বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম।
অর্থ- আল্লাহর নাম নিয়ে পড়া শুরু করছি, যিনি সীমাহীন দয়ালু এবং সীমাহীন করুণাময়।
নাযিল : মাদীনাহ, আয়াত : 38 টি।
সৎকর্ম ধ্বংস করার উপায়।
47:1 নং আয়াহ : যারা কাফির/ হুদাইবিয়ার সন্ধি অস্বীকার করেছে ও মানুষকে আল্লাহর পথে চলতে বাধা দেয়, আল্লাহ তাদের আমল/ অসৎকর্ম সমূহ ধ্বংস করে দেবেন।
# মুসলিম পক্ষ ও মাক্কাহর মুশরিকদের মধ্যে একটা সন্ধি হয়েছিল, যা ‛হুদাইবিয়ার সন্ধি’ নামে পরিচিত। আর মাক্কাহর মুশরিকদের একটা অংশ সেই সন্ধি ভঙ্গ করে, এখানে তাদের সম্পর্কে কথা বলা হয়েছে।
পাপ/ অসৎকর্ম ধ্বংস করার উপায়।
47:2 নং আয়াহ : এবং যারা সত্য গ্ৰহণ করেছে, সৎকর্ম করেছে। আর তার সঙ্গে গ্ৰহণ করে সেই সত্য, যা তাদের প্রভুর পক্ষ থেকে মুহাম্মাদের প্রতি নাযিল করা হয়েছে। (আল্লাহ) তাদের পাপ গুলো ধ্বংস করে দেবেন [25:70]। আর তাদেরকে সফলতা প্রদান করবেন।
অসৎকর্ম ও সৎকর্ম ধ্বংস কেন করা হবে??
47:3 নং আয়াহ : ওটা (অসৎকর্ম ও সৎকর্ম ধ্বংস করা হবে) এজন্য যে, তারা সত্য অস্বীকার করেছে ও মিথ্যার অনুসরণ করেছে। আর নিশ্চয়ই যারা তাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে আগত সত্যের অনুসরণ করেছে। এভাবেই আল্লাহ মানবজাতির জন্য বিষয়বস্তুকে উদাহরণ দ্বারা বর্ণনা করেন।
যুদ্ধ বন্দী, বন্দীনিদের দাস-দাসী বানানো হারাম।
47:4 নং আয়াহ : অতঃপর যখন তোমরা কাফির/ হুদাইবিয়ার সন্ধি অস্বীকারকারীদের সঙ্গে যুদ্ধে [2:190, 4:90] লিপ্ত হবে [9:1-7], তখন তাদের (যুদ্ধে অংশ নেওয়া সৈনিকদের) ঘাড়ে আঘাত করবে। আর যখন তোমরা তাদেরকে সম্পূর্ণ ভাবে পরাজিত করবে, তখন (যুদ্ধে অংশ নেওয়া সৈনিকদের বন্দী ও বন্দীনি হিসাবে) শক্ত করে বেঁধে ফেলবে। তারপর তাদের দয়া দেখিয়ে ছেড়ে দিন, নয়ত মুক্তিপণ নিয়ে ছেড়ে দিন (তাদেরকে দাস দাসীতে পরিণত করা যাবে না, যা পূর্বে হোত)। অবশ্য যতক্ষণ পর্যন্ত তারা যুদ্ধে অস্ত্র রেখে রেখে দেয় (অর্থাৎ যুদ্ধ বন্ধ করে)। ওটাই বিধান। যদি আল্লাহ চাইতেন, তাহলে (তাদের থেকে) প্রতিশোধ নিতে পারতেন। কিন্তু তিনি তোমাদেরকে পরীক্ষা করেন একে অপরের মাধ্যমে। আর যারা আল্লাহর পথে নিহত হয়েছেন [2:154, 3:169], সেক্ষেত্রে তিনি কখনও তাদের আমল/ সৎকর্ম সমূহকে ধ্বংস করবেন না।
