বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম।
অর্থ- আল্লাহর নাম নিয়ে পড়া শুরু করছি, যিনি সীমাহীন দয়ালু এবং সীমাহীন করুণাময়।
নাযিল : মাদীনাহ, আয়াত : 129 টি।
মুশরিকদের সঙ্গে কৃত সন্ধি ভঙ্গের ঘোষণা দেওয়া হল।
9:1 নং আয়াহ : আল্লাহ, তার রাসূলের পক্ষ থেকে (মাক্কাহর) মুশরিকদের সঙ্গে সন্ধি ভঙ্গের ঘোষণা করলেন, যাদের সঙ্গে তোমরা (হুদাইবিয়াহর ও অন্যান্য) সন্ধিতে আবদ্ধ ছিলে [8:58]।
# আসলে ঘটনা হচ্ছে এরকম। নাবী (সা) ও মাক্কাহর মুশরিক গোত্র গুলোর সঙ্গে একটি সন্ধি হয়, যা ‛হুদাইবিয়াহর সন্ধি’ নামে পরিচিত। এই সন্ধি ছাড়াও আরও কিছু সন্ধি হয়। কিন্তু মুশরিকদের পক্ষ থেকে বনু বকর ইবনে ওয়াইলের গোত্রের শাখা ‛দীল গোত্র’ এই সন্ধি ভঙ্গ করে। দেখুন 9:7 আয়াহ। তাই আল্লাহ ঘোষণা করে দিলেন- “যেহেতু তারা মৌলিক সন্ধি ‛হুদাইবিয়াহর সন্ধি’ ভঙ্গ করেছে। তাই সাধারণ সন্ধি গুলোর কোনও অর্থ হয় না”। কেননা, হুদাইবিয়াহর সন্ধির উপর নির্ভর করে বাকি সন্ধি গুলো হয়েছিল। তাই এখানে অন্যান্য সন্ধি ভঙ্গের ঘোষণা দেওয়া হল (সীরাত ইবনে হিশাম, পৃষ্ঠা 899-900, মিনা বুক হাউস, বাংলাদেশ)।
মাক্কাহর মুশরিকরা হুদাইবিয়াহর সন্ধি ভঙ্গ করে।
9:2 নং আয়াহ : এতএব তোমরা (সন্ধি ভঙ্গকারীরা), ভূখণ্ডে (মক্কায় সন্ধি ভঙ্গ করে) চারমাস ঘুরে নাও [8:57]। জেনে রেখ, তোমরা কোনও ভাবেই আল্লাহকে হারিয়ে দিতে পারবে না। আর নিশ্চয়ই আল্লাহ কাফির/ ‛সন্ধি অস্বীকারকারীদের’ লাঞ্চিত করবেন।
মুশরিকদেরকে ‛সন্ধি’ মেনে চলার আহ্বান জানান হচ্ছে।
9:3 নং আয়াহ : আর ‛বড় হজের দিন’ (১) আল্লাহ, তার রাসূলের পক্ষ থেকে (মাক্কাহর) জনসাধারণের প্রতি ঘোষণা যে, আল্লাহ মুশরিকদের থেকে দায়মুক্ত, তার রাসূলও (২)। এতএব যদি তোমরা (চুক্তি ভঙ্গের ভুল) সংশোধন করে নাও, তবে তা তোমাদের জন্য উত্তম। আর যদি তোমরা (এই আহ্বান থেকে) ফিরে যাও, তাহলে তোমরা আল্লাহকে কোনও ভাবেই হারিয়ে দিতে পারবে না [8:59]। এবং তাদেরকে কষ্টদায়ক শাস্তির সুসংবাদ দিন, যারা সন্ধি অস্বীকার করেছে।
১) ‛বড় হজ্বের দিন’ বলতে?? এটাকে আরবিতে ‛হজ্বে আকবার’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। যে হজ্ব, কুরবানীর ঈদের দিন হয়, ওটাকে ‛হজ্বে আকবার’ বলা হয়। এখানে যে হজ্বের কথা বলা হচ্ছে, তা নাবী (সা) আবু বকর (রা) কে নেতৃত্ব দিয়ে হজ্বে প্রেরণ করেছিলেন।
২) কেননা, মুসলিম পক্ষ তো সন্ধি ভঙ্গ করে নি। তারাই সন্ধি ভঙ্গ করেছে। তাই এর ‛প্রতিক্রিয়ার’ দায় আল্লাহ ও তার রাসূলের নয়।
যারা সন্ধি ভঙ্গ করে নি, তাদের উপর আক্রমণ নয়।
9:4 নং আয়াহ : তবে মুশরিকদের মধ্যে যাদের সঙ্গে তোমরা সন্ধিতে আবদ্ধ আছ এবং যারা সন্ধি পূর্ণ করতে কোনও ত্রুটি করে নি এবং যারা তোমাদের বিরুদ্ধে (মাদীনাহর এবং মাদীনাহর বাইরের শত্রুদের) কাউকে সাহায্য করে নি, তাদের সঙ্গে সন্ধির মেয়াদ পূর্ণ করবে। নিশ্চয়ই আল্লাহ তাদেরকে ভালোবাসেন, যারা তাকওয়া (অপকর্ম থেকে দূরত্ব) অবলম্বন করে।
