য্য দাও। যেন এই বিপদ সহ্য করতে পারে”। ততক্ষণে হোসেন কুরানী’র মুখ থেকে বিষের লালা বের হতে শুরু হয়ে গেছে।
এবার হয়ত হোসেন কুরানী মারা যাবেন। প্রায় 2-3 ঘন্টা অতিবাহিত হয়েছে। হোসেন কুরানী’কে শুইয়ে রাখা হয়েছে। এ যেন মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা চলছে। কিন্তু দাঁড়ান, এখন আল্লাহর সাহায্য আসা বাকি আছে। কুরআনে আল্লাহ বলেছেন- “আল্লাহর সাহায্য নিকটেই” (2:214)।
পাশ থেকে কেউ একজন বলে উঠল- “বাচ্ছাটা নড়ছে, শরীর নীল হয়ে গিয়েছিল, আবার ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে যাচ্ছে। এক কাজ করা যাক, লক্ষণপুর বাজারে ডাক্তার ‛অরবিন্দ চক্রবর্তী’ বসেন। একবার নিয়ে যাওয়া হোক। তারপর দেখি কি হয়”।
আসলে সবাই চাইছিল- “বেশি লোকজন জানাজানি না হয়। কেননা, তাহলেই পোষ্টমর্টেম করতে হবে”। তবুও ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। ডাক্তার দেখে বলেন- “কতক্ষণ হল বিষ খেয়েছে”?? সবাই বলেন- “2-3 ঘন্টা মতো”। ডাক্তার বলেন- “এতক্ষণে তো বড় মানুষও মারা যায়, এই টুকু বাচ্ছা এখনও বেঁচে আছে কিভাবে! আর শরীর নীল হয় নি কেন”??
সবাই বলেন- “ডাক্তার বাবু নীল হয়েছিল, কিন্তু আবার স্বাভাবিক হয়ে গেছে”। ডাক্তার বলেন- “কি বলছেন এসব, এমন কি হয় নাকি! এটা অসম্ভব”! সবাই বলেন- “ডাক্তার বাবু সত্যিই বলছি, নীল হওয়ার পর স্বাভাবিক হয়ে গেছে”। ডাক্তার বলেন- “এতক্ষণ নিয়ে আসো নি কেন বা হসপিটালে নিয়ে যাওনি কেন”?? সবাই বলেন- “আমরা ভেবেছিলাম যে, কিছুক্ষণের মধ্যেই তো মারা যাবে। হসপিটালে নিয়ে গেলে পোষ্টমর্টেম করা হবে। আর আমরা চাইছিলাম যে, বাড়িতেই মরুক। কমপক্ষে পোষ্টমর্টেম তো করতে হব না! ঐ জন্য”।
ডাক্তার বমি হওয়ার একটা ওষুধ দেন। বলেন- “যদি জ্ঞান ফিরে আসে, তাহলে এই ওষুধটা খাইয়ে দেবে। যদি ভগবান চান, তাহলেই এই বাচ্ছার বাঁচা সম্ভব, নয়ত পৃথিবীর কেউ বাঁচাতে পারবে না”। বাড়িতে নিয়ে আসা হয়, কিছুক্ষণ পর হোসেন কুরানী জোরে দমকা শ্বাস নেন।
বাড়িতে খুশির জোয়ার আসে, সবাই খুশিতে আবারও কান্না শুরু করেন। ততক্ষণে হোসেন কুরানী’র মায়েরও জ্ঞান ফিরে আসে। উঠেই বলেন- “আমার ছেলে কোথায়, আমার ছেলে কোথায়, আমার ছেলে বেঁচে আছে তো”! সবাই বলেন- “বাচ্ছার জ্ঞান ফিরে এসেছে, ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। ডাক্তার বমির ওষুধ দিয়েছে।খাওয়ানোও হয়েছে, মনে হয় বেঁচে যাবে”।
হোসেন কুরানী’র দৌড়ে গিয়ে হোসেন কুরানী’কে কোলে তুলে নেন। বলতে থাকে- “কি হয়েছে আমার বাচ্ছার, কি হয়েছে আমার সোনার, আমার সাত রাজার ধোনের কি হয়েছে”! হোসেন কুরানী বমি করা শুরু করে। বিষ বেরিয়ে আসতে শুরু হয়। হোসেন কুরানী আবারও কান্না শুরু করেন। সবাই বলতে থাকে- “আর চিন্তা নেই, আর কিছু হবে না। যা হওয়ার ছিল, তা হয়ে গেছে”।
সবাই অবাক হয়ে বলাবলি করা শুরু করেন- কিভাবে এটা সম্ভব হল! যে বিষ খেলে বড় মানুষরা এতক্ষণে মারা যায়, সেখানে বিষ কিভাবে উল্টো কাজ করছে! তারপর সবাই পরামর্শ দেন- “যে মাজারে গিয়ে বাচ্চা হয়েছিল, সেই মাজারে আবারও যাও। গিয়ে মোরগ সাদকা করো”। পরে হোসেন কুরানী’র মা হাওড়া জেলার আমতায় অবস্থিত ‛মাদার শাহ’ বাবার দরবারে গিয়েছিলেন।
পরে যখন হোসেন কুরানী বড় হয়ে বলেন- মাজারে যাওয়া শিরক, তখন হোসেন কুরানী’র তাওবাও করেছিলেন। ওরা জানে না, মাদার শাহ বাবা নয়, হোসেন কুরানী বিষ পান করার পরও তিনিই বাঁচিয়েছেন, যিনি নাবী মুহাম্মাদ (সা) কে খায়বারে বিষ পান করার পরও বাঁচিয়েছিলেন। তিনি আর কেউ নন, তিনি আল্লাহ!