# মুক্তিপণ বহু ধরণের হতে পারে। যেমন A) বন্দী/ বন্দীনি বিনিময়। B) ধনসম্পদ। C) কোনও দাবি মানানো/ শর্তারোপ। তবে ইতিহাস সাক্ষী রয়েছে যে, নাবী (সা) 10 জন মূমীন/ মুসলীমকে পড়ালেখা শেখানোর বিনিময়েও বন্দী/ বন্দীনিদের মুক্তি দিয়েছেন।
# মানুষকে বিভিন্ন ভাবে দাসদাসী বানানো হোত, তারমধ্যে অন্যতম হল- যুদ্ধ বন্দী ও বন্দীনিদের দাসদাসী বানানো। যা এই আয়াহ বন্ধ করে দেয়। এছাড়াও সাধারণ মানুষকে দাসদাসী হিসাবে বিক্রি, সন্তানদের দাসদাসী হিসাবে বিক্রি, ঋণ পরিশোধ করতে না পারা অথবা ঋণ রেখে মারা গেলে মৃতের সন্তানদের দাসদাসী বানানো হোত। যদিও নাবী (সা) সমস্ত রাস্তা গুলোই বন্ধ করে দেন।
নাবী (সা) বলেছেন- “কোনও স্বাধীন মানুষকে দাসদাসী হিসাবে বিক্রি করা হারাম” (বুখারী, হাদীশ 2227)। আরও বলেছেন- “কেউ ঋণ রেখে মারা গেলে, তা যদি তার সন্তানরা পরিশোধ করতে অক্ষম হলে রাষ্ট্র তা পরিশোধ করবে” (বুখারী, হাদীশ 2398 ও 2399)। অর্থাৎ মানুষকে দাসদাসী বানানোর সব রাস্তা বন্ধ।
মুসলিমদের দ্বারা বিশ্ব শাসনের ভবিষ্যৎ বাণী।
47:5 নং আয়াহ : শীঘ্রই তিনি তাদের (মুসলিমদের) কে পথ দেখাবেন ও তাদেরকে সফলতা প্রদান করবেন।
# তৎকালীন পৃথিবী তথা এশিয়া আফ্রিকা ও ইউরোপের বিরাট বড় মুসলিমরা শাসন করা শুরু করেছিল।
মুসলিমদেরকে জান্নাতে প্রবেশ করানোর ভবিষ্যৎ বাণী।
47:6 নং আয়াহ : আর তিনি তাদেরকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন। এবং তার (জান্নাতের) বর্ণনা তিনি তাদেরকে জানিয়েছেন।
# এখানে মুসলিম বলতে নামধারী মুসলিমদের কথা বলা হচ্ছে না। বরং যারা কাজেকর্মে মুসলিম, তাদের কথা বলা হচ্ছে। যেমন 47:4 নং আয়াহতে যে বিধান দেওয়া হয়েছে, তা মেনে নেওয়া এবং দাসদাসী প্রথা উচ্ছেদ করা।
দীন/ ইসলাম প্রতিষ্ঠায় সাহায্য করা।
47:7 নং আয়াহ : হে আমানু/ সত্য গ্ৰহণ করা সম্মানিত মানুষজন, যদি তোমরা আল্লাহকে (১) সাহায্য কর, তাহলে তিনিও তোমাদেরকে সাহায্য করবেন। আর তোমাদের পা গুলোকে শক্ত (২) করবেন [22:40]।
১ এখানে আল্লাহকে সাহায্য বলতে- আল্লাহর দীন/ ইসলাম প্রতিষ্ঠায় সাহায্য। এমনিতে আল্লাহর সাহায্যের প্রয়োজন হয় না [112:2], তিনি অভাবমুক্ত (35:15)।
২ এটা আরবি বাক রীতি। যার অর্থ- তোমাদের অবস্থান/ শাসন শক্ত করা।
সত্য অস্বীকারের পরিণতি।
47:8 নং আয়াহ : যারা সত্য অস্বীকার করেছে, তাদের জন্য থাকবে শুধুই ধ্বংস। আর তাদের আমল/ সৎকর্ম সমূহ তিনি ধ্বংস করে দেবেন।
47:9 নং আয়াহ : ওটা এজন্য যে, নিশ্চয়ই তারা অপছন্দ করেছে তা, যা আল্লাহ নাযিল করেছেন। সুতরাং তিনি তাদের আমল/ সৎকর্ম সমূহ ধ্বংস করে দেবেন।
47:10 নং আয়াহ : তবে কি এরা পৃথিবীর ভিতরে কখনও প্রবেশ (১) করে নি?? করলে দেখতে পেত- কেমন হয়েছিল তাদের পরিণতি, যারা ছিল এদের পূর্বে। আল্লাহ তাদেরকে ধ্বংস করে দিয়েছেন। সত্য অস্বীকারকারীদের জন্য থাকবে তারই মতো পরিণতি।
(১) এটা আরবি বাক রীতি। যার অর্থ- তারা কি মাটি খুঁড়ে দেখে নি??