‛সন্ধি ভঙ্গকারী’ মুশরিকদেরকে হত্যার নির্দেশ।
9:5 নং আয়াহ : অতঃপর হারাম [9:36, 2:217] মাস সমূহ অতিবাহিত হলে, যেখানে (হুদাইবিয়াহর সন্ধি ভঙ্গকারী) মুশরিকদের পাবে, সেখানেই তাদেরকে ধর এবং হত্যা কর [8:57]। তোমরা তাদেরকে অবরোধ কর, প্রত্যেক ঘাঁটিতে ঘাঁটিতে তাদের জন্য অপেক্ষা কর [9:7]। অতঃপর যদি তারা তাওবা (তাদের ভুল সংশোধন) করে, স্বালাত (সন্ধির শর্ত/ ধারা প্রতিষ্ঠা) করে এবং তারা যাকাত (পরিশুদ্ধতার গ্যারান্টি) প্রদান করে, তাদেরকে তাদের রাস্তায় ছেড়ে দাও। নিশ্চয়ই আল্লাহ ক্ষমাশীল ও করুণাময়।
যুদ্ধ চলাকালীন সাধারণ মুশরিককে ‛রক্ষা করার’ নির্দেশ।
9:6 নং আয়াহ : কিন্তু (যুদ্ধ চলাকালীন সাধারণ) মুশরিকদের মধ্যে কেউ আপনার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করে, তাকে আশ্রয় দিন [5:32]। যেন সে (বেঁচে থেকে) আল্লাহর কালাম/ বাণী শুনতে পায়। (তাকে শুধু আশ্রয়ই নয়) তারপর তাকে নিরাপদ স্থানে পৌঁছে দিন। এটা এজন্য যে, তারা ‛না জানা’ সম্প্রদায় (১)।
১) তাই এরা সন্ধি ভঙ্গ করেছে, নয়ত সন্ধি ভঙ্গ করার মতো মারাত্মক অপরাধ এরা করত না। উক্ত আয়াহ এও বলতে চাইছে যে, এরা নেতাদের কথায় সন্ধি ভঙ্গ করেছে, সুতরাং সাধারণ মুশরিককে নেতাদের মতো অপরাধী গণ্য কর না।
শুধু ‛দীল গোত্রকে’ আক্রমণ করতে বলা হচ্ছে।
9:7 নং আয়াহ : আল্লাহ ও তার রাসূলের মুশরিকদের সঙ্গে কৃত সন্ধি কিভাবে বহাল থাকবে?? তবে যাদের (কুরাঈশদের) সঙ্গে তোমরা মাসজিদে হারামের কাছে (হুদাইবিয়াহর) সন্ধি করেছ, তাদের (কুরাইশদের) ব্যাপারটা ভিন্ন (১)। যতক্ষণ তারা তোমাদের (সন্ধির উপর) বহাল থাকে, ততক্ষণ তোমরাও তাদের সঙ্গে বহাল থাক [2:191]। নিশ্চয়ই আল্লাহ তাদেরকে ভালোবাসেন, যারা মুত্তাকী বা তাকওয়া (অপকর্ম থেকে দূরত্ব) অবলম্বনকারী।
১) মানে, হুদাইবিয়াহর সন্ধিতে কুরাঈশদের সঙ্গে দীল গোত্র শামিল হয়েছিল। আর দীল গোত্রই সন্ধি ভঙ্গ করে। তাই এখানে বলা হচ্ছে- “কুরাঈশদের উপর আক্রমণ না করা হয়। কারণ, তারা সন্ধি ভঙ্গ করে নি”। অর্থাৎ এখানে আক্রমণ করতে বলা হচ্ছে শুধু ‛দীল গোত্রের’ উপর।
# প্রশ্ন হবে- কুরাইশরা মুসলিমদের শত্রুতা করত, কিন্তু দীল গোত্র সন্ধি ভঙ্গ করল কেন?? আসলে কুরাইশরা হুনাইন যুদ্ধে হেরে বুঝতে পেরে গিয়েছিল যে, মুসলিমদেরকে হারান আর কোনও দিনও সম্ভব হবে না। কিন্তু দীল গোত্র তারপরও চাইত যে, মুসলিমদেরকে যে কোনও ভাবে ‛ইসলাম’ থেকে ফিরিয়ে আনব আমাদের বাপদাদাদের ধর্মে। কমপক্ষে তারা মাক্কাহর মুসলিমদের ফিরিয়ে আনতে চাইত। যেমন, বর্তমানে ভারতে হিন্দুত্ববাদী সংগঠন গুলো মনে করে। যাইহোক, এদের সম্পর্কে 4:88-90 এ কথা বলা হয়েছে। আর 2:190-194 এও এদের সম্পর্কে কথা বলা হয়েছে।