আল্লাহ মূমীনদের মাওলা, কাফিরদের কোনও মাওলা নেই।
47:11 নং আয়াহ : ওটা এজন্য যে, আল্লাহ হলেন তাদের মাওলা (অভিভাবক/ উপাস্য), যারা ইমান এনেছে। আর এজন্যও যে, সত্য অস্বীকারকারীদের কোনও মাওলা (অভিভাবক/ উপাস্য) নেই।
যা পাবে, তাই খাবে- এটা ছাগলের স্বভাব।
47:12 নং আয়াহ : নিশ্চয়ই আল্লাহ তাদেরকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন, যারা সত্য স্বীকার করেছে ও সৎকর্ম করে। যেখানে সুনিয়ন্ত্রিত ভাবে প্রবাহিত থাকবে নদনদী। যারা সত্য অস্বীকার করেছে, তারা ভোগ বিলাসে মত্ত। তারা খাচ্ছে সেভাবে, যেভাবে খায় ছাগল (যা পায়, তাই খায়)। তাদের বাসস্থান হবে আগুন (জাহান্নাম)।
নাবী (সা) কে মাক্কাহ থেকে বের করে দেওয়া হয়েছিল।
47:13 নং আয়াহ : কতশত শহর আমরা ধ্বংস করেছি, যারা শক্তিতে আপনার শহর (মাক্কাহর) চেয়েও অধিক উন্নত/ শক্তিশালী, যা থেকে আপনাকে বের করে দেওয়া হয়েছে [17:80]। অতঃপর তাদের কোনও সাহায্যকারী ছিল না।
# আল্লাহ 28:85 তে বলেছেন- “আল্লাহ অবশ্যই আপনাকে আপনার মাতৃভূমিতে (মাক্কাহ বিজয়ের মাধ্যমে) ফিরিয়ে আনবেন”।
নাবী (সা) নিজ খেয়াল খুশির অনুসরণ করতেন না।
47:14 নং আয়াহ : তবে কি, যে তার প্রতিপালকের পক্ষ থেকে আসা সুস্পষ্ট প্রমাণের উপর প্রতিষ্ঠিত [45:18], সে কি তার মতো, যার কাছে তার অসৎকর্ম গুলো শোভনীয় [43:36-37, 47:25] এবং তারা অনুসরণ করে তাদের খেয়াল খুশির [6:65, 42:15]??
# প্রশ্ন হবে- “খেয়াল খুশির অনুসরণে সমস্যা কোথায়”?? আসলে আমরা বুদ্ধিমান জীব। মস্তিষ্কে যা আসবে, তা করে জীবনকে এলোমেলো করার জন্য বুদ্ধি দেওয়া হয় নি?? যেহেতু বুদ্ধি দেওয়া হয়েছে, সেহেতু বুদ্ধির ব্যবহার করতে হবে (8:22)। বুদ্ধি এটাই বলে যে, জীবনকে সুশৃঙ্খল করতে হবে। আর আমরা কিভাবে সুশৃঙ্খল হবো, তা আমাদের স্রষ্টা আমাদের চেয়ে ভালো জানেন। তাই তার নিয়মনীতির মধ্যে দিয়ে জীবন সবচেয়ে বেশি সুশৃঙ্খল হতে পারে।
জান্নাতে পানির, দুধের, মদের ও মধুর নদী থাকবে।
47:15 নং আয়াহ : জান্নাতের স্বরূপ বর্ণনা করা হচ্ছে, যার ওয়াদা করা হয়েছে মুত্তাকী (অপকর্ম থেকে দূরত্ব অবলম্বন কারী) দের সঙ্গে। সেখানে থাকবে পানির নদনদী, যার রঙ ও গন্ধ অপরিবর্তনীয়। থাকবে দুধের নদনদী, যার স্বাদ অপরিবর্তনীয়। থাকবে মদের নদনদী, যা পানকারীদের জন্য সুস্বাদু [56:19]। থাকবে মধুর নদনদী, যা পরিশোধিত। সেখানে তাদের জন্য থাকবে সমস্ত ধরণের ফলমূল। আর তাদের প্রভুর পক্ষ থেকে ক্ষমা। (এই সবের অধিকারী কি) তার মতো, যে অনন্তকাল স্থায়ী হবে আগুনে (জাহান্নামে) ও যাদেরকে পান করানো হবে প্লাজমা, যা তাদের নাড়িভুঁড়ি ছিন্নভিন্ন করে দেবে??
শুনেও না শোনার ভান এবং খেয়াল খুশির অনুসরণ করা হারাম।
47:16 নং আয়াহ : আর তাদের মধ্যে কেউ কেউ এমন আছে যে, আপনার কথা শোনে। যখন আপনার কাছ থেকে চলে যায়, তখন যাদেরকে জ্ঞান দেওয়া হয়েছিল, তাদেরকে বলে- “এইমাত্র (নাবী) কি বলল”?? ওরাই তারা, যাদের মস্তিষ্ক সমূহে আল্লাহ মোহর মেরে দিয়েছেন। আর তারা খেয়াল খুশির [6:65, 45:18] অনুসরণ করে।
# অর্থাৎ তারা শুনেও, না শোনার ভান করত। সেই জন্য আল্লাহ তাদের মস্তিষ্ক সমূহে মোহর মেরে দেন। তাহলে কি করা উচিৎ?? 39:18 তে চলে যান।
সৎপথে চলতে চাইলে, আল্লাহ তার সৎপথে চলার শক্তি বৃদ্ধি করেন।
47:17 নং আয়াহ : আর যারা সৎপথে চলতে চায় [17:15], (তিনি) তাদেরকে সৎপথে চলার শক্তি [19:76] বাড়িয়ে দেন [13:27, 42:13]। এবং তাদেরকে তাদের তাকওয়া (অপকর্ম থেকে দূরত্ব অবলম্বনের শক্তি) প্রদান করেন।
# খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি হাদীশ। নাবী (সা) বলেছেন যে, আল্লাহ বলেন- “যদি আমার দিকে এক বিঘত এগিয়ে আসে, আমি তার দিকে এক হাত এগিয়ে যাই” (তিরমিযী, হাদীশ 3603)।
নাবী (সা) নিজেই কিয়ামতের লক্ষণ।
47:18 নং আয়াহ : তবে কি তারা তাদের কাছে হঠাৎ কিয়ামত আসার জন্য অপেক্ষা [43:66] করছে?? অবশ্যই তার লক্ষণ সমূহ এসে গেছে। সুতরাং যখন তাদের কাছে কিয়ামত দিবস আসবে, তখন কিভাবে তাদের দ্বারা (এই) সংবিধান/ কুরআন গ্ৰহণ সম্ভব হবে??
# ‛কিয়ামতের লক্ষণ সমূহ’ বলতে?? এই সম্পর্কে নাবী (সা) বলেছেন- “আমি এবং কিয়ামত একসাথে প্রেরিত হয়েছি” (বুখারী, হাদীশ 4936)। নাবী (সা) এও বলেন- “আমার মৃত্যুও কিয়ামতের লক্ষণের অন্তর্ভুক্ত”(বুখারী, হাদীশ 3176)।
নাবী (সা) মানবিক ভুলত্রুটি করতেন।
47:19 নং আয়াহ : আর আপনি জেনে নিন যে, আয়াহ ছাড়া কোনও ঈশ্বর/ উপাস্য নেই [21:22, 23:91]। তাই নিজের ভুল ত্রুটির জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করুন [49:55, 48:2], আর মূমীন পুরুষ ও মূমীন নারীদের জন্যেও [110:3]। আর আল্লাহ জানেন- তোমাদের গতিবিধি ও তোমাদের অবস্থান সম্পর্কে।
# নাবী কি ভুলত্রুটি করতেন?? করতেন। চলুন, বুখারীর 401 হাদীশে একটি বক্তব্য রয়েছে। যেখানে বলা পরিষ্কার ভাষায় হচ্ছে- নাবী (সা) নামাজের রাকাত সংখ্যায় ভুল করেছেন। তারপর তাকে ভুলটা ধরিয়ে দেওয়ার পর তিনি বললেন- “আমি তোমাদের মতোই মানুষ, আমারও ভুলত্রুটি হয়”। শুধু এইটুকু নয়, এছাড়াও তিনি আরও অনেক ভুল করেছেন। সমস্ত হাদীশ গুলো আনার প্রয়োজন নেই। তার ভুলত্রুটি বের করা আমাদের উদেশ্য নয়। পবিত্র কুরআনের 66:1 ও 80:1-2 দেখতে পারেন।
# প্রশ্ন হবে- “নবী (সা) কি পাপী ছিলেন যে, তাকে ক্ষমাপ্রার্থনা করতে বলা হচ্ছে”?? না, পাপী ছিলেন না। তবে তিনি আমাদের মতোই মানুষ ছিলেন (18:110, 41:6)। তাই তার সাধারণ মানবিক ভুল ত্রুটি হোত, যেমন আমাদের বিভিন্ন মানবিক ভুল ত্রুটি হয়ে থাকে। এ বিষয়ে তিনি নিজেই বলেছেন- “প্রত্যেক আদম সন্তানের ভুল করে। তবে তাদের মধ্যে উত্তম হল সেই ব্যক্তি, যে ক্ষমাপ্রার্থনা করে”(তিরমিযী, হাদীশ 2499, ইবনে মাজাহ, হাদীশ 4251)। এ জন্য তিনি প্রতিদিন 100 বার পর্যন্ত ক্ষমাপ্রার্থনা করতেন (আবুদাউদ, হাদীশ 1515)।
নামে মূমীন কিন্তু চরিত্রে মুনাফিক, তাদের বৈশিষ্ট্য।
47:20 নং আয়াহ : যারা সত্য স্বীকার করেছে, তারা বলে- “কেন (যুদ্ধের নির্দেশ জারি করার জন্য) একটি সূরাহ নাযিল হয় নি”?? অতঃপর যখন একটি মুহকাম/ দ্ব্যার্থহীন সূরাহ নাযিল [2:190] করা হল, যাতে যুদ্ধের নির্দেশ দেওয়া ছিল, তখন আপনি দেখলেন যে, যাদের মস্তিষ্ক সমূহে রোগ রয়েছে তারা আপনার দিকে তাকাচ্ছে এমন দৃষ্টিতে, যেন তার উপর মৃত্যু ভয় ছেয়ে গেছে [4:77]। সুতরাং ধ্বংস হবে তারা [9:86-87]।
# আসলে সাহাবা (রা) গণ অপেক্ষায় থাকতেন যে, কবে যুদ্ধের অনুমোদন বা আদেশ দেওয়া হবে। তাদের দেখাদেখি তৎকালীন মুনাফিকরাও যুদ্ধের অনুমোদন বা আদেশের অপেক্ষা করার অভিনয় করত। তারপর যখন অনুমোদন বা নির্দেশ দেওয়া হল, তখন তাদের আসল চরিত্র প্রকাশ পেয়ে গেল (4:95)।
যুদ্ধ ও মৃত্যুকে ভয় করা বোকামি।
47:21 নং আয়াহ : অনুগত্য ও ন্যায়সংগত কথা [24:51, 2:285] বলাই তাদের উচিৎ ছিল [3:168-169]। কিন্তু যখন (যুদ্ধের) নির্দেশ দেওয়া হল, তখন যদি আল্লাহর সঙ্গে কৃত ওয়াদা সত্য প্রমাণ করত, তাহলে তা তাদের জন্য উত্তম [3:156-158] হোত।
প্রায় অর্ধেক পৃথিবী থেকে মুসলিমদের শাসন বিলুপ্তির কারণ।
47:22 নং আয়াহ : তবে কি তোমাদের মধ্যে এই সম্ভাবনা আছে যে, ক্ষমতা লাভের পর মূর্খতার যুগে ফিরে যাবে ও তোমরা গ্ৰহে/ পৃথিবীতে সন্ত্রাস সৃষ্টি করবে [7:56] এবং তোমাদের দ্বারা বিকশিত মানবতাকে [31:18] ছিন্ন ভিন্ন করবে??
47:23 নং আয়াহ : ওরাই তারা, যাদেরকে আল্লাহ লানত/ ধ্বংস করবেন। এতএব তাদেরকে বধির ও দৃষ্টি সমূহকে অন্ধ করে দিয়েছেন।
যারা কুরআন গবেষণা করে না, তাদেরকে ব্যঙ্গ করা হল।
47:24 নং আয়াহ : তারা কি কুরআন নিয়ে চিন্তা ভাবনা/ গবেষণা [38:29] করে না, নাকি তাদের মস্তিষ্ক সমূহ তালাবদ্ধ??
ইসলাম ত্যাগী, ইসলাম ত্যাগকে মহান মনে করে কেন??
47:25 নং আয়াহ : নিশ্চয়ই তাদের কাছে পথ সুস্পষ্ট হওয়ার পরও যারা (ইসলাম ত্যাগ [4:137] করে) পিছনে ফিরে যায়, শাইত্বান [43:36] তাদের এই কাজকে ‛মহান কাজ’ হিসাবে দেখায় [43:37]। আর তাদেরকে মিথ্যা আশা দেয়।
কাফির যখন ইসলামের নীতির প্রশংসা করে, তখন যা বলে।
47:26 নং আয়াহ : ওটা এজন্য যে, আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, যারা তা অপছন্দ করেছে, তারা বলে- “শীঘ্রই কিছু বিষয়ে আমরা তোমাদের (ইসলামের) নীতি মেনে চলব”। তবে আল্লাহই জানেন তাদের আসল/ গোপন ইচ্ছা গুলো [4:81]।
প্রাণ হরণকারী ফেরেস্তা ‛একজন’ নয়।
47:27 নং আয়াহ : অতঃপর কেমন হবে তখন, যখন ফেরেস্তারা [32:11] তাদের মুখমন্ডলে ও পিঠে আঘাত করতে করতে প্রাণ হরণ করবে??
মৃত্যুর ফেরেস্তারা কেন খারাপ ব্যাবহার করে??
47:28 নং আয়াহ : ওটা এজন্য যে, তারা অনুসরণ করে ছিল এমন পথের, যা আল্লাহকে অসন্তুষ্ট করেছে। তারা অপছন্দ করেছে তার (আল্লাহর) সন্তুষ্টির পথ। ফলে তিনি তাদের আমল/ সৎকর্ম সমূহ ধ্বংস করে দিয়েছেন।
অমুসলিমদের মনে মুসলিমদের প্রতি চরম শত্রুতা ও বিদ্বেষ রয়েছে।
47:29 নং আয়াহ : যাদের মস্তিষ্ক সমূহে রোগ রয়েছে, তারা কি ধারণা করে যে, আল্লাহ কখনও (তোমাদের প্রতি) তাদের ‛চরম মাত্রার শত্রুতা ও বিদ্বেষ গুলোকে’ প্রকাশ করবেন না [3:119-120]??
মুসলিম বিদ্বেষীদের কথা বলার ভঙ্গিমা দ্বারা তাদেরকে চেনা যাবে।
47:30 নং আয়াহ : আর যদি আমরা চাই, তাহলে তাদের দেখিয়ে দিতে পারি। আপনি তাদেরকে প্রকাশিত লক্ষণ দ্বারাই চিনে নিতে পারবেন। অবশ্যই চিনে নিতে পারবেন তাদের কথা বলার ভঙ্গি দেখে। আর আল্লাহ জানেন তোমাদের কর্ম সমূহ।
আমল/ কর্ম কতটা জরুরি??
47:31 নং আয়াহ : অবশ্যই আমরা তোমাদেরকে পরীক্ষা করব, যতক্ষণ না আমরা জেনে নিই তোমাদের মধ্যেকার মুজাহিদ (জিহাদকারী) দের ও ধৈর্য্যশীলদেরকে। আর যতক্ষণ না জেনে নিই তোমাদের সম্পর্কে পূর্ণ তথ্য।
# প্রশ্ন হবে- “আল্লাহ পরীক্ষা না নিয়ে কি জানতে পারেন না”?? তিনি জানতে পারবেন, কিন্তু আমাদেরকে বিচার দিবসে তা জানাবেন কিভাবে যে, কে মুজাহিদ এবং কে ধৈর্য্যশীল?? তাই আমাদের আমল জরুরি, আমলের রেকর্ড জরুরি (82:10-12, 99:6) এবং বিচার দিবসে তার প্রদর্শন জরুরি। প্রশ্ন হবে- আল্লাহ আগে থেকেই জেনে নিয়ে জান্নাত ও জাহান্নামে দিয়ে দিচ্ছেন না কেন?? উত্তর 67:2 এ।
কাফিররা আল্লাহর পথে বাধা সৃষ্টি করে, কিন্তু তা বোকামি।
47:32 নং আয়াহ : নিশ্চয়ই যারা সত্য অস্বীকার করেছে, আল্লাহ পথে বাধা সৃষ্টি করে [14:3], তাদের কাছে পথ সুস্পষ্ট হওয়ার পরও রাসূলের বিরোধিতা করেছে, তারা কখনও আল্লাহর সামান্য টুকুও ক্ষতি করতে পারবে না [72:12]। তবে অচিরেই তিনি তাদের আমল/ সৎকর্ম সমূহ ধ্বংস করে দেবেন।
আল্লাহ ও রাসূলকে বাদ দিয়ে ভিন্ন কাউকে অনুসরণ করা হারাম।
47:33 নং আয়াহ : হে সত্য স্বীকার সম্মানিত মানুষজন, তোমরা অনুসরণ কর আল্লাহর (আল্লাহর দেওয়া বিধানের) এবং অনুসরণ কর রাসূলের (রাসূলের দেওয়া বিধানের)। আর তোমরা (কুরআন ও হাদীশ বাদ দিয়ে থাকে ভিন্ন কাউকে অনুসরণ করে) তোমাদের আমল/ সৎকর্ম সমূহকে ধ্বংস কর না।
কাফির অবস্থায় মৃত্যুবরণকারী কখনও ক্ষমা পাবে না।
47:34 নং আয়াহ : নিশ্চয়ই যারা সত্য অস্বীকার করে এবং আল্লাহর পথে বাধা সৃষ্টি করে [14:3], তারপর সত্য অস্বীকারকারী অবস্থায় মৃত্যু হয়, আল্লাহ কখনও তাদেরকে ক্ষমা করবেন না [3:91]।
# শুধুমাত্র কাফির/ সত্য অস্বীকারকারী নন, শিরককারীও কখনও ক্ষমা পাবেন না (4:48, 4:116)। প্রশ্ন হতে পারে- “কেন ক্ষমা পাবেন না”?? ধরুন, আপনি আমাদের প্রিয় দেশ ভারতের নাগরিক। কিন্তু ভারতের সংবিধান ও আইন মানেন না। এখন ভারতের সরকার কি আপনাকে দেশে স্বসম্মানে রাখবে, নাকি আপনার উপযুক্ত স্থান হবে জেলের ভিতরে?? নিশ্চয়ই জেলই হবে আপনার উপযুক্ত স্থান! এরপর যদি বলেন- “কোর্ট আমাকে কেন ক্ষমা করছেন না”?? তাহলে আপনি বোকা।
যুদ্ধ শুরু করা হারাম, করলে চুক্তির আহ্বান করা হারাম।
47:35 নং আয়াহ : এতএব তোমরা সাহস হারিও না এবং সন্ধির প্রতি আহ্বান জানিও না [8:61, 4:90], তোমরাই বিজয়ী হবে। কেননা, আল্লাহ তোমাদের সঙ্গে আছেন। তিনি কখনও তোমাদের আমল/ সৎকর্ম সমূহ ধ্বংস করবেন না (তারা যুদ্ধ শুরু করলে, নিশ্চিন্তে যুদ্ধ করতে থাকো)।
# এখানে খুব গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হবে- “যুদ্ধ শুরু করা হারাম, এটা কোথায় পাব”?? পবিত্র কুরআনেই পাবেন, 2:190 এ চলে যান। শত্রু যুদ্ধ শুরু করলে, তবেই একজন মুসলিম যুদ্ধ করতে পারবে। নয়ত একজন মুসলিম প্রথমে আক্রমণ করতে/ যুদ্ধ শুরু করতে পারবে না, তা হারাম।
আল্লাহর নিজের জন্য সম্পদের প্রয়োজন হয় না।
47:36 নং আয়াহ : মূলত ইহজীবন হার জিতের খেলা ও অভিনয় মাত্র [29:64, 57:20, 6:32]। তবে যদি তোমরা সত্য স্বীকার করো এবং তাকওয়া (অপকর্ম থেকে দূরত্ব) অবলম্বন কর, তাহলে তিনি তোমাদেরকে (তোমাদের) আমল/ সৎকর্মের প্রতিদান দেবেন। আর তিনি তোমাদের ধনসম্পদ সমূহ চান না।
# অর্থাৎ সম্পদের প্রয়োজন রয়েছে মানুষের, আল্লাহর নয়। তিনি টিকে থাকার জন্য অভাবমুক্ত (47:38)। টিকে থাকতে তার সম্পদের প্রয়োজন হয় না। এ ছাড়াও দেখুন 112:2 আয়াহ।
47:37 নং আয়াহ : যদি তিনি তোমাদের থেকে তা চান এবং তোমাদেরকে চাপ দেন, তাহলে তোমরা কৃপণতা করবে। আর (এভাবে) তোমাদের দুমুখো নীতি প্রকাশ হয়ে যাবে।
# অর্থাৎ চাপ দিলেও, তোমরা তা দিতে পারতে না। অথচ বলে বেড়াও যে, “আমরা আল্লাহর জন্য সব কিছু করতে পারি”। তোমাদের এই দুমুখো নীতি প্রকাশ পেয়ে যেত।এখানে এই নীতির কথা বলা হচ্ছে।
আল্লাহর পথে খরচ না করার পরিণতি।
47:38 নং আয়াহ : হ্যাঁ, তোমরাই তারা, যাদেরকে আহ্বান করা হচ্ছে আল্লাহর পথে দান করার জন্য। তখন তোমাদের মধ্যে কেউ কেউ কৃপণতা করে। অথচ যে কৃপণতা করে, তার কৃপণতা তার নিজের উপর বর্তাবে [63:10]। আল্লাহ তো টিকে থাকার জন্য অভাবমুক্ত। তবে তোমরা ফকির/ অভাবী। আর যদি তোমরা মুখ ফিরিয়ে নাও, তবে তিনি তোমাদের স্থলে আনবেন ভিন্ন (গ্ৰহের) নতুন প্রজাতিকে [76:28, 5:18, 65:12]। আর তারা তোমাদের মতো (আল্লাহ বিমুখ) হবে না [5:54]।